প্রথমে কেবল কল্পনা করি একটি মেয়ে ভোরবেলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে আলতো করে ঠোঁটে রঙ লাগাল। হঠাৎ তার মুখ বদলে গেল চোখে। অন্যরকম এক দৃঢ়তায় যেন সে একটু উঁচু হয়ে দাঁড়াল। এ ছোট্ট রঙিন দাগটি শুধু সৌন্দর্য নয় বরং ক্ষমতা আর প্রতিবাদের এক নীরব ঘোষণা।

ইতিহাসজুড়ে লিপস্টিকের গল্প ঠিক এমনই। কখনো রাজমহলের গর্ব। কখনো গির্জার চোখে পাপে মেশানো জাদু। কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসের প্রতীক আবার কখনো রাস্তায় নেমে আসা আন্দোলনের পতাকা।

আজকের আধুনিক লিপস্টিকের স্টিক হাতের ব্যাগে রাখা খুব সাধারণ ব্যাপার মনে হয়। কিন্তু এ ছোট্ট বস্তুটির পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আড়াই থেকে চার হাজার বছরের লম্বা ইতিহাস। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার রানীদের থেকে শুরু করে আধুনিক পপ তারকা টেইলর সুইফট পর্যন্ত ঠোঁটের এ রঙ মানুষের সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য আর শ্রেণীবিভাজন সবকিছু নিয়ে তৈরি করেছে এক জটিল নাটকীয় কাহিনী।

প্রথম লিপস্টিকের কথা বলা শুরু করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হয় প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায়। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে সেখানে উরের প্রাচীন নগরে ছিলেন এক শক্তিশালী নারী শাসক ‘কুইন পু আবি’ আরেক নামে কুইন শুবাদ, তিনি ঠোঁটে রঙ লাগাতেন। সাদা সিসা আর গুঁড়া করা লাল পাথরের মিশ্রণ দিয়ে তৈরি হতো এ রঙ। এ মিশ্রণ ছিল এক ধরনের প্রাচীন ওষ্ঠ রঞ্জক বা লিপটিন্ট। উরের রানীর ঠোঁটের লাল রঙ ছিল তার ক্ষমতা আর মর্যাদার দৃশ্যমান প্রতীক। প্রত্নতাত্ত্বিকরা দেখেছেন যে অনেক সুমেরীয় ধনীদের কবরের মধ্যে ককল নামে পরিচিত এক ধরনের ছোট গোল–ঢেউ খেলানো নকশার সামুদ্রিক ঝিনুকের খোলসের ভেতর ঠোঁটের রঙ রাখা থাকত। এ ঝিনুকের খোলসকে লিপস্টিক রাখার খুদে পাত্র বা মিনি লিপস্টিক কনটেইনার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রমাণ করে প্রাচীনকালে এ প্রসাধনপণ্য শুধু জীবনে নয়, মৃত্যু-পরবর্তী জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অন্যদিকে আরেক ধারা পাওয়া যায় মেসোপটেমিয়ায়। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ার নারীরা ঠোঁট সাজানোর জন্য মূল্যবান রত্ন গুঁড়া করে ব্যবহার করতে শুরু করলেন। তারা আর কেবল চারপাশে থাকা সাধারণ উপাদান নয় বরং দামি পাথর গুঁড়া করে ঠোঁটে লাগাচ্ছিলেন। ফলে পুরনো আদিম ঠোঁটরঞ্জক থেকে লিপস্টিক ধীরে ধীরে এক বিলাসী রূপ-পণ্যের পথে পা বাড়াল সমাজ। বোঝানো হলো যে এ রঙ স্রেফ সাজ নয় এটি ঐশ্বর্য আর উচ্চবর্গীয় মানুষের পরিচয়।

