মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের বাজারে সরিষার তেলের জন্য বিখ্যাত ছিল চৌমুহনী। নোয়াখালী জেলার বাণিজ্যকেন্দ্র চৌমুহনীতে উৎপাদিত সরিষার তেল ছিল গুণে ও মানে অনন্য। টানা প্রায় ৫০ বছর নিজের অবস্থান ধরে রাখার পর এখন বিলুপ্তির পথে শিল্পটি। এরই মধ্যে জেলার ৪০টি সরিষা তেলের মিল বন্ধ হয়ে গেছে। হাতে গোনা যে চার-পাঁচটি চালু রয়েছে সেগুলোতেও দেখা দিয়েছে শ্রমিক সংকট। মূলত সয়াবিন তেলের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা, পুঁজি আর কাঁচামাল সংকটকেই এ শিল্প ধ্বংসের কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন্ধ হয়ে যাওয়া তেলের মিলগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো মেঘনা অয়েল মিল। ১৯৭২ সালে যাত্রার পর খুব দ্রুত এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এক পর্যায়ে স্থানীয় বাজারের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেঘনা অয়েল মিলের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব বড় বাজারে। মেঘনা অয়েল মিলের বর্তমান স্বত্বাধিকারী মহিউদ্দিন আহমদ ভূঁইয়া বলেন, চাহিদা মেটাতে উৎপাদন বাড়াতে হয় তাদের। টানা ২০ বছর বাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছিল মেঘনা অয়েল মিলের সরিষার তেল। কিন্তু দেশে রাজনৈতিক পালাবদলের এক পর্যায়ে নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে টেলিভিশনে সয়াবিন তেলের বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু হয়। বড় কোম্পানির আমদানি করা তেলের চটকদার বিজ্ঞাপন, সয়াবিন তেল স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিমুক্ত এমন দাবিসহ নানামুখী প্রচারের কারণে সে সময়ই মূলত ধস নামে সরিষার তেলের ব্যবসায়।

মহিউদ্দিন আহমদ ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, নব্বইয়ের দশক থেকে মিলের খুঁড়িয়ে চলার দিন শুরু হয়। এক পর্যায়ে বাজারে ভোজ্যতেল হিসেবে সরিষার চাহিদা কমতে শুরু করে। সয়াবিন দখল করে নেয় বাজারের মূল অংশ। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় বছর পাঁচেক আগে থেকে বাধ্য হয়ে বেশকিছু ঘানি বন্ধ করে দেন। বর্তমানে তার মিলের ২৬ জোড়া ঘানি বন্ধ রয়েছে।

কেবল মেঘনাই নয়। সময়ের সঙ্গে বন্ধ হয়েছে চৌমুহনীর শ্রীশ্রী গোবিন্দ, শ্রী দুর্গা, মেসার্স মতি ও আদর্শ অয়েল মিলসসহ প্রায় ৪০টি মিল। বর্তমানে বাজারের শ্রী গোপাল, মেসার্স হাজী, রাজাপুরিয়া, রোকেয়া ও নবযুগ অয়েল মিলসসহ হাতে গোনা কয়েকটি সরিষা তেলের মিল চলছে। যদিও আগের চেয়ে অর্ধেকের কম পরিমাণে তেল উৎপাদন করেন তারা। রয়েছে কাঁচামাল ও শ্রমিক সংকট। শিল্পে সংকট দেখা দেয়ার কারণে অনেক পুরনো শ্রমিকই পেশা পরিবর্তন করেছেন। ফলে প্রয়োজনের সময় দক্ষ শ্রমিকও পাওয়া যায় না।

তবে সরিষার তেলের বাজার আবার চাঙ্গা হচ্ছে বলে জানালেন মেঘনা অয়েল মিলের বর্তমান মালিক। তিনি বলেন, এখন মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসকরা সয়াবিন বা পাম অয়েলের বদলে সরিষার তেল খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। ফলে এখন আবার সরিষার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু পুঁজি ও দক্ষ জনবল না থাকায় চৌমুহনীর এ খাত এখনো ঝিমিয়ে রয়েছে। তবে ব্যাংক ও সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে এ খাতকে পুনর্জীবিত করা সম্ভব।

ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত গোপাল অয়েল মিলসের ম্যানেজার বলেন, সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে সরিষা তেলের কারখানায়। কারণ দেশে উৎপাদিত সরিষায় সংকুলান না হওয়ায় বেশির ভাগ সরিষা আমদানি করা হতো ইউক্রেন, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ফ্রান্স থেকে। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেন ও রাশিয়া থেকে কাঁচামাল আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। যেটুকু আসছে তার দামও চড়া। ফলে চাহিদা থাকলেও তেল উৎপাদন কমে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের মাটিতে সরিষা আবাদ বাড়ানো গেলে এবং সরকারিভাবে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে পারলে দেশের বাজারে ভোজ্যতেল হিসেবে সরিষা আবারো তার স্থান ফিরে পেতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় তদারকি বাড়িয়ে যথাযথ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা গেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে সরিষার তেল রফতানিও করা সম্ভব।

এ বিষয়ে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান জানান, এ শিল্পে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে মাসিক সমন্বয় সভায় আলোচনা করবেন তিনি। চৌমুহনীর সরিষা তেলের বাজার যেন আবারো আগের অবস্থানে ফিরতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।