বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের শুরুতে ফ্রান্সে একটি জোড়া বিয়ের ঘটনা ঘটে। ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত নিস শহরে অনুষ্ঠিত এ বিয়ে নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, যে বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হলো দুটো মুসলিম পরিবার আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। একটি পরিবার ভারতীয় এবং অন্যটি অটোমান তুর্কি। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতের প্রিন্সলি স্টেট হায়দরাবাদ এবং নির্বাসিত তুর্কি খলিফার পরিবারের মধ্যে এখানেই একটি সংযোগ ও মৈত্রীর সূচনা হয়। কিংবা পুরনো মৈত্রী নতুন মাত্রা লাভ করে। এ মৈত্রীকে কেবল বৈবাহিক আত্মীয়তার সাপেক্ষে দেখলে হবে না, বরং রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
রাজকীয় পরিবারগুলো সাধারণত যে বিয়ের সম্পর্ক তৈরি করে, সেখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও থাকে। বংশের আভিজাত্য, পাত্র-পাত্রীর পছন্দ বাদেও বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় রাখা হয়। তেমনই রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় অটোমান সুলতানের বংশের সঙ্গে হায়দরাবাদের নিজামের পরিবারের বৈবাহিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। শেষ অটোমান খলিফা ও সুলতানের কন্যার সঙ্গে নিজামের জ্যেষ্ঠ পুত্রের বিয়ের সম্বন্ধ করা হয়। কিন্তু এ বিয়ের সঙ্গে জড়িয়ে যায় আরো একটি নাম। প্রাক্তন খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল মজিদের কন্যা দুরুশেহভারের সঙ্গে হায়দরাবাদের সপ্তম নিজাম মীর ওসমান আলী খানের পুত্র আজম জাহর বিয়ের পাশাপাশি দুরুশেহভারের জ্ঞাতি বোন নিলুফারের সঙ্গে আজমের ছোট ভাই মুয়াজ্জমের বিয়ে হয়। হায়দরাবাদের ইতিহাসে দুরুশেহভারের তুলনায় নিলুফারের নামই অধিক আলোচিত। হায়দরাবাদে এখনো তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়, কিন্তু রাজপরিবারের বধূ হয়ে নিলুফারের ভারত আগমনের নেপথ্য কারণটা আড়ালেই পড়ে আছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিশ্বের রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র পরিবর্তিত হতে শুরু করে। কেন্দ্রের সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শক্তিগুলোর ক্ষয় এবং নতুন শক্তির উত্থানও হয়। বিশ শতকের শুরুতেই মুসলিম জাহানে নানা রকম পরিবর্তন আসতে শুরু করে। ইউরোপীয় উপনিবেশের বিস্তার, ইউরোপীয় শিক্ষার সঙ্গে মুসলিমদের পরিচয়ের কারণে দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক আদর্শও পরিবর্তিত হতে থাকে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক জটিলতা আরো একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত। সবকিছু মিলিয়ে আমরা জানি, বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নেই বহু বছরের ‘খেলাফত ব্যবস্থা’ বাতিল হয়। বিশ্বজুড়ে নানা প্রান্তে মুসলিমরা খেলাফতের পক্ষে আন্দোলন করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯২৪ সালে এ ব্যবস্থা বাতিল হলে মুসলিম জাহানের খলিফা তথা তুরস্কের সুলতান কেবল পদচ্যুতই নন, নির্বাসিত হলেন। পরিবারসহ ফ্রান্সে অভিবাসী হন তিনি। তাদের সঙ্গেই অভিবাসী হন আদিল সুলতানের কন্যা নিলুফার। তখনো তার জানা ছিল না একবার দেশান্তরী হওয়ার সাত বছর পর আবার নতুন ঠিকানায় যাত্রা করতে হবে।
