ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুর গ্রামের খাঁ পরিবার আধুনিক দুনিয়ার সংগীত ইতিহাসের এক বিস্ময়। ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ উপমহাদেশের সংগীতের উজ্জ্বল নাম। তাদের পরের প্রজন্মে আরো অনেক উত্তরসূরি ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের দিকপাল হয়েছেন। সেতারশিল্পী রীনাত ফওজিয়া এ খাঁ পরিবারের সন্তান। তিনি ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর নাতনি এবং সংগীতবিশারদ মোবারক হোসেন খানের কন্যা। সিল্করুটের সঙ্গে আলাপে শোনালেন তাদের পরিবারের অনেক কথা, তার নিজের সেতার সাধনার গল্প। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শানজিদ অর্ণব
আলাপটা শুরু করি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিবপুর গ্রাম থেকে যেখানে খাঁ পরিবারের প্রতিষ্ঠা। বইপত্র থেকে এ পরিবারের ইতিহাস নিয়ে অনেক কিছু জানা যায়। আপনি খাঁ পরিবারের সন্তান। এবার আপনার কাছেই পরিবারের শুরুর দিকের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাই?
আমার দাদুরা ছিলেন পাঁচ ভাই—ছমিরউদ্দিন খাঁ, আফতাবউদ্দিন খাঁ, আলাউদ্দিন খাঁ, নায়েব আলী খাঁ ও আয়েত আলী খাঁ। উনারা কমবেশি সবাই সংগীতজ্ঞ, সুরের সঙ্গে জড়িত। উনাদের আগ্রহ এসেছিল কোথা থেকে? তাদের আগের প্রজন্ম থেকে। ভাবলে অবাক লাগে, কত আগের কথা! আমার দাদু ছিলেন সবচেয়ে ছোট ভাই, তার জন্মই ১৮৮২ কিংবা ৮৩ সালের দিকে। উনার বাবা সবদর হোসেন খাঁ সে আমলে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজদরবারে গিয়ে মিয়া তানসেনের বংশধর ওস্তাদ কাসেম আলী খান রবাদিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। উনার খুব ইচ্ছা ছিল ওস্তাদ কাসেম আলীর কাছে সেতার শিখবেন। সেই অজ পাড়াগাঁয় তার মধ্যে সংগীতের প্রতি এমন আগ্রহ কীভাবে জন্মেছিল তা বোঝা কঠিন। অনেক অনুরোধর পর তিনি ওস্তাদ কাসেমের শিষ্য হতে সমর্থ হন এবং সেতার শেখা শুরু করেন। তার পাঁচ ছেলের মধ্যেই সংগীদের প্রতি বিরাট আগ্রহ দেখা গেল। তারা ভিন্ন ভিন্ন ওস্তাদের কাছে শিখতে শুরু করলেন। এ পর্বটাও বিরাট ইতিহাস। আমি সংক্ষেপে বলি। সেই শুরুর সময়ে এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন যিনি, তিনি হলেন মেজ জন—ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ। তার কাছে অন্য ভাইদের হাতেখড়ি হয়েছিল। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ ও সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ দাদু—তাদের দুজনেরই হাতেখড়ি হয়েছিল মেজ দাদুর কাছে। এভাবে তারা সবক’টি ভাই গান বাজনার সঙ্গে জড়িত হয়ে গেলেন। গ্রামের মানুষকেও তারা গানবাজনা শিক্ষা দিতে শুরু করলেন। গ্রামবাসীরা তাদের এত ভালোবাসত যে একটি গান তৈরি হয়েছিল—আমরা সকলিরে সদুর পুতে শিখাইছে গান। গ্রামের মানুষ এটা সুর করে বলত। আমার বাবার দাদা সবদর হোসেন খাঁকে গ্রামের মানুষ সংক্ষেপে সদু খাঁ নামে ডাকতেন। আর তার ছিল পাঁচ ছেলে। সেখান থেকেই এ গান।
আপনার দাদু ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ কীভাবে শুরু করলেন?
