একসঙ্গে তিনটি বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন তিনি। কখনো তবলা, বাঁশি ও হারমোনিয়াম, কখনো দোতারা, বাঁশি ও বাঁয়া। এটি তার এক বিশেষ গুণ। তাই তিনি যখন গান গাইতেন, মনে হতো একসঙ্গে অনেকে গান গাইছে ও বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। তবে বাঁশি বাজিয়েই তিনি সবচেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বলা হয়, তার বাঁশি বাজানো শুনে পাখিরা পর্যন্ত সম্মোহিত হয়ে যেত। বাংলাপিডিয়ায় এভাবেই দেয়া আছে তার পরিচয়। তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ। জাগতিক মোহ ত্যাগ করেছিলেন তিনি। সংসারের মায়া ছেড়ে ডুব দিয়েছিলেন স্রষ্টা ও সুরের আরাধনায়। তাই তার নামের আগে জুড়েছিল ‘ফকির’ পদবি। তন্ত্র সাধনায়ও তিনি সিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। তাই আফতাবউদ্দিন সাধু নামেও তিনি পরিচিত। শৈশবেই সংগীতের সঙ্গে তার প্রেমের সূত্রপাত। বিদ্যালয়ের টেবিলে তাল বাজিয়ে সে ভালোবাসার প্রথম জানান দিয়েছিলেন তিনি।

১৮৬২ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে এক সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ। পিতা সবদর হোসেন খাঁ ছিলেন সংগীতজ্ঞ। এ পরিবারের সংগীত সাধনার যাত্রা তার মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। তিনি ত্রিপুরা রাজদরবারের সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ কাসেম আলী খাঁর শিষ্য ছিলেন। তিনি সদু খাঁ নামেও পরিচিত। মায়ের নাম সুন্দরী বেগম। কালক্রমে সবদর হোসেন খাঁ ও সুন্দরী বেগমের পরিবারটিই হয়ে উঠেছে ভারতীয় সংগীতের কেন্দ্রস্থল। ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ ছাড়াও এ দম্পতির কোল, পরবর্তী সময়ে মুখ আলোকিত করেছিলেন উপমহাদেশের দুই কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ। এ দুই মায়েস্ত্রোর সংগীতে হাতেখড়ি হয়েছিল অগ্রজ ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁর কাছে। আর আফতাবউদ্দিন পিতা সবদর হোসেন খাঁর কাছ থেকে সংগীতের প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করেছিলেন। সবদর হোসেন খাঁর পাঁচ পুত্র। যথাক্রমে ছমিরউদ্দিন খাঁ, আফতাবউদ্দিন খাঁ, আলাউদ্দিন খাঁ, নায়েব আলী খাঁ ও আয়েত আলী খাঁ। প্রত্যেকেই সংগীত সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন।

সংগীতের প্রতি আফতাবউদ্দিন খাঁর অনুরাগ দেখে খুশি হয়েছিলেন পিতা সবদর হোসেন খাঁ। কিন্তু মা চেয়েছিলেন ছেলে বরং পড়াশোনায় মনোযোগ দিক। সংগীতের টানে তখন বাড়ি ছাড়লেন আফতাবউদ্দিন। কাউকে কিছু না জানিয়েই। কয়েক মাস পর পাশের একটি গ্রামে তাকে খুঁজে পান সবদর হোসেন খাঁ। তিনি ছেলেকে বাড়িতে ফিরিয়ে এনে তার সংগীত শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। শিবপুরের পার্শ্ববর্তী গ্রাম বাঙ্গোড়া। সেখানকার জমিদারের সভার অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন দুই সংগীতজ্ঞ ভাই রামধন ও রামকানাই। তাদের কাছ থেকে আফতাবউদ্দিন খাঁ তবলা ও বেহালার তালিম নিয়েছিলেন। পিতার গুরু ত্রিপুরা রাজসভার সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ কাসেম আলী খাঁর কাছ থেকেও সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন প্রখর মেধাশক্তির অধিকারী। খুব দ্রুত তিনি শিখতে পারতেন। সকালে গুরুর কাছ থেকে শেখা তবলার বোলে সন্ধ্যার মধ্যেই তিনি দক্ষতা অর্জন করে ফেলতেন। আর বাঁশি তিনি নিজে নিজেই আয়ত্ত করেছিলেন এবং বংশীবাদনে বাজিমাত করেছিলেন।

রাগসংগীতে দক্ষ ছিলেন ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ। তার গানে সুরের বৈশিষ্ট্য ছিল রাগনির্ভর। সংগীতের ভুবনে তিনি এক বিশেষ কৃতিত্ব রেখেছেন। তিনিই প্রথম প্রমাণ করেছেন যে লোকসংগীত ও রাগসংগীতের মধ্যে মেলবন্ধন সম্ভব। বিখ্যাত সাধক মনমোহন দত্ত রচিত লোকগানে রাগনির্ভর সুর দিয়েছিলেন তিনি। এ দুই সাধকের মধ্যে আত্মিক বন্ধনও ছিল চমৎকার। মনমোহন গান লিখতেন, সুর দিতেন আফতাবউদ্দিন খাঁ। সংগীত চর্চার ধারাবাহিকতায় আফতাবউদ্দিন খাঁর খ্যাতি দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।

ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ কেবল একজন সংগীতজ্ঞই ছিলেন না, একজন আবিষ্কারকও ছিলেন বটে। তিনি দুটি বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। একটির নাম তিনি দিয়েছেন ‘স্বরসংগ্রহ’। এটি অনেকটা সরোদের মতো, তবে ধ্বনি অধিকতর মুদৃ। আরেকটি বাদ্যযন্ত্রের নাম ‘মেঘডম্বুর’।

