সারা দেশে আঞ্চলিক ও মহাসড়কের মধ্যে দুর্ঘটনাপ্রবণ অংশে ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। প্রায় দুই দশক আগে নেয়া সিদ্ধান্তের আলোকে এরই মধ্যে ২১টি সেন্টার নির্মাণ শেষ হয়েছে। দুর্ঘটনাপ্রবণ ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পাশে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় শিবচর ট্রমা সেন্টারটি। তিন বছর আগে উদ্বোধন হলেও জনবল না থাকায় সেন্টারটি এখনো চালু হয়নি। ফলে সরকারি স্থাপনাটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২২ সালে নির্মাণকাজ শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় আধুনিক এ ট্রমা সেন্টারটি। তবে জনবল নিয়োগ না পাওয়ায় এখনো এর কার্যক্রম শুরু হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় ভবনের ফ্যান, পানির কল, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ অনেক কিছুই চুরি হয়ে গেছে। চারপাশে আগাছায় ভরে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে এমন ২১টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এর মধ্যে ১০টি ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ও ১১টি ২০১০ সালে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। মহাসড়কের পাশে ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্দেশ্য ছিল দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত সেখানে নিয়ে যাওয়া এবং চিকিৎসা দেয়া, যাতে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়। প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে সাতজন পরামর্শক চিকিৎসক (কনসালট্যান্ট), তিনজন অর্থোপেডিকস সার্জন, দুজন অ্যানেসথেটিস্ট (অবেদনবিদ), দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ ১৪ জন চিকিৎসক, ১০ জন নার্স এবং ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফার, টেকনিশিয়ানসহ ৩৪টি পদ সৃজনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো সেন্টারেই পদ অনুযায়ী জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সরঞ্জামও দেয়া হয়নি।
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ রাজধানীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে। কিন্তু দ্রুতগামী যানবাহন ও চালকদের অসচেতনতার কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। শিবচর হাইওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক বছরে এক্সপ্রেসওয়েতে ১৩৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৩১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে দুই শতাধিক মানুষ।
শিবচর হাইওয়ে থানার ওসি মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘এক্সপ্রেসওয়েতে প্রায় সময়ই দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিতে পারলে তাদের জীবন রক্ষা করা যেত। তাই ট্রমা সেন্টারটি দ্রুত চালু করা জরুরি।’
স্থানীয়দের দাবি, ট্রমা সেন্টারটি সচল থাকলে এসব দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হতো। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনায় ঝরছে প্রাণ, অথচ কোটি টাকার সরকারি স্থাপনা পড়ে আছে অব্যবহৃত। স্থানীয়দের আশা, সরকার দ্রুত ট্রমা সেন্টারটি চালুর উদ্যোগ নেবে।
স্থানীয় বাসিন্দা সরোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এমন আধুনিক ট্রমা সেন্টার থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা না পাওয়া সত্যিই দুঃখজনক। কর্তৃপক্ষের অবহেলায় কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, অথচ মানুষ রাস্তায় মারা যাচ্ছে।’
ইমাদ পরিবহনের যাত্রী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনায় কেউ আহত হলে দ্রুত চিকিৎসার কোনো জায়গা নেই। ট্রমা সেন্টারটি চালু থাকলে অনেক প্রাণ রক্ষা পেত।’
চিকিৎসকরা বলছেন, দুর্ঘটনার পর প্রথম ১ ঘণ্টা, অর্থাৎ গোল্ডেন আওয়ারের মধ্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু শিবচরে ট্রমা সেন্টার অচল থাকায় আহতরা দ্রুত চিকিৎসা পাচ্ছেন না। ফলে মৃত্যু ও অঙ্গহানির সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
এ বিষয়ে মাদারীপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক অখিল সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ট্রমা সেন্টারটি চালু হলে প্রতিদিন চিকিৎসা সেবা দেয়া যাবে। এতে দুর্ঘটনায় আহতরা স্বাভাবিক জীবনে দ্রুত ফিরে আসতে পারবেন।’
মাদারীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ট্রমা সেন্টারে ৩৪টি পদ অনুমোদিত। এর মধ্যে ১৪ জন চিকিৎসক, ১০ জন নার্স, ফার্মাসিস্ট ও টেকনিশিয়ানসহ সহায়ক কর্মী রয়েছেন। কিন্তু এখনো কোনো পদে নিয়োগ না হওয়ায় ভবন থাকলেও চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে মাদারীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শরীফুল আবেদীন কমল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণেই ট্রমা সেন্টারটি চালু করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। জনবল অনুমোদন ও পদায়ন সম্পন্ন হলে দ্রুত এটি সচল করা হবে।’










