শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণসহ নানা কারণে প্রতি বছর ১ শতাংশ হারে কমছে কৃষিজমি। অন্যদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে জমিতে এক বছরে একাধিক ফসল আবাদে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। ফলে কৃষিজমি কমলেও বিভিন্ন খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়েছে। ফসলের নিবিড়তার হারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও ভোলা জেলা। এসব জেলার কৃষিজমিতে বছরে গড়ে প্রায় তিনটি করে ফসল আবাদ করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ কৃষিশুমারিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
মোট জমি এবং তাতে চাষের অনুপাতের শতকরা হারকে বলা হয় শস্য নিবিড়তা। আর সাধারণভাবে বলতে গেলে প্রকৃত চাষের জমিতে বছরে কত মেয়াদি ফসল ফলানো হচ্ছে তাকে বোঝায়।
কৃষিশুমারি ২০১৯-এ দেখা যায়, ফসলের নিবিড়তার হারে শীর্ষে রয়েছে ফরিদপুর জেলা। এ জেলায় ফসলের নিবিড়তার হার ৩০৬ শতাংশ। ফরিদপুরে আবাদযোগ্য জমি রয়েছে ২ লাখ ৬১ হাজার ৪৪৮ একর। এর মধ্যে ২ লাখ ২৩ হাজার ১৮০ একর জমিতে বিভিন্ন ফসল আবাদ হয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে একাধিক ফসল আবাদের ফলে মোট ফসল ফলানো জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮২ হাজার ২৬০ একর।
ফরিদপুরের পরেই ফসলের নিবিড়তার হার বেশি রাজবাড়ী জেলায়। এ জেলায় নিবিড়তার হার ২৯৮ শতাংশ। জেলার ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬১৩ একর আবাদযোগ্য জমির মধ্যে ফসল আবাদ হয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৮৩ একরে। আর বছরে একাধিক ফসল ফলানোয় মোট জমির পরিমাণ ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬২ একর। ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর পরেই রয়েছে ভোলা জেলা। ভোলার ২ লাখ ৬৯ হাজার ৪১২ একর আবাদযোগ্য জমির মধ্যে ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৫ একরে বিভিন্ন ফসল আবাদ হয়। জেলাটির অস্থায়ী ফসলাধীন মোট জমির পরিমাণ ৬ লাখ ৩৫ হাজার ৮৪৫ একর। সে হিসাবে ফসলের নিবিড়তা দাঁড়ায় ২৮৫ শতাংশে।
এছাড়া লক্ষ্মীপুর জেলায় ২৮৪ শতাংশ, রাজশাহীতে ২৮০, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৭৮, মেহেরপুরে ২৬৮, কুষ্টিয়ায় ২৬৭, রংপুরে ২৬১ ও ঠাকুরগাঁও জেলায় ২৫৭ শতাংশ ফসলের নিবিড়তা রয়েছে। অর্থাৎ এসব জেলার আবাদি জমিতে গড়ে আড়াই থেকে তিনটি ফসল আবাদ হয়। মূলত এ জেলাগুলোয় উঁচু জমি বেশি থাকায় বছরের অধিকাংশ সময়েই কৃষকরা ফসল আবাদ করতে পারেন।
শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০০৮ সালে ফসলের নিবিড়তার জাতীয় গড় ১৭২ শতাংশ থাকলেও ২০১৯ সালে তা দাঁড়িয়েছে ২১৪ শতাংশে। বর্তমানে নিট আবাদি জমি রয়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৮১ হাজার ৯০২ একর। এর মধ্যে ১ কোটি ৬৪ লাখ ২৩ হাজার ৬০৮ একরে বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ হয়। তাই ফসলাধীন মোট জমির পরিমাণ ৩ কোটি ৫০ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫০ একর।
তবে বিবিএসের তথ্যের সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফসলের নিবিড়তার হারে অনেক ব্যবধান দেখা পাওয়া গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ফসলের নিবিড়তার জাতীয় গড় ১৯৮ শতাংশ। জেলাগুলোর তথ্যেও দেখা গেছে গরমিল। বিবিএসের দেয়া হারের তুলনায় জেলাগুলোয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফসলের নিবিড়তার হার অনেক কম পাওয়া গেছে।
বিবিএসের হিসাবে ফরিদপুর জেলায় ফসলের নিবিড়তা ৩০৬ শতাংশ বলা হলেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ জেলায় ফসলের নিবিড়তার হার ২৪০ শতাংশ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জিয়াউল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের ফসলের নিবিড়তার হার ২৪০-২৪৯ শতাংশের মতো। বিবিএস কী হিসাবে করেছে আমি বলতে পারছি না। তবে ফরিদপুরের কোনো কোনো উপজেলায় ২৭৫-২৮০ শতাংশও নিবিড়তার হার রয়েছে। ফরিদপুরে জমি খুব একটা খালি থাকে না। বেশির ভাগ উঁচু জমি হওয়ায় সারা বছরই ফসল আবাদ করা যায়। তিন ফসলি ও চার ফসলি জমিও রয়েছে।’