এ মেসোপটেমিয়ার সূত্র ধরে রঙিন ঠোঁটের সংস্কৃতি চলে যায় মিসরে। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব দুই হাজারের দিকে মিসরে তখন পুরুষ-নারী দুই লিঙ্গই প্রতিদিনের জীবনের অংশ হিসেবে মেকআপ ব্যবহার করত। ‘অমুক ভাইয়ের চামড়া, মেকআপ দেব আমরা’ বলে বিয়ে বাড়িতে মশকরা করতে শুনেছি। কিন্তু প্রাচীন মিসরে পুরুষও মেকআপ দিত, তাই এ স্লোগান সে যুগে মোটেও মশকরা ছিল না। ঠোঁটের রঙের জন্য তারা ব্যবহার করত লাল অকার নামের এক ধরনের মাটি। এ আকার কখনো কখনো খালি লাগানো হতো। কখনো কখনো আবার রেজিন বা গাম-জাতীয় আঠালো পদার্থের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা হতো। যাতে রঙটি ঠোঁটে বেশি সময় টিকে থাকে। প্রাচীন সে সমাজে শুধু লাল নয়, কমলা, ম্যাজেন্টা এমনকি নীল ও কালো ঠোঁটের রঙও দেখা যেত। যারা ধনী ছিলেন তারা মৃত্যুর পরও এক বা দুই পাত্র ঠোঁটের রঙ সঙ্গে নিয়ে কবরস্থ হতেন। যেন পরজগতে গিয়েও এ বৈভব, সৌন্দর্য আর মর্যাদা বজায় থাকে।

মিসরের অভিজাতদের মধ্যে লাল ঠোঁট বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তারা লাল অকারের পাশাপাশি আরো নানা উপাদানে পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। অনেক সময় তারা বিপজ্জনক ধাতব যৌগ ব্যবহার করতেন। উদাহরণ ব্রোমিন ম্যানাইট আর আয়োডাইড এ দুটি বিষাক্ত উপাদান মিশিয়ে তৈরি করা হতো এক ধরনের বেগুনি আভাযুক্ত লিপস্টিক। রঙটি ছিল খুব আকর্ষণীয়। তার পরও এ লিপস্টিকের নাম হয়ে যায় মৃত্যুচুম্বন। কারণ এ লিপস্টিক নিয়মিত ব্যবহার করে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি কারো কারো মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছিল।

নীল নদের কিংবদন্তি রানী ক্লিওপেট্রা এ বিপজ্জনক রাসায়নিকের বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন। ক্লিওপেট্রা জানতেন সাধারণ লাল তাকে মানায় না। তিনি চাইতেন এমন লাল, যা তার ক্ষমতার রাজকীয়তা আর রহস্যকে আরো গাঢ় করবে। কারমাইনের রঞ্জক ছিল ঠিক তেমনই গভীর আগুনে ঝলমলে আর স্থায়ী এক রঙ। ঠোঁটে লাগালে মনে হতো আলো যেন তার মুখে এসে পড়ছে। কখনো এতে মাছের আঁশ যোগ করে একটু ঝিলমিল তৈরি করতেন। মজার ব্যাপার আধুনিক যুগেও কারমাইন ব্যবহার হয় অনেক লিপস্টিক ব্লাশন, এমনকি কিছু খাবারের রঙেও।

প্রাচীন গ্রিসে ছবিটা ছিল একেবারেই ভিন্ন। সেখানে একসময় অতিরিক্ত সাজগোজ বিশেষ করে ঠোঁট রাঙানোকে কৃত্রিম সৌন্দর্য বলে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হলো। ফলে সাধারণ ভদ্রমহিলারা এ রঙ ব্যবহার থেকে সরে দাঁড়ালেন। গ্রিক সাম্রাজ্যে লিপস্টিক ধীরে ধীরে মূলত যৌনকর্মীদের চিহ্নে পরিণত হয়। অবাক করা তথ্য, প্রাচীন সে আইন অনুযায়ী যৌনকর্মীরা যদি দিনের বেলায় ঠোঁটে রঙ ছাড়া জনসমক্ষে বের হতেন অর্থাৎ লিপস্টিক না লাগিয়ে নিজেদের ভদ্রমহিলা হিসেবে পরিচয় দেয়ার চেষ্টা করতেন তাহলে তাদের শাস্তি দেয়া হতো।

রোমান সাম্রাজ্যের সময়ে আবার দৃশ্যপট বদলে গেল। সেখানে ঠোঁট রাঙানো আবার বাবুগিরি হয়ে ওঠে। পুরুষরা সামাজিক মর্যাদা বোঝাতে লিপস্টিক ব্যবহার করতেন। আর ধনী নারীরা সৌন্দর্যের জন্য ব্যবহার করতেন।

ইউরোপে প্রায় ৫০০ থেকে এক হাজার খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মানুষের মধ্যে এক ধরনের সরলতার দিকে ঝোঁক দেখা যায়। চোখ ধাঁধানো প্রসাধন ব্যবহার কমে গেল। কেউ কেউ ইচ্ছে করেই কম গোসল করতেন। সাদাসিধে থাকার মধ্যে ধর্মীয় জমিন খুঁজে নিতে চাইতেন।

