চলতি বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন তিন অর্থনীতিবিদ—ড্যারন অ্যাসেমোগলু, সাইমন জনসন ও জেমস রবিনসন। একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে গড়ে ওঠে এবং জাতির সমৃদ্ধিতে তা কীভাবে প্রভাব ফেলে, মূলত সেই ব্যাখ্যার স্বীকৃতি হিসেবে তাদের এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। গতকাল এ তিন অর্থনীতিবিদের নাম ঘোষণা করে দ্য রয়েল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

অর্থশাস্ত্রের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ছয়টি বিষয়ে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণার পর্ব। আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইডেনের স্টকহোমে বিজয়ীদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার তুলে দেয়া হবে।

ড্যারন অ্যাসেমোগলুর জন্ম তুরস্কে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক। সাইমন জনসনও এখানকার অধ্যাপক। তার জন্ম যুক্তরাজ্যে। নোবেলের আরেক ভাগীদার জেমস রবিনসন অধ্যাপনা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোয়।

অর্থনীতিতে পুরস্কার বিজয়ীদের গবেষণা সম্পর্কে নোবেল কমিটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘জাতির সমৃদ্ধির পেছনে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব কী, সেটি তারা তুলে ধরেছেন। যে সমাজে আইনের শাসন দুর্বল এবং প্রতিষ্ঠানগুলো জনগোষ্ঠীকে শোষণ করে, সে সমাজ কোনো সমৃদ্ধি লাভ কিংবা ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারে না। কিন্তু এমনটা কেন ঘটে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এ তিন অর্থনীতিবিদ আমাদের সহায়তা করেছেন।’

নোবেল কমিটি বলেছে, ‘ইউরোপীয় উপনিবেশের প্রভাবে অনেক দেশ ও অঞ্চলের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো বদলে যায়। কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনটা ছিল নাটকীয়। কিন্তু পরিবর্তনটা সব জায়গায় একইভাবে হয়নি। কোনো অঞ্চলে উপনিবেশবাদীদের লক্ষ্য ছিল স্থানীয় জনগণকে শোষণ করে নিজেদের সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করা। আবার দেখা যায়, উপনিবেশবাদীরা অনেক দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল ইউরোপীয় অভিবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে।’

নোবেল কমিটি বলছে, ‘একেক দেশের সমৃদ্ধি একেক রকম হওয়ার একটি ব্যাখ্যা হলো এসব প্রতিষ্ঠান, যেগুলো গড়ে উঠেছিল উপনিবেশের হাত ধরে। যখন অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, তখন অনেক দেশই গরিব ছিল। সময়ের পরিক্রমায় এসব গরিব দেশ একসময় সমৃদ্ধি অর্জন করে। আবার যেসব দেশে শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, সেসব দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তেমন একটা হয়নি। বরং তারা একটি ফাঁদে আটকা পড়ে। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে সেই সমাজের সবাই দীর্ঘমেয়াদি সুফল পায়; কিন্তু শোষণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে হাতে গোনা কিছু মানুষ স্বল্পমেয়াদে লাভবান হয়। রাজনৈতিক ব্যবস্থা যদি এমন হাতেগোনা কয়েকজন মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে কেউই তাদের প্রতিশ্রুত ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সংস্কারে আস্থা পাবে না। নোবেল জয়ী তিন অর্থনীতিবিদ দেখিয়েছেন, সে কারণেই এসব দেশের উন্নতি হয় না।’

চিকিৎসাবিজ্ঞানে পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে ৭ অক্টোবর শুরু হয় এবারের নোবেল পর্ব। মাইক্রোআরএনএ আবিষ্কার এবং জিন নিয়ন্ত্রণে এর ভূমিকা উদ্ঘাটন করে এ পুরস্কার পাচ্ছেন দুই মার্কিন বিজ্ঞানী ভিক্টর অ্যামব্রোস ও গ্যারি রাভকুন। দ্বিতীয় দিন (৮ অক্টোবর) ঘোষণা হয় পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ীদের নাম। কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মেশিন লার্নিংয়ের ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অবদান রাখায় মার্কিন বিজ্ঞানী জন জে হপফিল্ড এবং কানাডিয়ান বিজ্ঞানী জেফ্রি ই হিন্টন এ পুরস্কার পেয়েছেন। ৯ অক্টোবর ঘোষণা হয় রসায়নে নোবেল বিজয়ী তিন বিজ্ঞানীর নাম। এদের মধ্যে মার্কিন বিজ্ঞানী ডেভিড বেকার স্থান পেয়েছেন একেবারে নতুন ধরনের প্রোটিনের বিন্যাস গঠনের স্বীকৃতি হিসেবে। অন্যদিকে ব্রিটিশ গবেষক ডেমিস হ্যাসাবিস ও জন এম জাম্পারকে বেছে নেয়া হয়েছে এক ধরনের জটিল প্রোটিনের সম্ভাব্য গঠন উন্মোচন করার জন্য।

১০ অক্টোবর ঘোষণা হয় সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম। পরাবাস্তব উপন্যাস লিখে এ পুরস্কার জিতে নিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়ার লেখক হান কাং। ১১ অক্টোবর ঘোষণা করা হয় শান্তিতে নোবেল বিজয়ীর নাম। এ বছর পুরস্কারটি পাচ্ছে জাপানি সংগঠন ‘নিহন হিদানকিয়ো’। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে সংগঠনটিকে এ পুরস্কার দেয়া হচ্ছে।