খেজুর গাছ আছে আমেরিকার মাটিতেও। অবশ্য বলাই বাহুল্য গাছটি স্থানীয় নয়। খেজুরের জাত আছে প্রায় তিন হাজার। এর মধ্যে আমেরিকায় হয় মূলত দুটি—দেগলেত নূর আর মেজুল। এ দুটি জাত যুক্তরাষ্ট্রের বুকে হাজির হয়েছিল বিশ শতকের শুরুর দিকে কৃষি অভিযাত্রী ওয়াল্টার সুইঙ্গেলের হাত ধরে। তাকে আবার কাজটি সঁপেছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। মূল উদ্দেশ্যটা ছিল দুনিয়ার নানা প্রান্তের ফল আমেরিকার খাদ্য সংস্কৃতিতে যুক্ত করার বাসনা। ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসবিদ সারাহ সিকাত্জ জানান, ওয়াল্টার সুইঙ্গেল যে খেজুর এনেছিলেন সেগুলো ছিল মূলত দেগলেত নূর। এরপর ১৯২৭ সালে সুইঙ্গেল মরক্কোর এক স্থানীয় নেতাকে রাজি করান তাকে কিছু মেজুল খেজুরের চারা দিতে। সেগুলো তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
আরেকটু পেছনে যাওয়া যাক। পশ্চিম গোলার্ধে প্রথম খেজুর হাজির হয়েছিল কোথায় এবং কবে। দলিল থেকে জানা যায়, পশ্চিমে খেজুর বাগান করার প্রথম উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কিউবায়, ১৫১৩ সালে। একই সঙ্গে সেখানে খেজুর ও তামাক চাষ শুরু হয়। কিউবায় তামাকের চাষ টিকে গেলেও স্থানীয় আবহাওয়ায় খেজুর গাছ টেকেনি। তবে সেখানে সেই খেজুর চাষের স্মৃতি রয়ে গেছে একটি শহরের নাম এল দাতিলের সঙ্গে। স্প্যানিশ এ নামের অর্থ খেজুর। অর্থাৎ পশ্চিমে খেজুর নিয়ে যাওয়ার অগ্রদূত সে যুগের অভিযাত্রী-দস্যু স্প্যানিয়ার্ডরা।
এরপর তারা আরো উত্তরদিকে যাত্রা করে হাজির হলো মেক্সিকো ও ক্যালিফোর্নিয়ায়। সঙ্গে ছিল খেজুরের চারা ও বীজ। কিছু গাছ জন্মালেও ফল ভালো হয়নি। এ সময় ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণ ভাগে ও অ্যারিজোনায় স্প্যানিয়ার্ড মিশনারিরা খেজুর গাছ লাগাতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের কৌতূহলী কিছু কর্মী খেজুর গাছ নিয়ে আগ্রহী হলেন। পানির ব্যবস্থা করে গাছকে কীভাবে ফলদায়ী করা যায় তা নিয়ে কাজ শুরু করেন। চেষ্টা শুরু হয় আরব দেশ থেকে চারা সংগ্রহের। আলজেরিয়া, ওমান ও মিসর থেকে আনার চেষ্টা হয় শুরুতে। কিন্তু সেগুলো ভালো ফল দিল না। পুরো উদ্যোগ জলে যায়। প্রথম সফলতা ছিল আলজেরিয়া থেকে আনা দেগলেত নূর খেজুর। ১৯০১ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে ইরাক, মিসর, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া থেকে চারা আনা হয়। পল পোপেনো আরবের বেশ কয়েকটি দেশ থেকে খেজুরের বিভিন্ন জাত যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেন। সবকিছু ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ রোগের আক্রমণে সব শেষ। এবার মঞ্চে আসেন ওয়াল্টার সুইঙ্গেল। পরিস্থিতি সামলাতে এই খেজুর বিশেষজ্ঞকে ডাকা হয়। তিনি মেজুল খেজুরের চারা সংগ্রহ করে নতুন উদ্যমে চাষাবাদ শুরু করেন।
আজ যুক্তরাষ্ট্রে যত মেজুল খেজুর জন্মায়, তাদের মূল মরক্কোর একটি মরূদ্যানে। বার্ড ভ্যালিতে আজ যে কয়েক লাখ মেজুল খেজুর গাছ রয়েছে সেগুলো সবই ‘বিগ সিক্স’-এর বংশধর। এই ছয়টি গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল সুইঙ্গেলের আনা চারা থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি খেজুর উৎপাদন হয় ক্যালিফোর্নিয়ায়। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার কোচেলা উপত্যকায়ই মূলত খেজুরের চাষ হয়। ২০২১ সালে শুধু ক্যালিফোর্নিয়ায় ১৫ হাজার ৬০০ একর ভূমিতে খেজুর উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টন। এর মূল্য ছিল প্রায় ২৩ কোটি ডলার। অ্যারিজোনা, ফ্লোরিডা, নেভাডা, দক্ষিণ উটাহ, টেক্সাসেও খেজুর উৎপাদন হয়।
