কভিড-১৯ সংক্রমণ পরিস্থিতিতে চলতি বছরের মার্চ থেকে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছিল। সংক্রমণ ঠেকাতে ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি। এ ছুটি শেষ হওয়ার পর জুন থেকে সীমিত পরিসরে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু হয়। সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই এ সময়ের পর থেকে সবকিছু আবার আগের মতো স্বাভাবিক হতে শুরু করে। রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত সবক্ষেত্রেই মানুষের চলাচল স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এ অবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি ফিরতে শুরু করেছে। যদিও বেশকিছু খাতের ব্যবসা এখনো পূর্বাবস্থায় ফেরেনি।
বিভিন্ন খাতের তালিকাভুক্ত ৫৩টি কোম্পানির আর্থিক ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সিমেন্ট, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক, তথ্য প্রযুক্তি, বিবিধ, ওষুধ ও রসায়ন এবং টেলিযোগাযোগ খাতের কোম্পানিগুলো ভালো করেছে। সিরামিক, প্রকৌশল, কাগজ ও মুদ্রণ, সেবা ও আবাসন, চামড়া এবং ভ্রমণ ও অবকাশ খাতের কোম্পানিগুলো ভালো করতে পারেনি। জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর ব্যবসা কমলেও বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসা তুলনামূলক ভালো ছিল। একই সময়ে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়।
তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার প্রভাবে শতভাগ রফতানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠান যেগুলো অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে বিবেচিত নয় তাদের ব্যবসায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে ওষুধ ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসা যেগুলো অত্যাবশ্যকীয় সেসব প্রতিষ্ঠান এ সময়ে ভালো ব্যবসা করেছে। এ বছরের এপ্রিল-জুন সময়ের তুলনায় জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। যদিও অনেক প্রতিষ্ঠানই এর আগের বছর স্বাভাবিক সময়ে যে পরিমাণ ব্যবসা করেছিল, সেটিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। তবে সামনের দিনগুলোতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার যে শঙ্কা রয়েছে তা সত্ত্বেও স্থানীয় বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে এ সময় বিদেশে রফতানি বাড়বে নাকি কমবে সেটি এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সিমেন্ট খাতের কোম্পানিগুলোর ব্যবসা এ সময়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এ খাতের মেঘনা সিমেন্ট ও প্রিমিয়ার সিমেন্টে ব্যবসা চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে। এর মধ্যে মেঘনা সিমেন্টের বিক্রি প্রথম প্রান্তিকে আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ২২৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলসের বিক্রি আগের বছরের তুলনায় চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে ২৬১ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সিরামিকস খাতের কোম্পানি শাইনপুকুর সিরামিকসের ব্যবসা চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ কমে ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিএসআরএম স্টিলের ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, জিপিএইচ ইস্পাতের ৬৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ, ইফাদ অটোজের ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং রংপুর ফাউন্ড্রির বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে এ সময়ে প্রকৌশল খাতের কোম্পানি বিবিএসের ২৯ শতাংশ, বিবিএস কেব্লসের ২৬ দশমিক ১৬, বিএসআরএম লিমিটেডের ২৪, কপারটেকের ৩৯ দশমিক ৬৯, দেশবন্ধু পলিমারের ২৪ দশমিক ৬৮, কে অ্যান্ড কিউয়ের ৪৭ দশমিক ৮২, কেডিএস লিমিটেডের ১, নাহি অ্যালুমিনিয়ামের ৩৯ দশমিক ১০, রানার অটোমোবাইলসের ৩৩ দশমিক ৫১ এবং ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবসা ৫ শতাংশ কমেছে।
ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম মুর্শেদ বণিক বার্তাকে বলেন, কভিডের কারণে এ বছরের এপ্রিল ও মে মাসে আমাদের ব্যবসা একেবারেই হয়নি। এর পর থেকে ধীরে ধীরে ব্যবসায় গতি ফিরতে শুরু করে। আমাদের প্রচেষ্টা ছিল গ্রাহকদের সেবার মাধ্যমে সন্তুষ্ট করার। এর ফলে করোনার ধাক্কা সামলে পরবর্তী মাসগুলোতে আমরা ভালো ব্যবসা করতে পেরেছি। যদিও প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় গত বছরের তুলনায় ব্যবসা কম হয়েছে। কিন্তু এ চ্যালেঞ্জিং সময়েও ইলেকট্রনিকস পণ্যের ব্যবসায় পারফরম্যান্স বিবেচনায় ওয়ালটন তার অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।
খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২০২০-২১ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে ন্যাশনাল টির ৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং অলিম্পিক লিমিটেডের ব্যবসা বিক্রি আগের বছরের একই সময়ে তুলনায় ১৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেড়েছে। মূলত করোনার কারণে চা, বিস্কুট ও কনকেশনারি জাতীয় পণ্যের চাহিদা বাড়ার কারণে কোম্পানিগুলোর ব্যবসা বেড়েছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে অ্যাসোসিয়েটেড অক্সিজেনের ১০ শতাংশ, শাহজীবাজার পাওয়ারের ২৮ দশমিক ৮১, সামিট পাওয়ারের ৭০ ও ইউনাইটেড পাওয়ারের ২৩৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ বিক্রি বেড়েছে। অন্যদিকে এ সময়ে ডেসকোর ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ডরিন পাওয়ারের ৬ শতাংশ, এমজেএলবিডির ৫ শতাংশ ও তিতাস গ্যাসের বিক্রি কমেছে ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে আমরা নেটওয়ার্কসের ১৪ শতাংশ, এডিএন টেলিকমের ১৩ দশমিক ২৪, বিডিকমের ২ দশমিক ৫৭ ও আইটিসির রাজস্ব চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে এ খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে এ সময়ে ব্যবসা কমেছে আমরা টেকনোলজিসের ২ দশমিক ২৫ শতাংশ।
