সুরসাধক, সুরসম্রাট—নানা উপাধি দেয়া যায় আলাউদ্দিন খাঁকে। তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে নানা বই, তৈরি হয়েছে তথ্যচিত্র। এর মধ্যে ঋত্বিক ঘটকও নির্মাণ করেছেন একটি। ১৯৬৩ সালে মুক্তি পাওয়া এ তথ্যচিত্র নির্মিত হয় ভারতের সংগীত নাটক একাডেমির প্রযোজনায়। প্রায় ২৫ মিনিটের এ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি প্রচলিত ধারার একটি প্রামাণ্যচিত্র। ঋত্বিক কেবল আলাউদ্দিন খাঁয়ের সুরজীবনকে চিত্রায়িত করেছেন। নিজস্ব কোনো দৃষ্টিভঙ্গি আনেননি।

তথ্যচিত্র শুরু হয় মাইহারের বাড়ি থেকে, যেখানে আলাউদ্দিন খাঁ বহুদিন বসবাস করেছেন। মাইহারের রাজার বসতবাড়ির বিপরীতেই বাস করতেন আলাউদ্দিন। কথকের ভাষায়, প্রিন্সলি স্টেটটি আর নেই কিন্তু আলাউদ্দিন সেখানে আছেন। কথক আরো বলেন, আলাউদ্দিনই এখন মাইহারের মুকুটবিহীন রাজা হিসেবে অধিষ্ঠান করছেন।

এর পরই তথ্যচিত্র আলাউদ্দিন খাঁর ব্যক্তিজীবনের দিকে যায়। জানানো হয় তার ভাই আফতাবউদ্দিন ছিলেন একজন বংশীবাদক। সেখানেই শেষ নয়, তিনি ছিলেন কালীভক্ত। ঋত্বিকের তথ্যচিত্র আমাদের জানায় আলাউদ্দিন খাঁ নিজে সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কালীকে—মাইহারে তাকে বলা হয় সারদা মা—তিনি নিজের রক্ষাকর্ত্রী মনে করার পাশাপাশি শিল্পের উৎসও মনে করতেন। সরস্বতী পূজায় প্রতি বছর আলাউদ্দিন খাঁ সারদা মন্দিরে তার ভক্তি নিবেদন করেন। এর সঙ্গে ঋত্বিক রেখেছেন মাইহারের একটি মন্দিরে ভক্তদের দর্শনের পাশাপাশি আলাউদ্দিনের টুপি পরার দৃশ্য। ঠিক এ জায়গায় ঋত্বিক দেখিয়েছেন পোশাক আর বিশ্বাস আলাদা হলেও পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। একটি দৃশ্যে তসবি হাতে আলাউদ্দিনকে কপালে যুক্তকর ঠেকাতে দেখা যায়।

এর পরই ঋত্বিক এনেছেন আলাউদ্দিন খাঁর পরিবারের খবর। তার বাবা ছিলেন ত্রিপুরা এস্টেটের শিবপুরের মানুষ। তার বাবা ছিলেন একজন সেতারবাদক। এরপর আলাউদ্দিন খাঁর মুখেই আমরা তার বংশ পরিচয় জানতে পারি। আর তিনি আমাদের জানান কীভাবে আলাউদ্দিন তার সুরসাধনা শুরু করেছিলেন। তার বাবা-মা চেয়েছিলেন আলাউদ্দিন স্কুলে পড়ুক। কিন্তু আলাউদ্দিন সংগীত শিখতে চেয়েছিলেন। মায়ের টাকা চুরি করে আট বছর বয়সে তিনি কলকাতা পালান। সেখানে থাকতে শুরু করেন পাতুরিয়া ঘাটের এক মন্দিরে, দিনে এক বেলা খেয়ে।

