আয়োজনের নাম যখন ফিফা বিশ্বকাপ, আর আলোচনা যখন ফেবারিট দল নিয়ে সেখানে ব্রাজিল নামটা অবধারিত। বুঝতে শেখার পর বোদ্ধার কলামে, ভক্তের ভরসায় আর খেলোয়াড়দের নৈপুণ্যে পুরো ফুটবল দুনিয়াকে এভাবেই ভাবতে, বলতে কিংবা লিখতে দেখেছি। ব্যতিক্রম বোধহয় এবারই। ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আয়োজনে ব্রাজিলকে ফেবারিট তকমা দিতে নারাজ অনেকেই।
বিশ্লেষণের কাজ বোদ্ধাদের। সাধারণ দর্শকরা দেখছেন সাম্বার ছন্দে ভাটা পড়েছে। এ ভাবনা একেবারেই অমূলক নয়। পেলে, গারিঞ্চা, রোনালদো, রিভালদো, কাকা, কাফুদের যোগ্য উত্তরসূরী ব্রাজিল দলে নেই। আবার ২০০২ সালের পরে কোচ হিসেবে যারাই ডাগআউটে দাঁড়িয়েছেন তারাও ছিলেন প্রশ্নবিদ্ধ। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে তাই অধরা ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ট্রফি।
২০২৬ ঠিক একই জায়গায় ব্যতিক্রম। প্রথমবারের মতো সেলেসাওদের ডাগআউটে এসেছেন একজন বিদেশী। এই বিদেশী ভদ্রলোক যেনতেন কেউ নন। তিনি ডন, আধুনিক ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের অন্যতম সফল কোচ কার্লো আনচেলত্তি। যার ঝুলিতে ইউরোপের পাঁচটি বড় লিগের ট্রফি, পাঁচ পাঁচটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। কোচিং করিয়েছেন জিদান, কাকা, রোনালদো, পিরলো, দ্রগবা থেকে শুরু করে হালের ভিনিসিয়াস, জুড বেলিংহাম, মডরিচদের মতো আধুনিক খেলোয়াড়কে।
এই বিশ্বকাপে ডন কার্লোর অভিজ্ঞতাই তাই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় পুঁজি। বড় টুর্নামেন্টে নকআউট পর্বের বৈতরণী পার হওয়ার মন্ত্র তার থেকে ভালো কে জানে? ২০২৫ সালের মে মাসে দিশেহারা ব্রাজিলের দায়িত্ব নিয়ে একটু একটু করে সাজিয়েছেন দলকে। গড়েছেন আক্রমণভাগ, চেষ্টা করেছেন মাঝমাঠের ‘মিসিং পাজল’ খুঁজতে, ভরসা করেছেন অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী রক্ষণভাগের ওপর। ক্লাব শিষ্য ভিনিসিয়াসকে যেমন তিনি অবধারিতভাবে ডেকেছেন, মূল্যায়ন করেছেন নেইমারের অভিজ্ঞতাকেও। আনকোরা রায়ান থেকে ব্রাজিল লিগে খেলা ওয়েভারটন, লিও পেরেইরার মতো অচেনা নাম কিংবা দানিলো, লুকাস পাকেইতা আর অ্যালেক্স সান্দ্রোর মতো প্রায় হারিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়দের বেছে বেছে গড়েছেন স্কোয়াড।
ইতালিয়ান ডনের মুনশিয়ানার সর্বজনবিদিত। তার স্কোয়াডে প্রতিটি খেলোয়াড়ের ভূমিকা সুস্পষ্ট। সে কারণেই ধীরে ধীরে খোলস ছেড়ে বেরোতে শুরু করেছে ব্রাজিল। বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব আর ফ্রেন্ডলি ম্যাচে যে ছন্নছাড়া-দিশেহারা ব্রাজিল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠেছে নকআউটে।

মরক্কোর বিপক্ষে খেলছে ব্রাজিল। ছবি: রয়টার্স
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ড্র'র পর ব্রাজিলকে নিয়ে সমালোচনার পারদ ওঠে তুঙ্গে। কিন্তু হাইতি আর স্কটল্যান্ডের সঙ্গে দাপুটে জয় পেয়েছেন কার্লোর শিষ্যরা। হ্যাঁ, তারা তুলনামূলক কম শক্তিশালী। তবে আশার জায়গা হলো একজন মাস্টারমাইন্ডের অধীনে সেলেসাওদের এই ভাঙাচোরা দলের ছন্দে ফেরা।
না! ২০২৬ সালে ব্রাজিলের জার্সিতে ছয়টি তারকা বসবে, এতটাও আশাবাদী হওয়ার সময় আসেনি। তবে দীর্ঘদিন আঁধারে ডুবে থাকা দলটি এখন জানে তারা কী করতে চায়। স্কোয়াডে সব বড় বড় নাম অথচ মাঠে দিশেহারা! নিশ্চিতভাবে সেই অবস্থার অবসান কার্লো ঘটিয়েছেন।