রাজবাড়ী জেলায়ও বিবিএসের হিসাবে ফসলের নিবিড়তা ২৯৮ শতাংশ হলেও কৃষি সম্প্রসারণের তথ্যে ফসলের নিবিড়তা রয়েছে ২৫১ শতাংশ। প্রায় ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে ফসল আবাদ করা হয় এ জেলায়। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক গোলাম রাসূল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের জেলায় উঁচু জমি বেশি। সারা বছরই ফসল আবাদ হয়। পেঁয়াজের সঙ্গে আমন আবাদ হয়। অনেক জায়গায় পেঁয়াজের আবাদ দুবারও করা হয়। সাধারণত তিন ফসল করলে জমির সমস্যা হয় না। উৎপাদনশীলতা ঠিক থাকে। তবে বাড়াতে হয় সারের ব্যবহার। আমরা জৈব সার প্রয়োগে গুরুত্ব দিচ্ছি।’
ডিএইর তথ্যমতে, ভোলা জেলায় ফসলের নিবিড়তার হার ২৪২ শতাংশ। বর্তমানে জেলাটিতে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ হচ্ছে। এ জেলায় বোরো-পতিত-রোপা আমন, বোরো-আউশ-আমন, বোরো-মুগ-আমন, বোরো-আমন-সরিষাসহ কয়েকটি শস্য বিন্যাসে কৃষকরা বেশি চাষাবাদ করেন। জেলাটির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাসান ওয়ারিসুল কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভোলা জেলায় বিভিন্ন শস্য বিন্যাসে ফসল আবাদ করা হচ্ছে। তেলজাতীয় ফসল আবাদ বাড়ছে। উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হয়। ফেব্রুয়ারি ও মার্চের দিকে লবণাক্ততা থাকে। তবে সেচের মাধ্যমে এসব সমস্যার কিছুটা সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে। নদীর পানি যথাযথ ব্যবহারের জন্য কালভার্ট ও খাল খনন এবং সেচ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে উৎপাদনের হার আরো অনেক বাড়ানো সম্ভব।’
হাওর, বন্যাপ্রবণ, শিল্পাঞ্চল, পার্বত্য ও উপকূলীয় জেলাগুলোয় ফসলের নিবিড়তা সবচেয়ে কম রয়েছে। ঢাকা জেলায় ফসলের নিবিড়তা ১২২ শতাংশ। এছাড়া ঢাকা বিভাগের মধ্যে নারায়ণগঞ্জে ১৬২ শতাংশ, কিশোরগঞ্জে ১৬৪ ও গাজীপুরে ফসলের নিবিড়তা মাত্র ১৬৭ শতাংশ। চট্টগ্রাম বিভাগের তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে ফসলের নিবিড়তা যথাক্রমে ১৫৭, ১৬৭ ও ১০৩ শতাংশ। বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় যথাক্রমে ১৪১ ও ১৬০ শতাংশ ফসলের নিবিড়তা। সিলেটের সুনাগঞ্জে ফসলের নিবিড়তা ১৫৬ শতাংশ। ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলায় ফসলের নিবিড়তার হার ১৮১ শতাংশ। আর খুলনা বিভাগের বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলায় যথাক্রমে ১৩৯, ১৬৮ ও ১৭২ শতাংশ ফসলের নিবিড়তার হার।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি জমিতে যেন সুষম সার প্রয়োগ করা হয়, সেদিকে কঠোর মনিটরিং করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে উর্বরতা ঘাটতি বেড়ে দীর্ঘমেয়াদে মাটির গুণাগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হলে ফসলের নিবিড়তা বাড়াতে হবে। কিন্তু এতে মাটির স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে পড়েছে। প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু সরকারের সামনেও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জৈব চাষাবাদের কথা বলা যাবে না। কারণ তাহলে উৎপাদন কমে গিয়ে আমদানিনির্ভরতা বেড়ে যাবে।
তথ্যে গরমিলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তথ্যের ক্ষেত্রে ডিএই ও বিবিএসের মধ্যে সবসময়ই পার্থক্য দেখা যায়। দুটোই সরকারি সংস্থা হওয়ায় আমরা যারা পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করি, তারা একটু বিপাকে পড়ি। তথ্য সংগ্রহে আরো সতর্ক হওয়া দরকার আমাদের। কারণ এর ওপর অনেক নীতিনির্ধারণের বিষয় জড়িয়ে রয়েছে।’
এ বিষয়ে কৃষি শুমারি ২০১৯-এর প্রকল্প পরিচালক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যার ব্যুরো কৃষি উইংয়ের পরিচালক আলাউদ্দিন আল আজাদের মুঠোফোনে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব রবীন্দ্রশ্রী বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য কিছু ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছি। আমাদের জমি বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং প্রতিনিয়ত কৃষিজমি কমছে। এ কারণে আমরা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য শস্য বিন্যাস পরিবর্তন করে দিয়েছি। যেসব জেলায় ফসলের নিবিড়তার হার কম সেখানেও বাড়ানোর বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছে। আরেকটি বিষয় হলো আমরা এখন উচ্চফলনশীল জাতগুলোকে কাজে লাগাচ্ছি, যেগুলো উৎপাদনে সময়ও কম প্রয়োজন হয়। বর্তমানে কৃষক ও সব ধরনের প্রশিক্ষণে এসআরডিআই থেকে সারের যে নির্ধারিত ডোজ সেটি প্রয়োগের বিষয়ে জোর দেয়া হচ্ছে। যেন জমিতে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। পাশাপাশি কৃষিজমির জৈব পদার্থগুলো ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করা হচ্ছে।’










