দেশের প্রথম আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রায় পৌনে দুই শতাব্দী আগে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা কলেজ। পাশ্চাত্যের কলাবিদ্যা, বিজ্ঞান ও দর্শনকে এ অঞ্চলের বিদ্যার্থীদের সামনে উন্মোচন করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। এরপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতেও শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি তার অগ্রযাত্রা এগিয়ে নিয়ে গেছে, যার সোনালি ফসল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। উনিশ শতকে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা কলেজ। তবে সময়ের বিবর্তনে প্রতিষ্ঠানটির সেই ঐতিহ্য এখন অনেকটাই ম্লান। জরাজীর্ণ অবকাঠামোর সঙ্গে মলিনতায় ঢাকা পড়ছে শিক্ষার মান। শ্রেণীকক্ষ, লাইব্রেরি, শিক্ষার পরিবেশ ও পাঠদান থেকে আবাসন—সবকিছু নিয়েই ছাত্রদের রয়েছে নানা অভিযোগ।
কলেজটির প্রধান ফটক দিয়ে সোজা ঢুকতেই চোখে পড়বে দুই তলাবিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন। যেখানে আনুষঙ্গিক কাজের পাশাপাশি বিজ্ঞানের বেশ কয়েকটি বিভাগের কার্যক্রমও চলে। পুরনো এ ভবনের অধিকাংশ দেয়ালেই দেখা দিয়েছে ফাটল। কোথাও কোথাও খসে পড়েছে ছাদের পলেস্তারা, কঙ্কালের মতো বেরিয়ে এসেছে রড। বেশির ভাগ রুমের দরজা-জানালার অবস্থা নাজুক। পাল্লা খুলে গেছে কিংবা ঝুলে আছে অনেক জানালার। লোডশেডিং হলে দিনের বেলায়ও পুরো ভবনে নেমে আসে রাতের আঁধার। তখন ক্লাস-পরীক্ষা চলে মোমবাতি জ্বালিয়ে।
রাজধানীর মিরপুর রোডে অবস্থিত দেশের প্রথম কলেজ হিসেবে ১৮৪১ সালের ২০ নভেম্বর যাত্রা শুরু ঢাকা কলেজের, যা একসময় শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র ছিল। দেশবরেণ্যদের অনেকেই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী। প্রাচীন এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দ আরো বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন কলেজটির প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ঢাকা কলেজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অতীতের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে এবং ক্রমেই এর মান বৃদ্ধি পাবে এটিই কাম্য। শিক্ষার মান বজায় রাখতে এবং আরো সমৃদ্ধ অবস্থানে যেতে শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো আবাসন ব্যবস্থাসহ পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত জরুরি। এর জন্য কলেজের পাশাপাশি সরকারকেও উদ্যোগী হতে হবে। কলেজটিতে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে বরাদ্দসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।’
কলেজটির কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্প্রতি কথা হয়। তারা জানান, দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও বর্তমানে ঢাকা কলেজে নানামুখী সংকট। বিশেষ করে স্নাতক পর্যায়ে চাহিদানুসারে শ্রেণীকক্ষ, ল্যাব, ব্যবহারিকের সরঞ্জামাদি ও আবাসনের সুযোগ-সুবিধার প্রচণ্ড ঘাটতি। অনেক বিভাগেই সেশন অনুযায়ী পর্যাপ্ত শ্রেণীকক্ষ ও ল্যাব সুবিধা নেই। ফলে এক বর্ষের পরীক্ষা শুরু হলে অন্য বর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষার সুযোগ থাকে না। একমাত্র লাইব্রেরিটিতে নেই পর্যাপ্ত আসন। আবাসন সংকটও তীব্র। ছাত্রাবাসগুলোর প্রতিটি কক্ষেই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, থাকতে হয় গাদাগাদি করে। ক্যাফেটেরিয়া ও ডাইনিংয়ের খাবারও বেশ নিম্নমানের।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার মান নিয়েও। তারা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার সিলেবাস-প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পান না। ফলাফল প্রকাশেও রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা।
গণিত বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেয়া হলে মান ভালো হবে, এমনটি বলা হয়েছিল। কিন্তু সত্যি বলতে পরিবর্তন এসেছে কেবল ক্লাসের উপস্থিতিতে। এখন পড়ান এক শিক্ষক, প্রশ্ন করেন আরেক শিক্ষক। অনেক সময় দেখা যায়, যা পড়ানো হয় তার সঙ্গে প্রশ্নের মিল থাকে না। ফলে অনেক পড়ালেখা করেও ফল খারাপ হয় এবং ছাত্ররা পড়ার আগ্রহ হারান।’
একসময় যেখান থেকে দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানের বিভাগগুলোয় এখন ল্যাব কক্ষের সংকট; নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। রসায়ন, প্রাণিবিদ্যা বিভাগসহ অধিকাংশ বিভাগেই ল্যাব কক্ষের সংখ্যা একটি বা দুটি, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে এক বর্ষের শিক্ষার্থীরা ল্যাব ক্লাস করলে অন্য বর্ষের ছাত্রদের অপেক্ষায় থাকতে হয়।