স্কটল্যান্ডের সঙ্গে জয়ের পর ব্রাজিলের খেলার ধরনে বড়সড় পরিবর্তনের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া লক্ষণীয়। ব্রাজিলের জন্য এই টুর্নামেন্টে ভিনির জ্বলে ওঠা, দুই ম্যাচে তিনটি করে গোল কিংবা নেইমারের প্রত্যাবর্তনের চেয়েও বড় প্রাপ্তি উপযুক্ত ট্যাকটিকস খুঁজে পাওয়া। খেলোয়াড়ি দক্ষতা বিবেচনায় এই স্কোয়াডের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা রক্ষণভাগ হলেও ধীরে ধীরে জানান দিচ্ছে সুনিপুণ বোঝাপড়ার। সে কারণেই তিন ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করেছে তারা।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ কার্লো খুব সামান্য সময়ে দল সাজাতে পেরেছেন। সময়ের অভাবে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেও তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়েছে। এদিকে, স্কোয়াডের বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই জাতীয় দলে অনভিজ্ঞ।
গ্যাব্রিয়েল, মার্কুইনহোস, সান্তোস আর দানিলোর রক্ষণভাগ; ক্যাসেমিরো/ফ্যাবিনহো, পাকেইতা, ব্রুনোর মাঝমাঠ আর ভিনিসিয়াস, কুনহা ও রায়ানকে নিয়ে সাজানো আক্রমণভাগই সম্ভবত এই টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের শুরুর একাদশ। সুপারসাব বা বদলি হিসেবে থাকছেন নেইমার, এন্ড্রিক, এডারসনসহ বাকিরা। গোলবারে আপাতত এলিসনের ওপরেই আস্থা কোচের।
মরক্কোর বিপক্ষে রক্ষণভাগের সঙ্গে মাঝমাঠের বোঝাপড়ায় ঘাটতি ছিল। সমাধান এসেছে ক্যাসেমিরো কিংবা ফ্যাবিনহোকে আরো একটু নিচের দিকে নামিয়ে বক্স টু বক্স রোল দেয়ার মাধ্যমে। এই দুই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার তৃতীয় ম্যাচে জানান দিয়েছেন দায়িত্ব নিতে তারা প্রস্তুত। এদিকে, শুনতে অবাক লাগলেও বর্তমানে আক্রমণভাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়টির নাম ম্যাথিউস কুনহা। এই মুহূর্তে ভিনিসিয়াস ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় তারকা হলেও তাকে সেরাটা খেলতে হলে কুনহার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ব্রাজিলের এই নাম্বার নাইন কিন্তু প্রয়োজনে রক্ষণভাগকেও সহায়তা করতে ভোলেন না।
মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ সাজাতে নিভৃতে যে মানুষটি কাজ করেন তার নাম লুকাস পাকেইতা। রাফিনহার ইনজুরি বড় একটি ধাক্কা। তবে কার্লো সেটি সামলে নিয়েছেন রায়ান নামের তরুণটির অসামান্য স্পৃহা আর বিশ্বমঞ্চে নিজেকে প্রমাণের ক্ষুধা জাগিয়ে। অনভিজ্ঞ রায়ান ভুলভাল করছেন বটে কিন্তু তার ক্ষ্যাপাটে প্রেস তছনছ করে দিতে পারে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে। যার প্রমাণ মিলেছে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ভিনির প্রথম গোলের ক্ষেত্রে।