বিবিধ খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেক্সিমকো লিমিটেডের বিক্রি চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে আগের বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেড়ে ৬৫৩ কোটি ৪২ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
কাগজ ও মুদ্রণ খাতের কোম্পানি বসুন্ধরা পেপারের বিক্রি চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে আগের বছরের তুলনায় ২২ দশমিক ৪০ শতাংশ কমে ১৯৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
করোনার সময়ে ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। এখন পর্যন্ত পাওয়ার ফলাফল অনুসারে, এ সময়ে এসিআই লিমিটেডের ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ, এসিআই ফরমুলেশনন্সের ১২ দশমিক ৮১, একমি ল্যাবরেটরিজের ১১ দশমিক ৪৭, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ৯ দশমিক ৮৭, ইবনে সিনার ১২ দশমিক ৫১, রেনাটা লিমিটেডের ১৪ দশমিক ৮৫, সিলভা ফার্মাসিউটিক্যালসের ১ দশমিক ৯০ এবং স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের বিক্রি ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়েছে।
করোনার চিকিৎসায় ব্যবহূত বেশকিছু ওষুধ এবং মাস্ক ও পিপিই রফতানির মাধ্যমে এ সময়ে ভালো ব্যবসা করেছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও বেক্সিমকো লিমিটেড। জানতে চাইলে বেক্সিমকো গ্রুপের নির্বাহী পরিচালম মোহাম্মদ আসাদউল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার কারণে ব্যবসায় খারাপ সময় আসবে সেটি অনুধাবন করতে পেয়ে আমরা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণ করেছি। ফলে একদিকে আমাদের ব্যবসা কমলেও অন্যদিকে করোনার চিকিৎসায় ব্যবহূত কিছু ওষুধ এবং মাস্ক ও পিপিই বিদেশে রফতানি করে সেটি পূরণ করেছে। ব্যবসায়িক কৌশলের কারণেই এ চ্যালেঞ্জিং সময়েও বেক্সিমকো উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বলে জানান তিনি।
সেবা ও আবাসন খাতের কোম্পানি ইস্টার্ন হাউজিংয়ের ব্যবসা করোনার প্রভাবে চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে এর আগের বছরের তুলনায় অর্ধেক কমে গেছে। এ সময়ে কোম্পানিটির বিক্রি হয়েছে ৩৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। যেখানে এর আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ৬৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা।
চামড়া খাতের এপেক্স ফুটওয়্যার ও এপেক্স ট্যানারি দুটোরই ব্যবসা কমেছে। এর মধ্যে এপেক্স ফুটওয়্যারের ৪ দশমিক ১৮ এবং এপেক্স ট্যানারির ১৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ ব্যবসা কমেছে।
করোনা সময়ে টেলিযোগাযোগ খাতের কোম্পানি বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) ভালো করেছে। চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির ব্যবসা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৭৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে মিশ্র পারফরম্যান্স দেখা গেছে। চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে এ খাতের আর্গন ডেনিমসের ২৮ দশমিক ৭২ শতাংশ, এভিন্স টেক্সটাইলসের ৩৭ দশমিক ১১, সিমেটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের ১৩ দশমিক ৭৫, সোনারগাঁও টেক্সটাইলের ৬৮ এবং ভিএফএস থ্রেড ডায়িংয়ের ব্যবসা কমেছে ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে এ সময়ে মতিন স্পিনিংয়ের ১৪ দশমিক ১১ শতাংশ, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলের ১ দশমিক ১৪, শাশা ডেনিমসের ২৬ দশমিক ৪৭ এবং স্কয়ার টেক্সটাইলসের বিক্রি ২ দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়েছে।
জানতে চাইলে স্কয়ার টেক্সটাইলসের নির্বাহী পরিচালক (হিসাব ও অর্থ) মো. কবীর রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার কারণে গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) আমাদের ব্যবসায় ধস নেমেছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যবসা বাড়ার কারণ হচ্ছে কারখানায় বিএমআরই করার পাশাপাশি নতুন একটি ছোট ইউনিট যোগ হওয়ার কারণে এ সময়ে উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে ৬ শতাংশ। এর বিপরীতে তুলার দাম কমে যাওয়ার কারণে পণ্যের দাম কমেছে ৪ শতাংশ। ফলে শেষ পর্যন্ত আমাদের ২ শতাংশের মতো মার্জিন ছিল। আশা করছি সামনের প্রান্তিকে ব্যবসায়িক পরিস্থিতি আরো উন্নতি হবে।
ভ্রমণ ও অবকাশ খাতের কোম্পানি ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টসের ব্যবসা করোনার প্রভাবে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির বিক্রি এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮২ শতাংশ কমে ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।










