হায়দরাবাদের শেষ নিজাম মীর ওসমান আলী খানের দুই পুত্রবধূ নিলুফার ও দুরুশেহভার ঔপনিবেশিক আমলের ভারতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। বিয়ের পর ভারতে আসার আগেই মাওলানা শওকত আলী, মহাত্মা গান্ধীর মতো নেতার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল তাদের ভবিষ্যৎ। হয়তো নিয়তিই এসব নির্ধারণ করে। কেননা ফ্রান্সে নির্বাসনকালে বিয়ের পর রাজবধূরা যে জাহাজে ভারত রওনা হন, খোদ মহাত্মা গান্ধী সে জাহাজে তাদের সহযাত্রী ছিলেন। আসফ শাহির সঙ্গে অটোমান পরিবারের এ সম্পর্কের রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি খেলাফত আন্দোলনের সমর্থক হওয়ার কারণে মহাত্মা গান্ধী রাজকন্যাদের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
নিলুফার ও দুরুশেহভারের সঙ্গে গান্ধীর দেখা হয়েছিল কিনা এ বিষয়ে সন্দেহ আছে। দুরুশেহভার কখনো কোনো প্রসঙ্গে গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেননি। ১৭ (দুরুশেহভার) ও ১৫ (নিলুফার) বছর বয়সী কিশোরীদের সঙ্গে গান্ধীর রাজনৈতিক বৈঠকের কোনো সম্ভাবনা নেই, কিন্তু স্নেহ থেকেও সাক্ষাতের চিন্তা আসতে পারে। সাক্ষাৎ সম্বন্ধে একটি মজার ব্যাপার কথিত আছে। লন্ডনে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক শেষ করে অনুসারীদের নিয়ে গান্ধী যথারীতি জাহাজের তৃতীয় শ্রেণীতে ভ্রমণ করছিলেন। অন্যদিকে নিজামের পরিবার প্রথম শ্রেণীতে। সাক্ষাৎ কোথায় হবে তা নিয়ে দোনোমনার পর ঠিক হয় উভয় পক্ষ দ্বিতীয় শ্রেণীতে গিয়ে সাক্ষাৎ করবে।
নিলুফার পরবর্তী সময়ে একজন জনদরদি প্রিন্সেসে পরিণত হন। ভারতের রাজনীতি ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়। গান্ধীর সঙ্গে দেখা না হলেও তার প্রতি নিলুফার শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। মহাত্মার হত্যাকাণ্ডের পর তিনি জওহরলাল নেহরুকে একটি চিঠি লেখেন। ১৯৪৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারির চিঠিটি হুবহু অনূদিত হলো—
প্রিয় পণ্ডিত নেহরু,
আপনি লাখো হূদয়ের ক্রন্দন শুনেছেন এবং শোকবার্তা পড়েছেন। তার (গান্ধী) বিদায়ের মধ্য দিয়ে চারদিকে যে নৈঃশব্দ্য তৈরি হয়েছে; শূন্যতা ও একাকিত্বের সে পরিস্থিতি সম্ভবত আপনার মতো করে কেউ অনুভব করেনি।
আকুল প্রার্থনা এবং আশাবাদ ছাড়া আমি আর কী ব্যক্ত করতে পারি! এ প্রার্থনায় আমার স্বামীও সঙ্গী। যে লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি জীবনভর সংগ্রাম করেছেন, প্রতিটি মুহূর্ত উৎসর্গ করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত জীবন দান করেছেন; সে অসীম, সুন্দর, শান্তি ও ভালোবাসার উপলব্ধি মানুষের মধ্যে জাগ্রত হওয়ার মুহূর্তের জন্য এ প্রার্থনা।
আন্তরিক
সহমর্মিতাসহ,
নিলুফার
টাইপরাইটারে লেখা চিঠির শেষে নিলুফারের স্বাক্ষর দেখা যায়। ১৮ দিন পর নেহরু এ চিঠির প্রত্যুত্তর দিয়েছিলেন। নিশ্চিতভাবেই গান্ধীর মৃত্যুর পর তিনি শোকগ্রস্ত ও উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে বিশেষ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। দেরিতে হলেও নিউ দিল্লির ১৭, ইয়র্ক স্ট্রিট থেকে নিলুফারকে নিজ হাতে লিখেছিলেন নেহরু। ২১ ফেব্রুয়ারির এ চিঠিতে তিনি লেখেন,
প্রিয় প্রিন্সেস,
আপনার চিঠির জন্য ধন্যবাদ। আমাকে পাঠানো চিঠি আপনার মহানুভবতার পরিচয়।
আমাদের চারপাশে গভীর নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছে, কিন্তু তবু তার উপস্থিতি এখনো জীবন্ত। তার অনুপস্থিতির কথা বিশ্বাস করা কঠিন। অবচেতনভাবেই আমি প্রতিদিন কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাই। সম্ভবত মহান মানুষেরা কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। তাদের শরীর কেবল হারিয়ে যায়। তারা অগণিত মানুষের মনন ও জীবনের সঙ্গে মিশে থাকেন।
আশা করি আপনি ভালো আছেন।
আন্তরিকতাসহ
জওহরলাল
নেহরু
রাজনৈতিক কিংবা মহান ব্যক্তিদের মৃত্যুতে এ ধরনের চিঠি চালাচালির রীতি বহু পুরনো, কিন্তু নিলুফার ও নেহরুর চিঠির ভাষা ও বক্তব্যে যে আন্তরিকতা দেখা যায়, সেখান থেকে বোঝা যায়, গান্ধী ও তার আদর্শের প্রতি নিলুফারের শ্রদ্ধা ছিল।
রচনা ও অনুবাদ: আলী আমজাদ