মধ্যযুগের এক হাজার থেকে তেরোশ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ধর্মের প্রভাব বেড়ে যায়। ইংল্যান্ডে তখন এমন ধারণা তৈরি হয় যে কোনো নারী যদি নিজের মুখের ঈশ্বর প্রদত্ত অবয়ব পরিবর্তন করে মেকআপ ব্যবহার বা রূপচর্চা করে, তাহলে যেন সে ঈশ্বরের কাজেই হস্তক্ষেপ করলেন। কেউ কেউ এমনকি মনে করত সে নাকি শয়তানের সঙ্গে এক গোপন চুক্তি করেছে, ফলে ঠোঁটের রঙ ধীরে ধীরে পাপের প্রতীকে পরিণত হয়ে উঠছে।

এরপর ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের সময় যখন ইউরোপীয় সৈন্য আর ব্যবসায়ীরা আবার মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া-আসা শুরু করলেন, তখন ইউরোপের সামনে আবার খুলে গেল মধ্যপ্রাচ্যের প্রসাধনের জগৎ। লিপস্টিকের ওপরও এর প্রভাব বর্তাল। ইউরোপে এটি তখন এক ধরনের নিষিদ্ধ আকর্ষণে পরিণত হলো। ধর্মীয় নেতারা একে নৈতিকতার বিরোধী বলে ঘোষণা করেছিলেন।

ইউরোপে যখন এ টানাপড়েন চলছে, তখন সময় এগিয়ে যায় ষোলো শতকের দিকে। ইতিহাসে যাকে অনেকে অন্ধকার যুগ বলে থাকেন। খ্রিস্টান গির্জা ঠোঁটে কোনো রকম রঙ লাগানোকে সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। তারা বলল ঠোঁটের লাল রঙ নাকি পৌত্তলিক আচার-আচরণের সঙ্গে যুক্ত। ফলে যারা লিপস্টিক পরতেন তাদের মধ্যে অনেকেই সমাজের নিম্নবর্গ এবং প্রধানত পতিতা শ্রেণীর। তাছাড়া ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট পর্যন্ত এমন আইন পাস করল যে কেউ যদি ঠোঁটে রঙ লাগিয়ে পুরুষকে প্রতারণা করে, তাহলে তাকে ডাইনি হিসেবে আগুনে পুড়িয়ে মারা হতে পারে।

তারই মধ্যে আসেন এক নাটকীয় ব্যতিক্রম রানী প্রথম এলিজাবেথ। তিনি তার মুখে সাদা পাউডারের সঙ্গে তীব্র লাল ঠোঁটের বৈপরীত্যকে পছন্দ করতেন। তার লাল ঠোঁট তৈরি হতো কোচিনিল পোকা থেকে পাওয়া কারমাইন গাম, আরবিক ডিমের সাদা অংশ আর ডুমুরের দুধ দিয়ে। তিনি বিশ্বাস করতেন এ রঙ নাকি খারাপ আত্মাকে দূরে রাখে। তিনি গির্জার আপত্তি একেবারেই কানে তুললেন না, আর যেহেতু ইংল্যান্ডের রানীকে কেউ আগুনে পুড়িয়ে মারতে সাহস করবে না, ফলে ধীরে ধীরে লাল ঠোঁট আবার উচ্চশ্রণীর মধ্যে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ফিরে এল। ধর্মীয় নেতাদের আগের নিষেধাজ্ঞাও হালে আর পানি পেল না।

আঠারো শতকে ইংল্যান্ডে আবার নতুন ধরনের কঠোরতা এল। পার্লামেন্ট এ সময় এমন আইন করল যে কোনো নারী যদি পরচুলা, কৃত্রিম দাঁত, উঁচু হিল বা প্রসাধনের সাহায্যে নিজের চেহারা বদলে কোনো পুরুষকে বিয়ের ফাঁদে ফেলেন, তবে তার বিয়ে বাতিল করা যেতে পারে, এমনকি তাকে ডাইনি হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করা যেতে পারে। এ আইন মূলত পুরুষদের স্বার্থ রক্ষার জন্য তৈরি হলেও এর একটি অদ্ভুত ফল দাঁড়াল অনেক নারী ভয় পেয়ে লিপস্টিক কেনা কমিয়ে দিলেন। তখনকার অনেক লিপস্টিকেই ছিল পারদ বা মারকিউরি মেশানো সিঁদুর বা ভারমিলিয়ন, যা ছিল মারাত্মক বিষ, ফলে আইনটি অনিচ্ছাকৃতভাবেই অনেক নারীর প্রাণরক্ষা করে ফেলল, বলা যায় শাপে বর হলো।