রাজকীয় জীবন থেকে নির্বাসনে প্রাথমিকভাবে নিলুফার, দুরুশেহভার ও পুরো অটোমান পরিবারটিকেই সংকটে পড়তে হয়। কিন্তু রাজকীয় পরিবারের ভাগ্য অন্য রাজকীয় পরিবারের সঙ্গেই যুক্ত থাকে। অটোমান সুলতানের অবস্থার কথা করো অজানা ছিল না। পদচ্যুত হলেও সে মুহূর্তে বিশ্বের মুসলিম জনতার সমর্থন তার প্রতি ছিল। মিসর, সৌদি আরব থেকে তার সঙ্গে মৈত্রীর প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু মৈত্রীর ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল ভারত। অবশ্য ভারতের এ অগ্রসরমান অবস্থার বেশকিছু কারণ ছিল। বিশ শতকের শুরুতে ভারতও নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তার মধ্যেই খেলাফতের সমর্থনে অন্যতম বৃহৎ আন্দোলনটি ভারতে হয়।
মধ্যযুগ থেকেই ভারতের বৃহত্তর অংশ মুসলিম শাসকদের অধীন হয়। মোগলদের সময়ে এসে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। তারপর বহু ভাঙা-গড়ার ইতিহাস আছে। তবে মোগল-পরবর্তী সময়ে দাক্ষিণাত্যে নিজামের ক্ষমতা বাড়ে। অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে হায়দরাবাদে প্রতিষ্ঠিত আসফজাহী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতার পদবি ‘নিজাম-উল-মুলক’ থেকে পরবর্তী শাসকরা ‘নিজাম’ নামেই পরিচিত হন। মোগল শাসনের ভাঙনের পর ভারতে নিজামরা সর্বাধিক ক্ষমতাধর এবং ধনী মুসলিমরাজ ঘরানায় পরিণত হন। কেবল ভারত নয়, টাইম ম্যাগাজিনের মতে নিজাম (ওসমান আলী খান) ওই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মুসলিম ছিলেন। ফলে নির্বাসনে থাকা ‘প্রাক্তন খলিফা’র জন্য নিজামের পরিবারের সঙ্গে মৈত্রী জরুরিও ছিল।
একটা বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, নির্বাসিত হলেও আব্দুল মজিদ ও তার পরিবারের সম্মান বিন্দুমাত্র কমেনি। সে আভিজাত্যের কারণে অটোমান বংশটির সঙ্গে মৈত্রী করতে মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য প্রভাবশালী পরিবারগুলো মুখিয়ে ছিল। কিন্তু বিত্ত ও ক্ষমতার দিক থেকে এগিয়ে ছিল নিজামের পরিবার। কেবল ক্ষমতা নয়, নিজামের পরিবারটি মূলত পারস্যের একটি অভিজাত বংশের শাখা। ফলে বংশপরম্পরায়ও তারা সুলতানের পরিবারের জন্য উপযুক্ত। অন্যদিকে ভারতে খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী অন্দোলনও চলমান ছিল। সে সময়ে ভারতের মুসলিম নেতাদের স্বাভাবিকভাইে মনে হয়, অটোমান সুলতানের কন্যার সঙ্গে নিজামের পুত্রের বিয়ের মাধ্যমে পোক্ত মৈত্রীর সূচনা সম্ভব। অর্থ, বিত্ত, রাজনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে মৈত্রীর তুলনায় বৈবাহিক মৈত্রী তথা আত্মীয়তা বেশি কার্যকর। বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাকে পুনরায় উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে দুই পরিবারের এ আত্মীয়তা ভূমিকা রাখবে বলে সবাই আশা করেছিলেন। নিজাম ভেবেছিলেন, অটোমান বংশের সঙ্গে আত্মীয়তার মাধ্যমে নিজের অবস্থান আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে তিনি মুসলিম বিশ্বের প্রধান ব্যক্তিতে পরিণত হবেন।
শাহজাদি দুরুশেহভারের পাণিপ্রার্থীর অভাব ছিল না। মিসরের রাজা ফুয়াদ, ইরাকের রাজা ফয়সাল ও পারস্যের তত্কালীন শাহ প্রস্তাব প্রেরণ করেছিলেন তাদের পুত্রদের জন্য। এদিকে নিজামের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হলে বিশিষ্ট মুসলিম নেতা ও ভারতে খেলাফত আন্দোলনের প্রধান কাণ্ডারি মাওলানা শওকত আলীর তরফ থেকে নিজামের পক্ষে ওকালতি করা হয়। মূলত তার ‘লবিং’ এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। হায়দরাবাদের সঙ্গে নিস, অটোমান পরিবারের ক্রমাগত যোগাযোগ নিয়ে ব্রিটিশ প্রশাসন শঙ্কিত হয়ে উঠেছিল। লন্ডন, দিল্লি, হায়দরাবাদের নথি থেকে জানা যায়, বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে ভারতের মুসলিম নেতাদের আগ্রহ ছিল। