মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলায় অতিদরিদ্রদের জন্য ৩৬ দিনের কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) প্রকল্পের ৮৯০ জন সুবিধাভোগীর অ্যাকাউন্টে অতিরিক্ত ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা চলে এসেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ভুলে। এভাবে কয়েকটি জেলার মোট ১০টি উপজেলায় মোট ৮ কোটি ৯২ লাখ  টাকা চলে গেছে সুবিধাভোগীর অ্যাকাউন্টে। এদিকে অতিরিক্ত টাকা ফেরত আনার জন্য মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চিঠি দিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের। চেয়ারম্যানরা উপকারভোগীদের কার্যালয়ে ডেকে এনে টাকা ফেরত দেয়ার জন্য বলছেন। সামান্য কিছু টাকা ফেরত এলেও বেশির ভাগই আসেনি।

জানা গেছে, মহম্মদপুর উপজেলার আটটি ইউনিয়নের ২ হাজার ৬৬১ জন দরিদ্র সুবিধাভোগীর প্রাপ্য পারিশ্রমিক ছিল ৯ হাজার ২০০ টাকা করে। এর সঙ্গে কারো অ্যাকাউন্টে অতিরিক্ত ১ লাখ ২ হাজার টাকা, কারো অ্যাকাউন্টে অ্যাকাউন্টে ৯২ হাজার,  কারো অ্যাকাউন্টে ১ লাখ ৭ হাজার টাকা জমা হয়। উপজেলার আটটি ইউনিয়নের ৮৯০ সুবিধাভোগী প্রায় ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা কয়েক দফায় তুলে খরচ করে ফেলেছেন।

বণিক বার্তার বিভিন্ন প্রতিনিধি জানাচ্ছেন, দেশের বিভিন্ন জেলার মোট ১০টি উপজেলায় এ ধরনের অতিরিক্ত অর্থ বিতরণের ঘটনা ঘটেছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডেসিমেল উঠে যাওয়ায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) প্রকল্পের ৮৯০ সুবিধাভোগীর অ্যাকাউন্টে অতিরিক্ত ৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা অতিরিক্ত চলে যায়। এটি গত ২৫ জুনের ঘটনা। বিষয়টি বোঝার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা লেনদেন বন্ধ করে দিই। এরই মধ্যে অতিরিক্ত বিতরণ হওয়া অর্থের ৮৫ শতাংশ রিকোভারি হয়েছে। বাকিটাও হয়ে যাবে। কোনো ইনটেনশন থেকে এমন ঘটনা কেউ ঘটিয়েছে বলে আমার মনে হয়নি। তার পরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে বিস্তারিত বোঝা যাবে। এমন ঘটনা সর্বমোট আট উপজেলায় ঘটেছে।

প্রকল্পের অতিরিক্ত টাকা তুলে খরচ করেছেন মহম্মদপুরের এমন কয়েকজন দরিদ্র উপকারভোগী জানান, তারা মনে করেছিলেন ঈদের আগে সরকার তাদের বোনাস অথবা অনুদান দিয়েছে। সেজন্য তারা টাকা তুলে খরচ করে ফেলেছেন। এখন তাদের পক্ষে এককালীন ফেরত দেয়া সম্ভব নয়। টাকা ফেরত দিতে তারা সময় চান।

এ ধরনের ভুল কী করে হলো, সেই অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন জেলার ১০ উপজেলায় মোট ৯ হাজার ৮৪৬ জন শ্রমিকের বিপরীতে চাহিদা এসেছিল ছিল ৮ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। সরকারের দিক থেকে প্রতি ১ হাজারে ৭ টাকা ক্যাশ আউট চার্জ যোগ করার পর এ অংক দাঁড়ায় ৮ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৪৭২ টাকা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ভুলের কারণে শ্রমিকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে ৮২ কোটি ৩৭ লাখ ৮৭ হাজার ৪২৭ টাকা। এ ৮২ কোটিরও বেশি টাকাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের স্বাক্ষরে অনুমোদনের জন্য চলে যায় আইবাস ও এজি অফিসে। আইবাস একটি স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার। আইবাস ও এজি অফিসের অনুমোদনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক এ টাকা ছাড় করে দেয় সোনালী ব্যাংকে নগদের ট্রান্সকাম সেটলমেন্ট অ্যাকাউন্টে। সেখান থেকে টাকা যায়, গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে। পুরো প্রক্রিয়ায় মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের কিছু করার সুযোগ নেই।

বণিক বার্তার কাছে আসা বিভিন্ন চিঠি ও নথি দেখে বোঝা যায়,  ডাটা এন্ট্রির গড়বড়ের কারণেই সরকারের এত বেশি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বিভিন্ন সূত্র বলেছে, যে এক্সেল ফাইলে ডাটা এন্ট্রি দেয়া হয় সেখানে দশমিকের পরও দুই ঘর ছিল, কিন্তু যে এক্সেসল ফাইলসহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সরকারের অনুমোদনের জন্য তোলে সেখানে কোনো দশমিকের ঘর ছিল না। ফলে যে শ্রমিকের ২ হাজার ৮১৯ দশমিক ৬ টাকা পাওয়ার কথা তিনি পেয়ে গেছেন ২৮ হাজার ১৯৬ টাকা। ডাক বিভাগের মোবাইল আর্থিক সেবা নগদের মাধ্যমে গত ২৫ জুন এই টাকা বিতরণ করা হয়। বিতরণের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর তাদের ভুলের বিষয়টি বুঝতে পেরে মজুরি বিতরণ হওয়া অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করার জন্য নগদকে নির্দেশ দেয়। তারপর থেকে ওই অ্যাকাউন্ট বন্ধ রয়েছে। তবে এরই মধ্যে অনেক অ্যাকাউন্ট থেকে বেশকিছু টাকা ক্যাশআউট হয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে নগদের পাবলিক কমিউনিকেশন্স বিভাগের প্রধান জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের সরকারি অর্থ বিতরণে কোনো মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানই বিতরণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট থাকে না। প্রয়োজনে সরকার উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি করে বিষয়টি যাচাই করতে পারে।’