১৯৩৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন সুরসাধক ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ। তার দুই নাতি ওস্তাদ ফুলঝুরি খান ও সেতারবাদক ওস্তাদ ইয়াসিন খান বাংলাদেশের বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ।

ফকির আফতাবউদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ছোট ভাই উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ। মাত্র ১০ বছর বয়সে মেজ ভাই আফতাবউদ্দিনের কাছেই তার সংগীতের হাতেখড়ি। সাত বছর ধরে সরগম সাধনা ও রাগসংগীতের রেওয়াজ করেন তিনি। তারপর চলে যান ভারতের মাইহারে। মধ্য প্রদেশের একটি শহর। সেখানে তখন রাজসভা মাতাচ্ছেন অগ্রজ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। ছোট ভাইকে সস্নেহে বরণ করে নেন তিনি। সংগীতের তালিম দেন যত্ন করে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কাছে তিনি প্রথমে সেতার ও পরে সুরবাহারের তালিম নেন। ছোট ভাইয়ের মধ্যে রাগ-আলাপে আকর্ষণ ও নিষ্ঠা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। তিনি ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁকে সংগীতে দক্ষ করে তুলতে কোনো কসুর করেননি। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁও অগ্রজের নির্দেশনা অনুসারে বাদন কৌশল ও রাগ রূপায়ণের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো নিষ্ঠার সঙ্গে আয়ত্ত করেন। বলা যায়, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর প্রথম দুই সংগীত গুরু ছিলেন তারই দুই সহোদর ভাই। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ একপর্যায়ে সংগীতের উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের জন্য তাকে নিজ গুরু ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর কাছে পাঠিয়ে দেন। তবে শর্ত ছিল। নিজ নিষ্ঠা ও গুণেই তাকে গুরুর মন জয় করে নিতে হবে। ভাইয়ের পরিচয় দেয়া যাবে না। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ তাই করেছিলেন। সংগীতের প্রতি নিজের ঐকান্তিক অনুরাগ ও একাগ্রতা দিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন গুরুকে। ওস্তাদ ওয়াজির খাঁ তখন রামপুর রাজসভার স্বনামধন্য সংগীতজ্ঞ। উত্তর প্রদেশের একটি ঐতিহাসিক শহর রামপুর। সেখানে ওস্তাদ ওয়াজির খাঁর তত্ত্বাবধানে একে একে জীবনের ১৩টি বছর কাটিয়ে দিলেন ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ। দক্ষতা অর্জন করেন সংগীতের বিভিন্ন ধারায়।

একপর্যায়ে শিক্ষা সমাপ্ত হয়। শিষ্যকে স্বীকৃতি দিলেন। এবার নিজের গুরু নিজেই। এতদিনকার প্রাপ্ত শিক্ষার আলোকে নিজেকে আরো উন্নত করা। আরো উৎকর্ষ সাধনে প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। আর হ্যাঁ, যা কিছু শিখেছেন, তা শ্রোতাদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া। গুরুর আশীর্বাদ নিয়ে তিনি মাইহারে ফিরে এলেন। মাইহারের রাজসভায়ই শুরু হয় তার কর্মজীবন। অগ্রজ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পাশেই তার বসার ব্যবস্থা করেছিলেন মাইহারের রাজা।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে একটি অর্কেস্ট্রা দল গঠন করেছিলেন ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ। প্রাচ্যদেশীয় যন্ত্রের সমন্বয়ে দলটি গঠন করেছিলেন দুই ভাই। তারা প্রমাণ করেছিলেন, প্রাচ্যের বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে অর্কেস্ট্রা পাশ্চাত্যের অর্কেস্ট্রার সঙ্গে সমানে পাল্লা দিতে পারে। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ রামপুরের রাজসভাও অলংকৃত করেছিলেন। তার কদর বুঝতে পেরেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাকে শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ জানান রবীন্দ্রনাথ। তিনি আমন্ত্রণ রক্ষা করেন। ১৯৩৫ সালে রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে তিনি বিশ্বভারতীর যন্ত্রসংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তবে কয়েক মাস অধ্যাপনার পর শারীরিক অসুস্থতার কারণে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। ফিরে আসেন জন্মস্থান শিবপুরে। যে গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৮৪ সালে। শুরু হয় নতুন কর্মযজ্ঞ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাদ্যযন্ত্র তৈরির একটি কারখানা স্থাপন করেছিলেন ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ। নাম দিয়েছিলেন ‘আলম ব্রাদার্স’। উল্লেখ্য, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে আদর করে ‘আলম’ নামে ডাকতেন পিতা সবদর হোসেন খাঁ। তাই অগ্রজের প্রতি সম্মানার্থে কারখানার এমন নামকরণ। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ ‘মনোহরা’ ও ‘মন্দ্রনাদ’ নামে দুটি বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করেন। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর পরামর্শে তৈরি করেন ‘চন্দ্রসারং’ নামে একটি যন্ত্র। নতুন অনেক রাগও সৃষ্টি করেছিলেন ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ। এর মধ্যে ‘বারিষ’, ‘হেমন্তিকা’, ‘আওল-বসন্ত’, ‘ওমর-সোহাগ’, ‘শিব-বেহাগ’, ‘বসন্ত-ভৈরোঁ’, ‘মিশ্র সারং’ প্রভৃতি রাগ উল্লেখযোগ্য। 

রাগসংগীতের চর্চা, সংরক্ষণ ও প্রসারের জন্য ১৯৪৮ সালে কুমিল্লায় ও ১৯৫৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘আলাউদ্দিন মিউজিক কলেজ’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ। ১৯৬৭ সালে মৃত্যুবরণ করা এ সংগীত সাধক ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও ১৯৮৪ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন: লেখক