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়, খেলাফত আন্দোলনের সমর্থনের পাশাপাশি মহাত্মা গান্ধীও এ বিয়েতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু সংকট একটা রয়েই গেল। বাংলাদেশে একটি প্রবাদ প্রচলিত—লাখ কথা ছাড়া বিয়ে হয় না। রাজকীয় এ বিয়ে নিয়েও বহু দরকষাকষি চলছিল। হায়দরাবাদ যখন রাজকুমারীকে বধূ করার জন্য উন্মুখ, দুরুশেহভারের সঙ্গে আজমের বিয়েতে অটোমান পক্ষ থেকে অতিরিক্ত মোহরানা দাবি করা হয়। বহু কথার পর ওসমান আলী খান ঠিক করেন, তিনি অন্য পুত্রের জন্য নিলুফারকে ঘরে আনবেন। সে কথার পর ১২ নভেম্বর ১৯৩১ সালে ফ্রান্সে একসঙ্গে দুটি বিয়ে হয়।
বিয়েতে প্রাক্তন খলিফা, সুলতান আব্দুল মজিদ স্বয়ং কাজির দায়িত্ব পালন করেন। সাক্ষী হিসেবে হায়দরাবাদের পক্ষ থেকে যে তিনজন স্বাক্ষর করেছিলেন, মাওলানা শওকত আলী তাদের মধ্যে একজন। বিয়ের সময় দুরুশেহভারের বয়স ছিল ১৭ বছর এবং নিলুফারের ১৫। বিয়ের ছবিতে তাদের ভাবলেশহীন চেহারা দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে তারা আনন্দিত ছিলেন না। অবশ্য তারা বিয়ের কারণে অসুখী ছিলেন, না তাদের বহুদিনের নির্বাসনের পর শ্বশুরগৃহে যাওয়ার কারণে, সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায় না। বিয়ের অনুষ্ঠানের কিছুদিন পরই পোর্ট সাঈদ থেকে ‘পিলসনা’ জাহাজে চড়ে হায়দরাবাদের উদ্দেশে যাত্রা করেন সবাই। অটোমান-তুর্কি সংস্কৃতি থেকে ভারতীয় মুসলিম সংস্কৃতির তত্কালীন কেন্দ্রের দিকে এ যাত্রার সময়ে কেউ হয়তো ভাবেননি, খলিফার কন্যাকে ছাড়িয়ে নিলুফার নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলবেন। অনেক কিছু যেমন অনিশ্চিত ছিল, তেমনি অজানা ছিল রাজনীতির কিছু অংশ।
নবদম্পতিদ্বয় হায়দরাবাদ পৌঁছলে চৌমহল্লা প্রাসাদে ৪ জানুয়ারি ১৯৩২ সালে একটি ভোজের আয়োজন করা হয়। ব্রিটিশ রেসিডেন্ট লেফটেন্যান্ট কর্নেল টিএইচ কিইস প্রধান অতিথি হিসেবে এ ভোজে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন যে নিজাম কথা দিয়েছিলেন আলাদা না থেকে ব্রিটিশ কমনওয়েলথে যোগদান করবে হায়দরাবাদ। নিজামের কোনো আপত্তি ছিল না, কিন্তু তিনি আপন রাজ্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চাইতেন। ব্রিটিশ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে তিনি একটি শক্তিশালী মিত্র তৈরি করার চেষ্টায় ছিলেন। পদচ্যুত হলেও আব্দুল মজিদের আভিজাত্য ও অটোমান পরিচয় নিজামের জন্য যথেষ্ট ছিল। পাশাপাশি নিজেদের আসফিয়া বংশপরিচয়ও পারস্যের সমর্থন লাভে সহায়ক হয়। ফলে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সমর্থন তিনি লাভ করেছিলেন। ইতিহাসের পরবর্তী কালপর্বে সময়ের বাস্তবতায় বহুকিছু বদলে গিয়েছিল, কিন্তু হায়দরাবাদের রাজত্ব টিকে ছিল অনেক দিন। রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও অভিজাত পরিবারে নিলুফারের বহু বন্ধু তৈরি হয়। রাজনীতিতে না থেকেও তিনি হায়দরাবাদের প্রিন্সেস হিসেবে বহুবার রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছেন। তার চেয়ে বড় কথা, বহু দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি মানুষের সেবা করেছিলেন। মানুষের জন্য কাজ করে অমর হয়ে আছেন তিনি, একটি রাজনৈতিক বিয়ে থেকে যার সূচনা।
মাহমুদুর রহমান: লেখক





