১৯৭৯ সালের ২৬ অক্টোবর, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হি শেষবারের মতো নৈশভোজে বসেছিলেন। সে সময় পার্কের দমনমূলক নীতির সমালোচনা করায় জাতীয় পরিষদ থেকে বিরোধী দল এনডিপির নেতা কিম ইয়ং-স্যামের চেয়ারম্যান পদ বাতিল করে দেয়া হয়। যার কারণে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেদিন নৈশভোজেও এসব বিষয় নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তিনি। নৈশভোজে তিনি যাদের ডেকেছিলেন তা থেকে তার চিন্তিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।
সেদিনের নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন গোয়েন্দা সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (কেসিআইএ) পরিচালক কিম জে-গিয়ু, পার্কের প্রধান দেহরক্ষী চা জি-চুল (যিনি ক্রমেই আরো বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠছিলেন) এবং ব্লু হাউজের মুখ্য সচিব ও সাবেক কেসিআইএ পরিচালক কিম গে-ওন। নৈশভোজে উপস্থিত চারজনই একে অন্যকে বহু বছর ধরে চিনতেন। তারা সবাই সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন এবং দেশটির সামরিক অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ অভ্যুত্থানই ১৮ বছর আগে পার্ককে ক্ষমতায় এনেছিল।
সেদিন রাতে সিউলের প্রেসিডেন্সিয়াল কম্পাউন্ডের ভেতর কেসিআইএ সেফ হাউজে সেই নৈশভোজে প্রেসিডেন্ট পার্ক গোয়েন্দাপ্রধান কিমকে প্রতিবাদকারীদের নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট কঠোর না হওয়ায় তিরস্কার করেন।
অভিজাতদের প্রথা অনুযায়ী, সেদিন তাদের বিনোদন দেয়ার জন্য দুজন তরুণী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। একজন ছিলেন গায়িকা শিম সু-বং (২৪)। আরেকজন শিন জায়ে-সন (২২), তিনি ছিলেন হ্যানিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। সন্ধ্যা ৬টার পরেই তারা খাওয়াদাওয়া শুরু করলেন এবং এ দুই নারী পার্কের দুই পাশে বসলেন।
পার্ক শিম সু-বংকে গান গাইতে বললেন। শিম জানান, তিনি সেদিন ‘দ্যাট পারসন ব্যাকদ্যান’ নামের একটি কোরিয়ান গান গেয়েছেন। গানটি সে সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
পার্ক ৫ ফুট ৪ ইঞ্চির একজন ছোটখাটো মানুষ ছিলেন। তাকে একজন সংযত মদ্যপায়ী, কঠোর ও রসহীন মানুষ বলে বিবেচনা করা হতো। আমেরিকার একজন রাষ্ট্রদূত তাকে ‘উদাসীন, কর্তৃত্ববাদী ও ঘৃণাপূর্ণ’ ব্যক্তিত্ব বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি আরো জানান, পার্ক জনপ্রিয়তা নয়, সম্মান চাইতেন। পার্ক পাঁচ বছর ধরে নিজেকে আরো অবরুদ্ধ করে ফেলেছিলেন। কারণ এর আগে তার ওপর চালানো একটি হত্যা চেষ্টায় তিনি স্ত্রী ইয়ুক ইয়ং-সুকে হারিয়েছিলেন।
তদন্তকারীদের প্রতিবেদন অনুসারে, পার্ক কেসিআইএর ওপর বিরক্ত ছিলেন। কারণ তারা তাকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পূর্বাভাস দেয়নি এবং বিক্ষোভকারীদের দমন করেনি। সেদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে কিমকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এ প্রতিবাদের কারণ কী এবং কেন তার এজেন্টরা আগে থেকে এ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।
পরবর্তী সময়ে কিম তদন্তকারীদের জানান, তিনি পার্ককে সংক্ষিপ্ত করে বলেছিলেন যে তিনি শুরুতে যা ভেবেছিলেন পরিস্থিতি ছিল তার চেয়ে একেবারে ভিন্ন। গণতন্ত্রের দাবিতে দেশটির নাগরিকরা বিক্ষোভ শুরু করে। বিক্ষোভে ১৬০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তার মধ্যে ১৬ জন ছিল ছাত্র। তবে তিনি আশঙ্কা করছিলেন দেশব্যাপী বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়বে।
পার্ক জানিয়েছিলেন, পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেবেন। যদিও ১৯৬০ সালে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের যারা গুলি করে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন, তাদের পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ায় তাকে কেউ মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে না।