সরজমিনে কলেজটির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখা যায়, লে. শেখ জামাল একাডেমিক ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কার্যক্রম চলছে। প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর কলেজটিতে গ্রন্থাগারে আসন রয়েছে মাত্র ৬০টি। রিডিং রুমে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা জানান, ছাত্রাবাসগুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক সময় রুমে পড়ার পরিবেশ থাকে না। আবার ছাত্রাবাসের রিডিং রুমেও জায়গা অপ্রতুল। এ কারণে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পড়ার জন্য গ্রন্থাগারকে বেছে নেন। কিন্তু একাডেমিক দিনগুলোয় বিশেষ করে পরীক্ষার আগে অনেক শিক্ষার্থীই গ্রন্থাগারে পড়তে এসে জায়গা না পেয়ে ফিরে যান। শিক্ষার্থীদের জায়গা সংকুলানের কারণে রিডিং রুমের পাশে আরো দুটো শ্রেণীকক্ষ ব্যবহারের অনুমতি দেয়া আছে। সব মিলিয়ে লাইব্রেরিতে একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১৫০-১৮০ ছাত্র পড়তে পারেন, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
এছাড়া ছাত্রাবাসগুলোয় গিয়ে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি রুমেই শিক্ষার্থীরা গাদাগাদি করে অবস্থান করছেন। নিয়মানুযায়ী প্রতিটি রুমে ছয়জন করে ছাত্রের থাকার কথা থাকলেও আসন সংকটের কারণে কোনো কোনো রুমে ২০ জন করেও থাকছেন। জায়গা সংকটের কারণে এদের কেউ কেউ মেঝেতে থাকছেন। শিক্ষার্থীদের মুখ্য উদ্দেশ্য পড়ালেখা হলেও অধিকাংশ রুমেই পড়ার পরিবেশ নেই। এছাড়া অধিকাংশ ছাত্রাবাসেই শিক্ষার্থীদের খাবার তৈরি হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে।
শিক্ষার্থীদের এসব সংকটের কথা স্বীকার করেছেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ ইউসুফও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন একটা বড় সংকট অবকাঠামোগত সংকট। কয়েকটি ছাত্রাবাসে ছাত্ররা যে পরিবেশে থাকছে সেটি আসলেই মানবেতর। এসব ছাত্রাবাসে গেলে দেখা যায়, কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও ভবনে ফাটল ধরেছে, জানালার পাল্লা না থাকায় বৃষ্টির পানি ও ধুলাবালি চলে আসছে। এছাড়া আমাদের প্রশাসনিক ভবনের অবস্থাও অনেকটা একই। এসব ভবন সংস্কার দরকার। বিশেষ করে ছাত্রাবাসগুলো পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন। এরই মধ্যে আমরা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছাত্রাবাস সংস্কার শুরু করেছি। অন্যান্য ছাত্রাবাসের ক্ষেত্রেও শিগগিরই উদ্যোগ নেব। একটি মাস্টারপ্ল্যান করে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে অবকাঠামো সংকট দূর করার পরিকল্পনা আছে।’
শিক্ষার্থীদের প্রায় নিয়মিত পরিবহন নিয়েও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অর্ধেকের বেশি ছাত্র অনাবাসিক হলেও পরিবহন পুলে বাসের সংখ্যা কেবল আটটি। ফলে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকেই যাতায়াতের জন্য লোকাল বাসের ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব বাসে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রায়ই পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দ্বন্দ্ব হয়। সর্বশেষ গতকালও ভাড়া নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে পাঁচটি বাস আটকে রাখেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। হাসিব বিল্লাহ নামে এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, ‘অনেক সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাসের স্টাফরা খারাপ ব্যবহার করে। হাফ ভাড়া দিতে চাইলে নানাভাবে হয়রানি ও লাঞ্ছিত করা হয়।’
পরিবহন সংকট, লাইব্রেরি ও একাডেমিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে প্রফেসর মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা আছে একটি পৃথক লাইব্রেরি ভবনের। এটি নির্মাণ হলে পড়ার স্থানের সংকট থাকবে না। পরিবহনের বিষয়েও সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে।’
শিক্ষার মান আগের তুলনায় ভালো হয়েছে বলে দাবি করে অধ্যক্ষ বলেন, ‘আগে আমাদের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাস করত না। এখন আমরা উপস্থিতির বিষয়ে কঠোর হয়েছি এবং তারা নিয়মিত ক্লাস করছে। সেশনজটও কমে এসেছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার মান আরো বাড়বে। পরীক্ষা পদ্ধতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যারা অভিযোগ করছে তাদের একটি বড় অংশ অনিয়মিত শিক্ষার্থী। বাড়তি সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় তারা এ ধরনের অভিযোগ তোলে।’
শিক্ষার মান নিশ্চিতে কলেজে আসনসংখ্যা কমিয়ে আনা হচ্ছে জানিয়ে অধ্যক্ষ বলেন, ‘এরই মধ্যে আমাদের আসনসংখ্যা অনেক কমানো হয়েছে এবং সামনে আরো কমবে। শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে এল সুযোগ-সুবিধার সংকটও কমে আসবে এবং শিক্ষার মান বাড়বে।’