১৯০০ সালের আগে খেজুরের সঙ্গে আমেরিকানদের তেমন পরিচয় ছিল না। বিশ শতকের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের খেজুর চাষীরা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। প্রাচ্যের প্রতি তাদের ভালোবাসা বাড়তে থাকে। আরব্য রজনীর কাহিনী আর ১৯২১ সালে রুডলফ ভ্যালেন্টিনোর নির্বাক সিনেমা দ্য শেখ আমেরিকানদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে রোমান্টিকতা বাড়িয়ে দেয়। কৃষক, সরকার, রেল কর্তৃপক্ষ এবং অন্যরা খেজুর আর প্রাচ্য ঘিরে ব্যবসায় বিপুল ডলারের হাতছানি দেখতে পায়। কোচালা উপত্যকা পিরামিড, উট দিয়ে সেজে ওঠে। আর খেজুর বাগান তো ছিলই। ব্যাপারটা ছিল একটা নকল প্রাচ্যদেশীয় দৃশ্য তৈরির, শহরের নাম দেয়া হয় ওয়েসিস, অ্যারাবিয়া, থার্মাল। সড়কের নাম হয় লক্সর, বাগদাদ, কায়রো, ডেট গার্ডেন (ঢাকার খেজুর বাগান তাহলে যুক্তরাষ্ট্রেও আছে!)। আর এসব সড়কের পাশে লাগানো হয় খেজুর গাছ। রাস্তার পাশে দেখা মেলে আরব দেশীয় স্থাপত্যশৈলী, বেদুইনের তাঁবু আর খেজুর। ১৯২০-এর দশকে আরব দেশীয় সজ্জায় একটি রিসোর্ট—দ্য ওয়ার্ল্ড ওয়েসিস অব বিসক্রা—তৈরির পরিকল্পনা হয়। এই বিসক্রা আলজেরিয়ার একটি শহরের নাম। কিন্তু ত্রিশের দশকের মহামন্দায় এমন অনেক প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের বুকে এই আরব দেশ গড়ে উঠছিল মূলত খেজুরের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। তবে সে সময় খেজুর জনপ্রিয়করণে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি রাখত বার্ষিক খেজুর উৎসব। এটি শুরু হয়েছিল ১৯২১ সালে, ইনডিও শহরে। উৎসবে থাকত আরব দেশের আমেজ আনতে তৈরি সেট, উট, অস্ট্রিচ। আরব্য রজনীর রানী শেহেরজাদ খেতাব দিতে আয়োজিত হতো সুন্দরী প্রতিযোগিতাও, যেখানে নারীরা আরব পোশাক, সজ্জায় হাজির হতেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেখা যেত স্থানীয়রা সবাই কোনো না কোনো আরব সজ্জায় পর্যটকদের স্বাগত জানাচ্ছে। দেখা যেত ওয়েটারের মাথায় আরব্য রজনীর জিনের টুপি, আলাদিন থিয়েটারের টিকিট চেকারের মাথায় হয়তো ফেজ টুপি। এখন অবশ্য আর সে রকমটা নেই। তবে রানী শেহেরজাদ হওয়ার সুন্দরী প্রতিযোগিতাটা নাকি এখনো চলে, তবে তাতে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনও এসেছে।
তবে সবকিছু আর ১৯২০-এর দশকের মতো নেই। কোচালা ভ্যালি হাই স্কুল যেটি দি অ্যারাবস নামে পরিচিত ছিল তার নতুন নাম হয়েছে মাইটি অ্যারাবস। আরব খেজুরচাষীদের সঙ্গে আমেরিকার চাষীদের সম্পর্ক বেশ গভীর। বহু দশক ধরে খেজুর নিয়ে গবেষণা পরস্পরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়েছে এই দুই সংস্কৃতির মানুষ। শিক্ষার্থীরা চাষীদের সঙ্গে থেকে হাতে-কলমে খেজুর চাষ সম্পর্কে শেখে। মধ্যপ্রাচ্যে যখন পোকার আক্রমণে অনেক বাগান নষ্ট হয়েছে তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে চাষীরা তাদের জন্য চারা পাঠিয়েছেন।
এ যুগে মার্কেটিংয়ের ধারণা কীভাবে বদলে গেছে সেটা যুক্তরাষ্ট্রের খেজুর ইন্ডাস্ট্রির দিকে তাকালে ভালোই চোখে পড়বে। এখনকার উৎপাদকরা মধ্যপ্রাচ্যের থিমভিত্তিক মার্কেটিং ত্যাগ করেছেন। তারা বরং এখন প্রচারণা চালাচ্ছেন খেজুরের স্বাস্থ্যকর বৈশিষ্ট্য নিয়ে। নেচার’স ডিলাইট ব্র্যান্ড তৈরিতে খরচ করা হয়েছে লাখ লাখ ডলার। খেজুরকে বলা হচ্ছে প্রকৃতির শক্তিদায়ী ফল। আর ফলাফল? ২০১০-এর পর যুক্তরাষ্ট্রে খেজুর বিক্রি বেড়েছে দ্বিগুণ। যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধিও এ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে।
এস এম রশিদ: লেখক