কিম জানান, চা দাবি করছিলেন, কম্বোডিয়ার সরকার ৫০ লাখ মানুষকে হত্যা করার পরও ক্ষমতায় ছিলেন। তাহলে ১০ বা ২০ লাখ কোরিয়ান নিহত হলেও পার্কের ক্ষমতায় থাকতে তেমন কোনো সমস্যা হবে না। চা ছিলেন প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা। তবে চার এ ধরনের হস্তক্ষেপ কিমকে রাগান্বিত করে তুলেছিল। ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে কিম জে-গিয়ু তার দেহরক্ষীদের জানান যে তারা যদি গুলির শব্দ শুনতে পায়, তাহলে যাতে তারা পার্কের রক্ষীদের গুলি করে। কিম এরপর একটি হ্যান্ডগান নিয়ে রুমে ফিরে আসে। প্রথমে তিনি চার দিকে বন্দুক তাক করেন এবং তাকে গুলি করেন। গুলিটি তার ডান হাতের কবজিতে আঘাত করে। চা জীবন বাঁচাতে বাথরুমে ঢুকে পড়ে। এরপর পার্কের বুকে গুলি চালান তিনি। ব্লু হাউজের সেক্রেটারি কিম গে-ওন দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
এ সময় দুই নারী আহত প্রেসিডেন্টের দিকে ঝুঁকে পড়েন। বাইরে কিমের কেসিআইএর রক্ষীরা পার্কের চারজন নিরাপত্তা কর্মীকে গুলি করে। তাদের তিনজন মারা যায়।
কিম এরপর পেটে গুলি করে চাকে হত্যা করেন। গায়িকা শিম সু-বং দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। পার্ক মেঝেতে ছিলেন। কিম পার্কের মাথায় বন্দুক তুলতেই শিন পালিয়ে যায়। কিম পার্কের ডান কানের পেছনে গুলি করেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও ব্যতিক্রমী উন্নয়নের গল্পের রচয়িতা মারা গেলেন। এটি কোরিয়ানদের জন্য একটি যুগের সমাপ্তি ছিল। দুই দশক আগে তাদের দেশ ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ। আর পার্কের মৃত্যুর সময় দেশটিকে অর্থনৈতিক বিস্ময় হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছিল। আর দক্ষিণ কোরিয়ার এ অর্থনৈতিক উত্থানের জনক ছিলেন পার্ক চুং-হি।
পার্ককে হত্যা করার কয়েক ঘণ্টা পর কিমকে গ্রেফতার করা হয়
কিম ব্লু হাউজের বাইরে একটি ক্যাব ডেকে আনেন। অন্যদিকে, তিনি হত্যাকাণ্ডের তিনজন সাক্ষীকে হত্যা করতে ব্যর্থ হন। এসব দেখেশুনে তদন্তকারীরা নিশ্চিত করে জানান, এ হত্যাকাণ্ড ছিল তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, কেসিআইএর কোনো পূর্বপরিকল্পিত ক্যু প্রচেষ্টা নয়। পরের বছর ২৪ মে কেসিআইএর নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান, দুই এজেন্ট ও একজন ড্রাইভারসহ কিমকে ফাঁসি দেয়া হয়। এছাড়া ফায়ারিং স্কোয়াড ৬ মার্চ একজন এজেন্টের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। আরেকজন সেও ইয়ং-জুনকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং পরে ১৯৮২ সালে তিনি মুক্তি পান।
মুখ্য সচিব কিম গে-ওনকেও সন্দেহ করা হয়েছিল। কারণ তিনি কিম জায়ে-গিয়ুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি কিমের মনের অবস্থা সম্পর্কে জানতেন এবং যা ঘটেছিল তা তিনি প্রতিরোধ করতে পারতেন। ঘটনাস্থল থেকে তার পালিয়ে যাওয়া এবং শুরুতেই কে পার্ককে গুলি করেছে সে তথ্য প্রকাশ না করার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাকে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে আদালত বলেন, তিনি যতটা না অপরাধী তার চেয়ে বেশি দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং তার সাজা কমিয়ে দেয়া হয়। পরে তাকে ১৯৮২ সালে মুক্তি দেয়া হয়।
গায়িকা শিম সু-বং ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত টিভিতে উপস্থিত হননি। কিন্তু তিনি বেশ কয়েকটি অ্যালবাম প্রকাশ করেছিলেন। অন্যদিকে, শিন জায়ে-তার অভিজ্ঞতার একটি বই লেখেন। যার নাম “Geugosei Geunyoga Isonei” The Woman Who Was there? বর্তমানে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে থাকেন।
দ্য কোরিয়া টাইমসে প্রকাশিত Assassination of President Park Chung-hee in 1979 শীর্ষক প্রতিবেদনের অনুবাদ করেছেন ফারিন জাহান সিগমা





