আগের দুই ম্যাচে ২০২৬ বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের হয়ে বদলি হিসেবে নেমেছিলেন হোসে কানালে। কিন্তু প্রথমবার পুরো ম্যাচ খেলেই লিখলেন স্মরণীয় এক ইতিহাস।

টাইব্রেকারের সাডেন-ডেথে প্রথম স্পটকিক থেকে গোল করেন কানালে। আর গোলরক্ষক অরলান্দো গিল দুটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে প্যারাগুয়েকে ৪-৩ ব্যবধানে টাইব্রেকারে জার্মানির বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন। এর মাধ্যমে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় অঘটনের জন্ম দিল দক্ষিণ আমেরিকার স্থলবেষ্টিত দেশটি।

মাত্র ৭০ লাখ মানুষের দেশ প্যারাগুয়ে, যার চারপাশে রয়েছে ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। সেই দেশই এবার বিশ্বকাপে চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে বিদায় করে দিল। ২০১৪ সালে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে জার্মানির বিশ্বকাপ সংগ্রাম যেন আরো দীর্ঘ হলো।

ম্যাচ শেষে কানালে বলেন, সত্যি বলতে— আমাদের নিয়ে যা বলা হয়েছে এবং আমরা যেসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি, সবকিছু বিবেচনায় নিলে এই জয় প্রাপ্য। আমি আমাদের দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে ঐক্যের কথাই বলব। আজ আমাদের সত্যিকারের সামর্থ্য দেখানোর ম্যাচ ছিল।

শেষ বাঁশি বাজতেই প্যারাগুয়ের রাজধানী আসুনসিওনের রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার সমর্থক। চিৎকার, লাফালাফি ও আলিঙ্গনে উদ্‌যাপনে মেতে ওঠেন তারা। কেউ কেউ আবেগে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন, আবার অনেকে আনন্দাশ্রু ঝরান। চারদিকে ভেসে আসে জাতীয় দলের জনপ্রিয় গান ‘সয় আলবিরোহো’-এর সুর।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে টাইব্রেকারে জার্মানিকে হারানো প্রথম দল হলো প্যারাগুয়ে।

জার্মানি ছয়টি পেনাল্টির মধ্যে তিনটি মিস করে। সাডেন-ডেথের প্রথম শটে জনাথান তাহ বলটি ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারেন। এরপরই জয়ের সুযোগ পান কানালে এবং সেটি কাজে লাগিয়ে দলকে শেষ ষোলোতে তোলেন।

এর আগে ফাবিয়ান বালবুয়েনার শট ঠেকিয়ে জার্মান গোলরক্ষক মানুয়েল নয়্যার দলকে বাঁচিয়েছিলেন। তবে তাহের মিসে সেই সুযোগ আর কাজে লাগেনি।

অতিরিক্ত সময়ের ১০২তম মিনিটে নাথানিয়েল ব্রাউনের কর্নার থেকে হেডে জালে বল পাঠিয়ে জার্মানিকে এগিয়ে দিয়েছেন বলে মনে করেছিলেন তাহ। কিন্তু ভিডিও পর্যালোচনায় দেখা যায়, শট নেয়ার আগে ভালদেমার আন্তন প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক গিলকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। ফলে গোলটি বাতিল করা হয়।

অতিরিক্ত সময়সহ ১২০ মিনিট শেষে ম্যাচের স্কোর ছিল ১-১।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে হেড থেকে প্যারাগুয়েকে এগিয়ে দেন হুলিও এনসিসো। পরে ৫২তম মিনিটে কাই হাভার্টজ গোল করে জার্মানিকে সমতায় ফেরান।

ম্যাচ শেষে টাইব্রেকারের নায়ক অরলান্দো গিল বলেন, আমরা প্রতিটি খেলোয়াড়, প্রতিটি খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেছি। সেই প্রস্তুতির কারণেই আমি মাত্র দুটি পেনাল্টি থেকে গোল হজম করেছি। এই জয় প্যারাগুয়ের সব মানুষের জন্য।

ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ৪১তম অবস্থানে থাকা প্যারাগুয়ে এ ম্যাচে ছিল বাজির বাজারের সবচেয়ে বড় আন্ডারডগ। অন্যদিকে জার্মানি ছিল বিশ্বের ১০ নম্বর র‌্যাংকধারী দল।

শেষ ষোলোয় আগামী শনিবার ফিলাডেলফিয়ায় ফ্রান্স ও সুইডেন ম্যাচের বিজয়ীর মুখোমুখি হবে প্যারাগুয়ে। সেই ম্যাচে জিতলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীর বছরে তারা ৯ জুলাই কোয়ার্টার-ফাইনাল খেলতে ফক্সবরোয় যাবে।

বড় টুর্নামেন্টে এর আগে সাতটি টাইব্রেকারের মধ্যে ছয়টিতে জিতেছিল জার্মানি। ১৯৭৬ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়ার কাছে হারের পর টানা ছয়টি টাইব্রেকারে জয় পেয়েছিল তারা।

বিশ্বকাপে এর আগে দুই দলের দেখা হয় মাত্র একবার। ২০০২ সালের শেষ ষোলোতে জার্মানি ১-০ গোলে প্যারাগুয়েকে হারিয়েছিল। প্রায় সিকি শতাব্দী পর সেই হারের প্রতিশোধ নিল প্যারাগুয়ে।

এর আগে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পাঁচটি ম্যাচ খেলেও একবারও গোল করতে পারেনি প্যারাগুয়ে। একমাত্র ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে জাপানকে টাইব্রেকারে হারিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে উঠেছিল তারা। পরে চ্যাম্পিয়ন হতে যাওয়া স্পেনের কাছে বিদায় নেয়।

অন্যদিকে ২০১৪ সালের ফাইনালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ খেলল জার্মানি। ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালে তারা আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল। কিন্তু পরের দুই বিশ্বকাপেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল জার্মানদের।

গ্রুপ পর্বে ১০ গোল করে সবচেয়ে বেশি গোল করা দলগুলোর একটি ছিল জার্মানি। কিন্তু প্যারাগুয়ের ৪-৫-১ রক্ষণাত্মক বিন্যাস ভাঙতে তারা বারবার ব্যর্থ হয়। প্রথমার্ধে ৭৮ শতাংশ বলের দখল জার্মানির থাকলেও সেই আধিপত্য কাজে লাগাতে পারেনি দলটি।

প্যারাগুয়ের নিয়মিত ডিফেন্ডার ওমার আলদেরেতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ০-০ ড্র ম্যাচে চোট পাওয়ায় এই ম্যাচে খেলতে পারেননি। তার জায়গাতেই প্রথম একাদশে সুযোগ পান হোসে কানালে।

প্যারাগুয়ের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলের বড় হারে। এরপর পুরো দ্বিতীয়ার্ধ ১০ জন নিয়ে খেলেও তুরস্ককে ১-০ গোলে হারায় প্যারাগুয়ে। পরে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে গ্রুপ ডি-র তৃতীয় দল হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত করে তারা।