উপকূলীয় জেলা খুলনা দেশের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দুর্যোগকবলিত অঞ্চল। ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাস হলে যে কয়টা জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, খুলনার কয়রা তার মধ্যে অন্যতম।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দুদিনের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি লঘুচাপ তৈরি হতে পারে। পরে এটি আরো শক্তি সঞ্চয় করে এবং নিম্নচাপে পরিণত হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলে এর নাম হবে ‘রেমাল’। এটি ২৫ মে ভূভাগে প্রবেশ করতে পারে, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে আঘাত হানতে পারে।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তারিক উজ জামান জানান, তিনদিক থেকে নদীবেষ্টিত এ উপজেলা। জেলা শহর থেকে সড়কপথে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে এর অবস্থান। এ উপজেলাকে ঘিরে রেখেছে কপোতাক্ষ, কয়রা ও শাকবাড়িয়া নদী। এ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নই সুন্দরবনের সীমানায় অবস্থিত। এ কারণে ছোটখাটো দুর্যোগেও প্লাবিত হয়ে পড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ে।
স্থানীয় সংবাদকর্মী ও ‘ক্লাইমেট মুভমেন্ট বাংলাদেশ’-এর উপজেলা সমন্বয়ক শেখ সিরাজউদ্দৌলা লিংকন বলেন, ‘উপকূলীয় এ জনপদের মানুষের কাছে আতঙ্কের মাস মে। গত কয়েক বছরে একাধিক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না পারা উপকূলবাসী প্রতি বছর এ মাসে অরক্ষিত উপকূল রক্ষা বাঁধগুলো নিয়ে শঙ্কায় থাকে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ঝড়ের চেয়ে আমাদের বড় ভয় বেড়িবাঁধ। উপকূল সুরক্ষায় অর্ধশত বছরেরও আগে নির্মিত বেড়িবাঁধ এখন আর সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা সামাল দিতে পারছে না। আগে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো কোনো রকমে টিকে আছে।’
খুলনা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় জানায়, গত এক দশকে মে মাসে সাতটি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালের ৪ মে ঘূর্ণিঝড় ফণী, ২০২০ সালের ২০ মে আম্পান, ২০২১ সালের ২৬ মে ইয়াসে সুন্দরবনসংলগ্ন কয়রায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এছাড়া ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলা, ২০১৬ সালের ২১ মে ঘূর্ণিঝড় রোয়ানু, ২০১৭ সালের ৩০ মে ঘূর্ণিঝড় মোরা ও ২০১৩ সালের ১৬ মে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন আঘাত হানে। এ কারণে মে মাসেই আরেকটি ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাসে আতঙ্কিত কয়রার মানুষ।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতি বছর উপকূলে নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় থেকে ক্ষতি কমাতে সরকারের বড় পরিকল্পনা দরকার বলে মনে করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত। তিনি বলেন, ‘নানা কারণে বাঁধগুলোর সক্ষমতা কমেছে। পানিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মাটির কণাগুলো একে অন্যের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে রাখার ক্ষমতা হারাচ্ছে, অর্থাৎ ঝুরঝুরে হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভাঙন বাড়ছে, বাঁধগুলো টিকছে না।’
কয়রার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুস সালাম খান বলেন, ‘এতকাল যত দুর্যোগ এসেছে, অধিকাংশ মে মাসে। এ কারণে মে মাস এলে আতঙ্কে থাকে উপকূলবাসী। ঘূর্ণিঝড় না হলেও এ সময় নদীর পানি বেড়ে বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়।’
টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি বহুদিনের বলে জানান কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি বিদেশ রঞ্জন মৃধা। তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের জানালেও তারা শুধু আশ্বাস দেন। পরিকল্পিত ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় প্রতি বছর ভাঙন দেখা দেয়। এজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের গাফিলতিই দায়ী। কারণ যখন জোয়ারের পানি বাঁধ উপচে পড়ার উপক্রম হয় তখন স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এলাকাবাসী। এ সময় বাঁধ মেরামতে উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। এতে একদিকে কাজের ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে এসব কাজ হাত ঘুরে নিম্নমানের হয়।’
বিদেশ রঞ্জন মৃধা আরো জানান, উপকূলে চিংড়ি চাষের কারণে যথেচ্ছভাবে বেড়িবাঁধ কাটাছেঁড়া করা হয়। চিংড়িচাষীরা বেড়িবাঁধ ছিদ্র করে কৃষিজমিতে নোনা পানি তোলেন। এতে বাঁধ মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ কারণে বাঁধ টিকছে না। এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে সম্প্রতি উপকূলের কয়রা-পাইকগাছা উপজেলার মানুষ লবণ পানির চিংড়িঘেরের বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছে।
এলাকাবাসী, জনপ্রতিনিধি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়রা সদর ইউনিয়নের মদিনাবাদ লঞ্চঘাট থেকে গোবরা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার, হরিণখোলা-ঘাটাখালী এলাকায় এক কিলোমিটার, ৬ নম্বর কয়রা এলাকায় ৬০০ মিটার, ২ নম্বর কয়রা এলাকায় ৫০০ মিটার, মহারাজপুর ইউনিয়নের মঠবাড়ি-দশহালিয়া এলাকায় দুই কিলোমিটার, উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের কাটকাটা থেকে শাকবাড়িয়া গ্রাম পর্যন্ত এক কিলোমিটার, কাশির হাটখোলা থেকে কাটমারচর পর্যন্ত ৭০০ মিটার, পাথরখালী এলাকায় ৬০০ মিটার ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের শেখেরকোনা, নয়ানি, শাপলা স্কুল, তেঁতুলতলার চর ও চৌকুনি এলাকায় তিন কিলোমিটারের মতো বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে।
ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের তালিকা করে বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও তা অনুমোদন হতে সময় লাগে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মশিউল আবেদীন। তিনি বলেন, ‘কয়রার উত্তর বেদকাশি ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে বাঁধ নির্মাণসহ প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান। সাতটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। এ প্রকল্প শেষ হলে ৩২ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিমুক্ত হবে।’
তবে এলাকাবাসী জানান, বাঁধ নির্মাণের এ কাজে বালি সরবরাহের জন্য স্থানীয় ড্রেজার মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ড্রেজার মালিকরা বাঁধের পাশের শাকবাড়িয়া নদী থেকে বালি তুলছেন। অব্যাহত বালি তোলায় সুন্দরবনে ভাঙন যেমন বাড়ছে তেমনি ঝুঁকিতে পড়ছে নির্মাণাধীন বাঁধও।
পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, ‘কয়রার ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের তালিকা করা হয়েছে। কিছু এলাকায় সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ না এলে কোনো সমস্যা হবে না।’
একেকটি দুর্যোগ উপকূলের চিত্র বদলে দেয় বলে জানিয়েছেন খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য রশীদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘দুর্যোগপ্রবণ এ এলাকা ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে টেকসই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হবে।’