ex5

লিপস্টিক। শিল্পী: ওয়েন থেবড, ১৯৬৪

এবার আমাদের যেতে হবে আরব-স্পেনের দিকে আট-বারো খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে, সেখানে বাস করতেন বিখ্যাত চিকিৎসক ও শল্যবিদ আবু আল কাসিম আল জাহরাভি। তিনি শুধু অস্ত্রোপচারের যন্ত্র উদ্ভাবন করেননি, প্রথম এমন একটি পণ্য তৈরি করলেন, যা আধুনিক লিপস্টিকের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল রাখে, তিনি সুগন্ধি মিশ্রিত কাঠি বা স্টিককে বিশেষ ছাঁচের মধ্যে গড়িয়ে কঠিন আকার দিলেন। এটাই ছিল প্রথম শক্ত লিপস্টিক, যা আলাদাভাবে বহন করা যায় এবং সরাসরি ঠোঁটে লাগানো যায়। আবু আল কাসিম আল জাহরাভির এ উদ্ভাবন দেখিয়ে দিল লিপস্টিককে কেবল তরল বা গুঁড়া হিসেবে ব্যবহার না করে সহজে বহনযোগ্য ছোট ছোট কাঠির আকারে বানানো সম্ভব। এটি ছিল আধুনিক প্যাকেট লিপস্টিকের এক প্রাচীন পূর্বসূরি।

লিপস্টিকের ইতিহাসের আরেক বড় বাঁক আসে উনিশ শতকের শেষ দিকে। সেকালে লিপস্টিককে আধুনিক শিল্পপণ্যের মতো বানানোর চেষ্টা শুরু হয়। অনেক দিন পর্যন্ত লিপস্টিকের ফর্মুলা ছিল খুবই কাঁচা। সাধারণত গুঁড়া আর রঙ মিশিয়ে ব্রাশ দিয়ে লাগানো হতো জায়গায় জায়গায়, তা পানি বা তেলের মতো পাতলা থাকত, যাকে আজকের কঠিন ব্লেন্ড হওয়া সহজ লিপস্টিকের সঙ্গে তুলনা করলে খুবই শিশুসুলভ মনে হয়।

১৮৮৪ সালে ফরাসি প্রসাধন কোম্পানি গেরল্যাঁ এক বিশেষ পণ্য বাজারে আনে। হরিণের চর্বি মৌমাছির মোম আর ক্যাস্টর অয়েল দিয়ে তৈরি এ লিপস্টিক ছিল তুলনামূলক কোমল আর সমানভাবে লাগানো যায় এমন এটি মোটা কাগজে বিশেষ করে রেশমি কাগজে মোড়া থাকত। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন এটিই ছিল প্রথম বাণিজ্যিক অর্থে আধুনিক ধাঁচের লিপস্টিক। এরপর ধীরে ধীরে লিপস্টিক জনপ্রিয়তা পেতে থাকে আর উনিশ শতকের শেষ দিকে এবং বিশ শতকের শুরুতে সমাজে একটি ধারণা তৈরি হয় যে লিপস্টিক যেন মূলত নারীদের জন্যেই।

এ সময়েই বিশ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকায় দেখা যায় লিপস্টিক এক বড় রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হলো। নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের সময় নারীরা লাল ঠোঁটকে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করলেন। ১৯১২ সালে নিউইয়র্কের রাস্তায় যখন সাফ্রেজেট নামে পরিচিত উনিশ থেকে বিশ শতকের শুরুতে নারী ভোটাধিকার আন্দোলনে সামনের সারিতে লড়াইকারী নারীরা তাদের অধিকার দাবি করে মিছিল করছিলেন, তখন বিউটি উদ্যোক্তা এলিজাবেথ আরডেন নিজ হাতে তাদের মাঝে লিপস্টিকের টিউব বিলিয়ে দেন। সে সময়ের প্রভাবশালী নারীরা লাল ঠোঁটকে সাহসের ব্যাজ হিসেবে বেছে নিলেন। আইন গবেষক সারাহ ই শ্যাফার বলেন, লিপস্টিক তখন নারীমুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।

তবে নিরাপত্তা তখনো বড় সমস্যা ছিল। সে সময়ের প্রচলিত একটি আমেরিকান রেসিপিতে গুঁড়া পোকা, মৌমাছির মোম আর জলপাই তেল মিশিয়ে লিপস্টিক বানানো হতো, যা ঠোঁটে লাগানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই পচা গন্ধ ছড়াতে শুরু করত। অন্যদিকে অনেক জায়গায় সিসা আর ভারমিলিয়ন মিশিয়ে লিপস্টিক তৈরি হচ্ছিল, ফলে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকত।