ঋত্বিক তার তথ্যচিত্রে দেখান, আলাউদ্দিন খাঁ গুরু খুঁজছিলেন। তিনি সন্ধান পান ধ্রুপদি সংগীতের ওস্তাদ নুলো গোপালের কিন্তু তিনি কেবল হিন্দুদেরই শেখাতেন। আলাউদ্দিন নাম ভাঁড়িয়ে তার শিষ্যত্ব নেন। 

আলাউদ্দিনের সময়ের সবাইকে পাওয়া যায় না। ফলে তথ্যচিত্রে ঋত্বিক ব্যবহার করেছেন নুলো গোপাল, গিরীশ ঘোষের ছবি। এছাড়া তিনি পাতুরিয়া ঘাটের মন্দিরেরও একটি স্কেচ ব্যবহার করেছেন। এ তথ্যচিত্রে ঋত্বিকের ক্যামেরার কাজ বা অন্যান্য বিষয় খুব একটা দেখা যায় না। তিনি শৈল্পিক উপস্থাপনের চেয়ে সম্ভবত আলাউদ্দিনকেই কেন্দ্রে রাখতে চেয়েছেন। 

এর পাশাপাশি ঋত্বিক এনেছেন আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে। আলাউদ্দিনের পুত্র আলী আকবর খাঁকে এ তথ্যচিত্রে দেখা যায় সেতার বাজাতে। কেবল তিনিই নন, আলাউদ্দিনের কন্যা অন্নপূর্ণাও (আসল নাম রওশন আরা বেগম) আছেন তথ্যচিত্রে। ঋত্বিক এ তথ্যচিত্রের জন্য আলাউদ্দিন খাঁর জামাতা পণ্ডিত রবিশঙ্করকেও হাজির করেছেন ক্যামেরায়। তাকে আলী আকবরের সঙ্গে সরোদ বাজাতে দেখা যায়। একটি দৃশ্যে তারা বাজিয়েছেন ওস্তাদের পায়ের কাছে বসে। হিন্দুস্তানি সংগীতে গুরু-শিষ্যের এ সম্পর্ক পরিচিত।

পাশাপাশি তিনি রেখেছেন আলাউদ্দিন খাঁর কয়েকটি অর্জনের খবর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে দেশীকোত্তম দিয়েছিলেন। এরপর ভারতের রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদের হাত থেকে নিয়েছিলেন পদ্মভূষণ। সে চিত্রও দেখতে পাওয়া যায়। পাশাপাশি তথ্যচিত্রজুড়ে ছিল সেতারের সুর।

ঋত্বিকের এ তথ্যচিত্রে ঋত্বিকোচিত সৌন্দর্য এসেছে শেষ অংশে। তিনি আলাউদ্দিনের ব্যক্তি জীবনের দুটি খবর দিয়েছেন। রেখেছেন ওস্তাদের বাজার করার চিত্র। পাশাপাশি তিনি  জানান, আলাউদ্দিন খাঁ প্রথম বিশ্বযুদ্বের পর কয়েকজন অনাথকে সংগীত শিখিয়ে তৈরি করেছেন মাইহার ব্যান্ড। একে ভারতের প্রথম ব্যান্ড বললেও ভুল হয় না। ঋত্বিক তার তথ্যচিত্র শেষ করেছেন মাইহার ব্যান্ডের চমৎকার একটি অর্কেস্ট্রেশন দিয়ে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে এখানে সংগীতের নির্দেশনা দিতে দেখা যায়। বর্ষীয়ান এ সংগীতকারকে এখানেই যেন ঋত্বিক উপস্থাপন করেছেন নায়ক কিংবা গন্ধর্ব হিসেবে। সন্ধ্যার সিলুয়েটে শতবর্ষী ওস্তাদ যেন মিথের নায়ক। তথ্যচিত্র শেষ হয় সেই সিলুয়েটের মধ্যেই, আজানের ধ্বনি দিয়ে যেখানে ন্যারেশনে ওস্তাদ আলাউদ্দিনকে বলা হয়েছে The grand old man of Indian music.

মাহমুদুর রহমান: লেখক