উনার হাতেখড়ি আগেই বলেছি আমাদের মেজ দাদুর কাছে। সেজ দাদু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কাছেও তিনি অনেক দিন শিখলেন। দাদুর একজন বিখ্যাত শিক্ষক ছিলেন, উনি মিয়া তানসেনের বংশের ছিলেন—ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ। তিনি আলাউদ্দিন দাদুরও শিক্ষক ছিলেন। আমার দাদুর হাতের কাজ দেখে আলাউদ্দিন দাদুর মনে হয়েছিল তিনি সুরবাহার যন্ত্রটা ভালো বাজাতে পারবেন। তিনি তাকে ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছে শিখতে যেতে পরামর্শ দেন এবং বলেন সেখানে তার পরিচয় না দিয়ে নিজের পরিচয়ে গুরুর মন জয় করতে। তাই দাদু মাইহারে গেলেন। তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন এক দারোয়ানের বাসায়। সেখানে একটা কামরা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। এ দারোয়ান ছিলেন ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর বাসার দারোয়ান। দাদু বিষয়টা জানতেন না। একটা কাকতালীয় ঘটনা ছিল। একদিন রাতে ওয়াজির খাঁ সে বাসায় হাজির হলেন। তার দারোয়ানের কাছ থেকে দাদুর বাজনার কথা শুনে দেখতে এসেছিলেন। দাদু তাকে সালাম করলেন। তিনি বললেন, এ তো আমার ঘরানার বাজনা! দাদু তখন সব খুলে বলে তার কাছে শিখতে চাইলেন। ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ তাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করে নেন। এক যুগের বেশি সময় তিনি ওয়াজির খাঁর কাছে তালিম নিয়েছেন। এরপর একদিন তিনি দাদুকে বললেন তোমার শিক্ষাদীক্ষা হয়েছে, এবার পেশাগত জীবন শুরু করো। দাদু তখন মাইহার দরবারে কোর্ট মিউজিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেন। আলাউদ্দিন দাদুর পাশে তাকে একটি আসন দেয়া হয়েছিল। কিছুদিন পর তিনি রামপুরের দরবারে চাকরি পেয়ে সেখানে চলে যান। তিনি কলকাতায় একটা অনুষ্ঠানে যখন বাজাচ্ছিলেন, তখন সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর উপস্থিত ছিলেন। তিনি দাদুর বাজনা শুনে এত মুগ্ধ হন যে তাকে শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ জানান, বলেন যে আমার এখানে বাদ্যযন্ত্র বিভাগ আছে, সেখানে আপনি অধ্যাপনা করবেন এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করবেন। এরপর দাদু শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনা শুরু করেন। সেখানে কিছুদিন ছিলেন। তবে দাদা হোমসিক মানুষ ছিলেন।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ভারতেই রইলেন। আয়েত আলী খাঁর এ দেশে ফিরে আসার কারণ কী ছিল বলে আপনি মনে করেন?
দাদু বিষয়টা আমার বাবা বা অন্যদের কাছে যেভাবে বলেছেন সেটা হলো উনার বাড়ি ফেরার টানটা খুব বেশি ছিল। শান্তিনিকেতনে তো চমৎকার পরিবেশ, আবার বাংলার কাছাকাছি। কিন্তু উনি আর বিদেশ থাকতে চাইছিলেন না। মন খারাপ থাকলে শরীরও খারাপ হয়। তাই উনি ভাবলেন দেশে ফিরে গেলে আমি ভালো থাকব। দাদু কবিগুরুকে বুঝিয়ে বললেন। তিনি প্রথমে মন খারাপ করেছিলেন। তারপর ভারাক্রান্ত মনে দাদুকে বিদায় দিলেন। তখন কবিগুরু তাকে বাংলা ও ইংরেজিতে দুটো সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন।
শান্তিনিকেতন থেকে বাড়ি ফিরলেন। শেষ জীবনটা এ দেশে তার কীভাবে কেটেছিল?