লিপস্টিককে নিরাপদ করার পথে বড় পদক্ষেপ আসে ১৯৩৮ সালে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে ফুড ড্রাগ অ্যান্ড কসমেটিকস অ্যাক্ট পাস হয়। এ আইনের মাধ্যমে বলা হয় কোনো প্রসাধনসামগ্রীতে বিষাক্ত বা শরীরের জন্য ক্ষতিকর উপাদান রাখা যাবে না। পরবর্তী কয়েক দশকে আবার যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো নিজ নিজ পর্যায়ে আরো কঠোর নিরাপত্তা আইন তৈরি করে। ফলে লিপস্টিক ধীরে ধীরে বিষাক্ত ধাতু থেকে দূরে সরে আসে।

লিপস্টিকের প্যাকেট বা টিউবের ইতিহাসও কম নাটকীয় নয়। ১৯২৩ সালে মরিস লেভি নামের এক উদ্ভাবক প্রথম ঘোরানো টিউবের লিপস্টিক তৈরির পেটেন্ট নেন। আজ যাকে আমরা সাধারণভাবে টুইস্ট করে খোলা স্টিক হিসেবে ব্যবহার করি। তিনি সে ধারণাই দেন। এর আগে লিপস্টিক বহন করা বেশ ঝামেলার ছিল। নতুন এ সুইভেল টিউব লিপস্টিককে সত্যিই পকেট সাইজ সহজে ব্যবহৃত পণ্য বানিয়ে ফেলল।

এর একটু আগেই অর্থাৎ বিশ শতকের দুই দশক ধরে ফর্মুলা নিয়েও নানা পরীক্ষা চলছিল। ফরাসি রসায়নবিদ পল বোদারক্রু একটি লিপস্টিক তৈরি করলেন, যার নাম দিলেন রুজ বেইজার। তার লক্ষ্য ছিল এমন লিপস্টিক বানানো, যা চুমু খেলেও ঠোঁট থেকে উঠে যাবে না। তিনি কাজটি এতই দক্ষতার সঙ্গে করলেন যে ফল দাঁড়াল ভয়াবহ। এ লিপস্টিক একবার ঠোঁটে লাগালে প্রায় উঠত না। তুলে ফেলতে গেলে ঠোঁটের চামড়া পর্যন্ত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত। ফলে এ পণ্য নিষিদ্ধ করা হলো। এরপর বহু চেষ্টা। তবু ব্যর্থ পরীক্ষার পর অবশেষে ১৯৫০-এর দশকে হেজেল বিশপ নামের এক রসায়নবিদ প্রথম সত্যিকার অর্থে দীর্ঘস্থায়ী অথচ নন স্মিয়ার অর্থাৎ ছড়িয়ে না পড়া লিপস্টিক তৈরি করতে সক্ষম হলেন। পাশাপাশি বিশ শতকের শুরুর দিকেই দেখা যায় প্রথম লিপ গ্লস বাজারে আসে, যা ঠোঁটে চকচকে আভা দেয় কিন্তু গভীর রঙ নয়।

আরেকদিকে ইতিহাসের এক পর্যায়ে লাল লিপস্টিক সরাসরি যুদ্ধের প্রতীকও হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পশ্চিমা দেশে লাল ঠোঁটকে নারীদের দেশপ্রেম আর স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতে থাকে। ফাইটিং রেড আর ভিক্টরি রেড নামের শেড তখন খুব জনপ্রিয় হয়। এলিজাবেথ আরডেন এমন একটি লিপস্টিক শেড তৈরি করেন, যা মহিলা সামরিক বাহিনীর ইউনিফর্মের লাল অংশের সঙ্গে মানিয়ে যায়। অনেক কারখানার ড্রেসিং রুমে মেয়েদের জন্য লিপস্টিক রাখা হতো, যাতে তারা ক্লান্ত শ্রমের মাঝেও নিজেকে শক্ত অনুভব করতে পারে। বলা হয় এডলফ হিটলার লাল লিপস্টিক ঘৃণা করতেন। ফলে মিত্রপক্ষের অনেক নারীর কাছে লাল ঠোঁট ছিল তার বিরুদ্ধাচরণেরও প্রতীক।

