শল্যচিকিৎসায় অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের (অবেদনবিদ) ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি শল্যচিকিৎসক ও অবেদনবিদ দুজনের ওপরই নির্ভর করে। এজন্য গোটা বিশ্বেই স্বাস্থ্য খাতে শল্যচিকিৎসক ও অবেদনবিদের পর্যাপ্ততার ওপর গুরুত্ব দেয়া হলেও খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য খাত চলছে সংকট নিয়ে। বিশেষ করে সরকারি স্বাস্থ্য খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোয় এ সংকট তুলনামূলক বেশি প্রকট। আর দক্ষ এ জনবল সংকটে রোগীর নিয়মিত অস্ত্রোপচারে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘসূত্রতা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য চিকিৎসকদের তুলনায় কম বেতন, সার্জনদের চেয়ে কম পরিচিতি ও যথেষ্ট সরকারি চাকরির সুযোগ না থাকায় চিকিৎসকরা সাধারণত অবেদনবিদ হতে চান না।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রোগীর অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয় বিশেষজ্ঞ শল্যচিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে। অজ্ঞান করার মাধ্যমে রোগীকে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুতের কাজটি করে, অবেদনবিদ। পাশাপাশি অজ্ঞান অবস্থায় হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর কার্যকারিতা ঠিক রাখা এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীর জ্ঞান ফেরানো ও ব্যথা প্রশমনের কাজটিও করেন অবেদনবিদ। বিভাগের ১০ জেলায় বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে অবেদনবিদ কর্মরত আছেন মাত্র ১৭ জন। অনুমোদিত অবেদনবিদের পদ খালি রয়েছে ৫৮টি। সে হিসেবে সরকারি প্রতি দুটি হাসপাতালের বিপরীতে অবেদনবিদ একজনেরও কম। বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোয় গড়ে শল্যচিকিৎসক রয়েছেন একজন। আর গড়ে প্রতি দুটি হাসপাতালের বিপরীতে অবেদনবিদ রয়েছেন একজনেরও কম। আবার গড়ে প্রতি তিনজন শল্যচিকিৎসকের বিপরীতে অবেদনবিদ আছেন মাত্র একজন। একইভাবে রয়েছে ল্যাব টেকনিশিয়ানের মতো জনবলের সংকট। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৬ দশমিক ৫০ শতাংশ শূন্যপদ নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবেদনবিদ এবং ল্যাব টেকনিশিয়ানের অভাবে অনেক সরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আবার শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় এসব সংকট আরো প্রকট। সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও সেবিকাদের ৭৫ শতাংশেরই পদায়ন হয়েছে শহরাঞ্চলে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্যমতে, নড়াইল জেলায় একটি পদের জন্য একজন অবেদনবিদ রয়েছেন। বাগেরহাটের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে অবেদনবিদের পদ রয়েছে সাতটি। সেখানে অবেদনবিদ রয়েছেন মাত্র একজন। চুয়াডাঙ্গায় অবেদনবিদের কোনো পদ নেই। এ কারণে সেখানকার সরকারি হাসপাতালে সার্জারি হয় না। সার্জারির জন্য রোগীদের অন্য জেলায় পাঠানো হয়। সাতক্ষীরায় সরকারি হাসপাতালগুলোয় অবেদনবিদের পদ রয়েছে নয়টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন চারজন। যশোরে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে এ পদের সংখ্যা চারটি থাকলেও চিকিৎসক আছেন দুজন। কুষ্টিয়ায় নয়টি পদের বিপরীতে অবেদনবিদ আছেন দুজন। ঝিনাইদহ জেলার সরকারি হাসপাতালে অবেদনবিদের পদ আটটি থাকলেও চিকিৎসক আছেন মাত্র দুজন। এছাড়া মাগুরায় আটটি পদ থাকলেও সবই শূন্য। মেহেরপুর জেলায় চারটি পদের জন্য একজনও চিকিৎসক নেই।
এছাড়া খুলনা জেলায় অবেদনবিদের পদ রয়েছে ২৫টি। আর কর্মরত রয়েছেন মাত্র চারজন। জেলার নয়টি উপজেলা এবং খুলনা শহরের সরকারি হাসপাতালগুলো পরিচালনার জন্য সামান্যসংখ্যক শল্যচিকিৎসক একেবারেই অপর্যাপ্ত। যে কারণে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেগুলোয় অস্ত্রোপচার কক্ষ থাকলেও অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে বছরের পর বছর ধরে।
চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা জানান, অবেদনবিদ সংকটে জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের বেশি টাকা খরচ করে জেলা শহরের বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে গিয়ে অস্ত্রোপচার করাতে হচ্ছে। এতে রোগীর আর্থিক হয়রানির সঙ্গে চিকিৎসায় সময়ও বেশি লাগছে। তাছাড়া বিশেষজ্ঞ অবেদনবিদ স্বল্পতার সুযোগে বেশি টাকা উপার্যনের জন্য অবেদনবিদরা ক্লিনিক বা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে ব্যস্ত থাকেন। এতে রোগীরা সঠিক সেবা পাচ্ছেন না।
শুধু অবেদনবিদই নয়, বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোয় দক্ষ জনবলের ক্ষেত্রেও রয়েছে অপর্যাপ্ততা। প্রায় ৬০ শতাংশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে দীর্ঘদিন। আর এসব হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসকের পদ খালি আছে ২৫ শতাংশ। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের বিপরীতে শল্যচিকিৎসক আছেন ১ দশমিক ২২ জন। ল্যাব টেকনিশিয়ান আছেন দশমিক ১৭ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ছয়টি হাসপাতালের জন্য ল্যাব টেকনিশিয়ান আছেন একজন। প্রতি হাসপাতালের বিপরীতে গড়ে দশমিক ৭৭ জন প্যাথলজিস্ট ও বায়োকেমিস্ট রয়েছেন। আর প্রত্যেক প্যাথোলজিস্ট বা বায়োকেমিস্টের বিপরীতে ল্যাব টেকনিশিয়ান আছেন দশমিক ২২ জন।
অবেদনবিদসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট মোকাবেলায় সরকার কাজ করছে জানিয়ে খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মঞ্জুরুল মুর্শিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগে প্রতিনিয়তই অবেদনবিদসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চাহিদা বাড়ছে। অবেদনবিদদের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের ক্ষেত্রেও আসন সীমিত। নিয়োগের পদ বাড়ানোর জন্য যেমন সরকারের প্রক্রিয়া চলছে, তেমনি পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে আসন বৃদ্ধির কাজও করা হচ্ছে।’