তিনি বাড়ি চলে এলেন। এরই মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তাদের একটা বাড়ি হয়েছে। সেখানে উনার একটা কারখানাও ছিল। সেখানে তিনি বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুত করতেন। এ কাজেই তিনি মন দিলেন। তিনি বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা ছিলেন। তার নিজের হাতে তৈরি সুরবাহার ও একটা হারমোনিয়াম এখনো আমাদের বাসায় আছে। ভারতের বিভিন্ন রাজদরবারে তার বানানো বাদ্যযন্ত্র নেয়া হতো। উনারা অর্ডার দিয়ে এখন থেকে কিনে নিয়ে যেত। বিশ্বখ্যাত সেতারবাদক রবিশঙ্করের প্রথম সেতার আমার দাদুর তৈরি। দাদুকে উকি কাকা ডাকতেন। আলাউদ্দিন দাদুর ছেলে ওস্তাদ আলী আকবর খাঁকে একটা সরোদ বানিয়ে দিয়েছিলেন দাদু। এটা একটু আধুনিক ধরনের সরোদ, যেটা তারা গবেষণা করে তৈরি করেন। এবং সেই প্রথম সরোদটা তিনি তার ভ্রাতুষ্পুত্রকে দেন। এগুলোর পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের শেখাতেন। কুমিল্লায়ও তার অনেক শিক্ষার্থী ছিল। এরপর উনি কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে বাড়ি কিনে পরিবার নিয়ে বসবাস করতে লাগলেন। আমার বাবা সেখানেই লেখাপড়া করেছেন। কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়েছেন, ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়েছেন।
একটি পরিবারের এত এত সদস্য ক্ল্যাসিক্যাল ঘরানায়, যন্ত্রসংগীতে কাজ করেছেন, করছেন। এটা কীভাবে সম্ভব হলো বলে মনে করেন?
অসলেই এ রকমটা খুব কম দেখা যায়। সবদর হোসেন খাঁ থেকে যদি ধরি, তারপর উনার ছেলেরা মানে আমার দাদুদের প্রজন্ম। এরপর আমাদের বাবা-চাচাদের প্রজন্ম। উনাদের প্রজন্মেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি নাম করেছেন। যেমন আলাউদ্দিন দাদুর ছেলে ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ। আমার বাবা সংগীত গবেষক মোবারক হোসেন খান। আমার বড় চাচা ওস্তাদ আবেদ হোসেন খান, উনি বাংলাদেশে একজন প্রথিতযশা শিল্পী ছিলেন, সেতার বাজাতেন। মেজ চাচা ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান—উনি কলকাতায় স্থায়ী হয়েছেন। উনার দুই ছেলে— বিদ্যুৎ খান ও কিরীট খান। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খান ভারতে বেশ নাম করেছিলেন, কিন্তু তারা অল্প বয়সে মারা যান। বড় চাচার একমাত্র পুত্র ওস্তাদ শাহাদাৎ হোসেন খান, উনি বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় সরোদ শিল্পী, একুশে পদক পেয়েছেন। উনার কাছেই আমার হাতেখড়ি। চাচাদের মধ্যে আরো আছেন ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান, মীরকাশেম খান। উনারা সবাই একুশে বা স্বাধীনতা পদক অর্জন করেছেন। আমার বাবার একদম ছোট ভাই সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খান কিছুদিন আগে একুশে পদক পেয়েছেন।
আপনাদের পরিবার তাহলে বাংলাদেশ এবং ভারত-আমেরিকায় ছড়িয়ে আছে। আপনাদের মধ্যে পারিবারিক যোগাযোগটা কেমন?
হ্যাঁ, আছে। এই যে আশীষ খানের কথা বললাম, উনি তো আমেরিকায় আলী আকবর মিউজিক কলেজে শিক্ষকতা করেন। মাঝে মাঝে ভারতে আসেন। তখন অনেক সময় বাংলাদেশে আসেন, এ রামপুরায় বাসায় আসেন।
এবার আপনার সেতার শেখা নিয়ে জানতে চাই। পরিবার থেকে সবাই চেয়েছিল আপনি সেতার শিখবেন, নাকি নিজেই পারিবারিক ঐতিহ্য দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন?