আধুনিক কালের আরেকটি নজির পাওয়া যায় ২০১৮ সালে নিকারাগুয়ায় সয় পিকো রোহো নামের এক আন্দোলনে, যেখানে নারী-পুরুষ উভয়েই লাল লিপস্টিক লাগিয়ে স্বৈরশাসনের প্রতিবাদ জানান। ২০১৯ সালে চিলিতে হাজারো নারী লাল ঠোঁট ব্যবহার করেন। যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে আজও লাল লিপস্টিকের এ বিদ্রোহী চরিত্র বর্তমান।

অবশ্য লিপস্টিকের ইতিহাস কেবল রসায়নের গল্প নয়, এটি সামাজিক মর্যাদারও গল্প। কখনো লাল ছিল অভিজাত নারীর প্রতীক আবার বেগুনি ধরা হতো নিচু শ্রেণীর রঙ। প্রাচীন রোমে পুরুষরা নিজেদের পদমর্যাদা বোঝাতে লিপস্টিক লাগাতেন আবার নির্দিষ্ট এক সময় ইউরোপে ঘোষণা করা হলো লিপস্টিক নাকি জাদুবিদ্যার লক্ষণ। তবে উনিশ শতকের শেষভাগে ১৮৮৪ সালে গেরল্যাঁর বাণিজ্যিক লিপস্টিক বাজারে আসার পর থেকে এর জনপ্রিয়তা ক্রমে ঊর্ধ্বমুখী থেকে গেছে। বিশ শতকেও লিপস্টিকের ধরন নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে।

২০১৫ ও ২০১৬ সালের দিকে দেখা যায় আরেক অদ্ভুত নতুন ট্রেন্ড বাজারে আসে। সবুজ রঙের লিপস্টিক, যা ঠোঁটে লাগানোর পর শরীরের পিএইচ আর তাপমাত্রার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করে গোলাপি হয়ে যায়, আগের শতকের তুলনায় এটি এক বিশাল বৈপ্লবিক উন্নতি।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতাদের চাহিদাও বদলেছে। আজকের মানুষ শুধু সুন্দর দেখানোর জন্য লিপস্টিক চায় না। তারা চায় ঠোঁট আরাম পাক। দীর্ঘ সময় রঙ টিকুক এবং লিপস্টিকের ভেতর যেন থাকে ভিটামিন আর ময়েশ্চারাইজার। তাই অনেকে এখন প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি লিপস্টিককে বেশি প্রাধান্য দেন। পশু নির্যাতন ছাড়া নিরাপদ পরীক্ষা আর পরিবেশ সচেতন উৎপাদন নিয়ে চলমান বিতর্কও এ পণ্যের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরো জটিল করে তুলেছে।

তবে সব পরিবর্তনের মধ্যেও কয়েকটি সত্য একই রকম রয়ে গেছে। প্রথমত লিপস্টিক সবসময়ই ফিরে আসে। মহামারীর সময় মাস্কের আড়ালে কিছুদিন বিক্রি কমেছিল। পরে আবার হঠাৎ বুম দেখা গেছে। দ্বিতীয়ত লিপস্টিক আজও একটি অরাজনৈতিক সুন্দর অথচ রাজনীতিতে ডুবে থাকা পণ্য; এটি কখনো নারীমুক্তির প্রতীক, কখনো পাঙ্ক বিদ্রোহের ভাষা, কখনো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পতাকা আবার কখনো কিশোরী মেয়ের প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার এক নীরব চিহ্ন।

এ ক্ষুদ্র রঙিন বস্তুটি তাই কেবল সৌন্দর্যের খেলনা নয়, এটি মানুষের স্বাধীনতা আত্মপ্রকাশ ধর্ম আর রাজনীতির ইতিহাসের চলমান সাক্ষী। চার হাজার বছরের পথে পথে কেউ কখনো লিপস্টিককে নিষিদ্ধ করেছে, কেউ আবার তাকে রাজমুকুটের মর্যাদা দিয়েছে। তবু প্রতিবারই লিপস্টিক ফিরে এসেছে ঠোঁটে নতুন রঙ আর হৃদয়ে নতুন সাহস নিয়ে। পাঠক যখন নিজের পছন্দের শেড বেছে নেবেন, তখন যদি এক মুহূর্তের জন্য হলেও এ দীর্ঘযাত্রার কথা মনে পড়ে, তবে বুঝবেন খুদে বস্তুটির আসল মহা ইতিহাস কতটা অভিভূত করার মতো।

সৈয়দ মূসা রেজা: সাংবাদিক ও লেখক