একক খেলোয়াড়ের অসামান্য নৈপুণ্য আধুনিক ফুটবলে যথেষ্ট নয়। বহুদিন ধরে নেইমারের কাঁধে ঐতিহ্যের ভার চাপিয়ে সুফল পায়নি ব্রাজিল। কার্লোর দর্শনও একক খেলোয়াড়নির্ভর নয়। তিনি চান এমন একটা স্কোয়াড যারা তার কৌশলের সফল প্রয়োগ ঘটাবেন মাঠে। গ্রুপপর্বের ম্যাচগুলোয় ব্রাজিলকে রক্ষণ থেকে আক্রমণে ওঠা কিংবা প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামানো দুই ক্ষেত্রেই প্রয়োজনমাফিক দ্রুততায় ফরমেশন বদলাতে দেখা গেছে। অর্থাৎ প্রতিটি খেলোয়াড়কে খুব সুনির্দিষ্ট করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন কোচ। সে কারণেই প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামানোর সময় ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে থাকা ক্যাসেমিরো বা ফ্যাবিনহো নিচে নেমে এলে কুনহাও সুতোয় বাঁধা ঘুড়ির মতো নেমে এসে দলকে সহায়তা করেন। সে কারণে মাঝমাঠে ফাঁকা জায়গার মওকা পাওয়ার সুযোগ কমে যায় প্রতিপক্ষের সামনে। ভিনিসিয়াস স্বভাবসুলভভাবে রক্ষণভাগকে সহায়তায় আগ্রহী নন, সেদিকটা নজর রাখার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন পাকেইতা। আর দ্বিতীয়ার্ধে প্রয়োজনমাফিক নেইমার, মার্টিনেল্লি, এন্ড্রিকদের বদলি হিসেবে নামানো হচ্ছে।

নেইমার। ছবি: রয়টার্স
এভাবেই একটু একটু করে গড়ে উঠছে সেলেসাও স্কোয়াডের বোঝাপড়া। এটি যেমন সবচেয়ে শক্তির জায়গা, আবার কোনো কারণে ব্যতিক্রমে হতে পারে ছন্দপতন। ম্যাথিউস কুনহাকে শুরুর একাদশে রাখার যেমন বিকল্প নেই তেমনই শুরুর একাদশে নেইমারকে রাখার কোনো সুযোগই নেই। এমনকি ফাইনালে পৌঁছালেও স্কোয়াডের বোঝাপড়া ঘাটতি হতে পারে এমন কাউকেই শুরুর একাদশে রাখলে প্রত্যাশিত ফলাফল নাও আসতে পারে। তাই নেইমারের মতো অভিজ্ঞ ও দুর্দান্ত খেলোয়াড়কে শেষের ২০-৩০ মিনিট খেলিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে বোকা বানানোই হবে এই বিশ্বকাপে তার থেকে সর্বোত্তম প্রাপ্তি।
তবে ভুলে গেলে চলবে না ব্রাজিলের এই ছন্দে ফেরার ইঙ্গিতের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তিমত্তা কিন্তু ভিনিসিয়াসের ফর্মে ফেরা। প্রত্যাশিত ফলাফলের জন্য তো বটেই স্কোয়াডের মনোবল ধরে রাখতে দলের মহাগুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়টির ছন্দে থাকা জরুরি। কারণ দিনশেষে ফুটবল গোলের খেলা। স্কোরার এখানে শেষ কথা। ভিনিও সম্ভবত পাঁচ তারকার জার্সির ভার বুঝে প্রিয় গুরুর ছত্রচ্ছায়ায় ফিরে ক্ষ্যাপাটে আচরণকে রেখে আসছেন স্টেডিয়ামের বাইরে।
এতকিছুর বাইরে ব্রাজিলের জন্য এবার আরও একটা আশীর্বাদ রয়েছে। সেটা হলো ফেবারিট তকমাটা না থাকা। প্রত্যাশার পারদ নিম্নগামী হওয়ায় সেলেসাওরা এবার নির্ভার। ২৯ জুন পরবর্তী রাউন্ডের খেলায় জাপানের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল।
ডাগআউটে কার্লোস দুঙ্গার ব্যর্থ কৌশল কিংবা তিতের দিশেহারা আচরণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া সাম্বার ছন্দ কবে ফিরবে সে প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। এই বিশ্বকাপ ব্রাজিলের কাছে কেবলই হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ। আনচেলত্তির শিষ্যরা জাপানি সামুরাই ঠিকঠাক মোকাবিলা করতে পারলে আরো কিছুদিন আশায় বুক বেধে থাকবে পৃথিবীর অসংখ্য ফুটবলভক্ত। আর বিশ্বকাপ জেতা? সে তো ফুটবল বিধাতার লিখে রাখা নিয়তি! কে জানে কার পায়ে ভর করে কোন জার্সিতে এবার খচিত হবে একটি নতুন তারকা। পরিশেষে মনে করিয়ে দিই, কার্লো ভ্রু ওল্টালে উল্টে যায় বহু হাইভোল্টেজ ম্যাচের সমীকরণ। ব্রাজিলভক্তরা তাই বাড়তি আশায় ভর না করে প্রিয় দলের নতুন ধাঁচের খেলা উপভোগ করুন। ডন কার্লিওনি যে অধ্যায়টা শুরু করলেন, তা নিশ্চিতভাবে এক সুন্দর ভবিষ্যতের সূচনা।