ছোটবেলা থেকে আমি সুরলহরী অনুষ্ঠানটা দেখতাম। অনেক শিশু হয়তো ক্ল্যাসিক্যাল প্রোগ্রাম দেখতে পছন্দ করে না। কিন্তু আমার খুব ভালো লাগত। আর যেটা খুব মজা লাগত—টিভি খুলেই দেখতাম আমার কোনো না কোনো চাচা বাজাচ্ছেন, চাচাতো ভাইয়েরা বাজাচ্ছেন। দেখতে দেখতে মনে হতো আমি একটা যন্ত্র পেলে বাজানো শুরু করে দিতাম। তারপর দাদুর গল্প শুনেছি আব্বার কাছে। কিন্তু আব্বা সংগীত পেশা থেকে সরে এসেছিলেন। তার ছেলেমেয়েরা কেউ সেদিকে যাক তার সে রকম কোনো ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু আমার শুধু মনে হতো আমাকে একটা সেতার দিলেই আমি সেটা বাজাতে পারব। মনে হতো দাদু যদি অত বড় শিল্পী হন, তাহলে আমি একটু চেষ্টা করে দেখি। দাদুর একটা ছোট সুরবাহার আব্বার কাছে ছিল। সেটা দেখতে প্রায় সেতারের মতোই। আমি চেষ্টা শুরু করলাম। কিন্তু জানতে হবে তো। তবে আমার একটা সুবিধা হলো। আমার বড় চাচা ওস্তাদ আবিদ হোসেন খান পাকিস্তান আমলে সংগীতবিষয়ক পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছিলেন। পাঠ্যপুস্তক বোর্ড তাকে লেখক হিসেবে নির্বাচিত করেছিল। বড় চাচা বইতে বাদ্যযন্ত্র ধরার নিয়ম, আঙুলের অবস্থান, সারেগামা—সবকিছুর সচিত্র বর্ণনা ছিল। বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে আমি সারেগামা শুরু করলাম। আম্মা আমার বাজানো খেয়াল করে আব্বাকে বললেন, অনেকের ছেলেমেয়েকে তো শেখাতে চেষ্টা করেও শেখানো যায় না, আর আমাদের মেয়ে তো না শেখাতেই বাজানো শুরু করে দিয়েছে। ওকে শেখালে তো ভালো বাজাতে পারবে। আব্বা শুনেও খুব একটা পাত্তা দিলেন না। কিন্তু আমি দৃঢ়বিশ্বাসী ছিলাম যে পারব ইনশাল্লাহ! আম্মা আমার পক্ষে আব্বাকে বোঝাতে বোঝাতে আব্বা আমার জন্য একটা সেতার এনে দিলেন। আমার চাচাত ভাই শাহাদাৎ ভাইয়া অনেক কিছু শিখিয়ে দিলেন। পরবর্তী সময়ে আমি চলে যাই ফুফাতো ভাই ওস্তাদ খুরশিদ খানের কাছে। তিনি তখন ছায়ানটে শেখান। ভাইয়ার কাছেই যেহেতু শিখতে হবে তখন ভাবলাম ছায়ানটে ভর্তি হয়ে যাই। সেখানে পাঁচ বছরের কোর্স করলাম। তবে তিনি বলতেন সেতার, সরোদের মতো যন্ত্রের জন্য পাঁচ বছর কিছুই নয়। এটা কেবল শুরু বলা যায়। তার পরামর্শে বেতারে অডিশন দিই, সেটা ১৯৯৪ সাল। তখন থেকে আমি বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী। শেখার তো শেষ নেই। এই ভাইয়ার কাছেই আমি টানা ২৬ বছর শিখেছি। তিনি আবার আমার দাদুর ছাত্র ছিলেন। দাদু তার এ নাতিকে ৩০ বছর তালিম দিয়েছেন।





