এসব পাটকলে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার টন পাটপণ্য উৎপাদন হয়, যার বড় একটি অংশ বিদেশে রফতানি করা হয়। তবে কাঁচা পাটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন সংকটে পড়েছে পাটকলগুলো। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ হারানোর পাশাপাশি লোকসানে কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। বর্তমান সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ও রফতানি—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধাক্কা আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
পাটকল মালিকরা জানান, মৌসুমের শুরুতে যে কাঁচা পাট মণপ্রতি প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকায় কেনা হয়েছিল, বর্তমানে তা কিনতে হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার ২০০ টাকায়। দ্বিগুণের কাছাকাছি দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কিন্তু বাজারে সে অনুপাতে পাটপণ্যের দাম বাড়েনি। ফলে পণ্য উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
পাটকল মালিকদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কাঁচা পাট মজুদ রাখায় দাম বেড়েছে। মজুদদাররাই এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের কারসাজির কারণে দাম আরো বাড়তে পারে। এতে কারখানা মালিকরা বিপাকে পড়েছেন।
পাট রফতানিকারকদের সংগঠন বিজেএএর সাবেক চেয়ারম্যান ফরহাদ আহমেদ আকন্দ বলেন, ‘দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় পাটকল মালিকদের পক্ষে বাজার থেকে কাঁচা পাট কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ পাট মজুদ করে রেখেছে। তারাই মূলত বাজার অস্থিতিশীল করে রেখেছে। এর ফলে দাম বেড়েছে। মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় তারাও বাজারে পাট ছাড়ছেন না। পাশাপাশি আরো নানা সংকট রয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া যায় না ঠিকমতো। এসব কারণে এ খাত এখন ধুঁকছে।’
কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, দুই বছর ধরে বিভাগের ১০ জেলায় উৎপাদন প্রায় একই রয়েছে। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল নিয়ে খুলনা কৃষি অঞ্চলের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৯ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে ৯৪ হাজার ৬৬৬ টন কাঁচা পাট উৎপাদন হয়েছে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৮ হাজার ২৬৮ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৯১ হাজার ১৩৫ টন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনার দৌলতপুর জুট মিলে প্রায় দেড় মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কাঁচা পাটের সংকটে শ্রমিকরা প্রতিদিন মিলে এসে কাজ না করেই সময় কাটাচ্ছেন।
পাটকলটির উৎপাদন কর্মকর্তা মো. ইসরাফিল মল্লিক বলেন, ‘আগে ৩ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে পাট কিনে প্রতিটি বস্তা আমরা ৮০ টাকা দরে বিক্রি করতাম। সর্বশেষ ৪ হাজার টাকা দরেও পাট কিনে আমরা কারখানা চালিয়েছি। লোকসান হলেও শ্রমিকদের দিকে তাকিয়ে কারখানা চালু রেখেছিলাম। কিন্তু এখন পাটের দাম ৫ হাজার ২০০ টাকা হয়ে গেছে। এখন একটা বস্তা তৈরিতে খরচ হচ্ছে ১২০ টাকারও বেশি। কিন্তু ৮০ টাকার ওপরে দাম মিলছে না। বাধ্য হয়ে আমরা গত দেড় মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ রেখেছি।’
কাঁচা পাটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এ বছর কাঁচা পাটের উৎপাদন মোটেও গত বছরের তুলনায় কম নয়। অথচ উৎপাদন কম হয়েছে জানিয়ে একশ্রেণীর ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। সরকার যদি এটা তদারক না করে, তাহলে আমাদের কারখানা চালানো সম্ভব হবে না।’
ফরচুন গ্রুপের মালিকানায় থাকা সরকারি দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিক কালাম সিকদার বলেন, ‘প্রায় দেড় মাস ধরে মিলে আসি, বসে থাকি, কোনো কাজ নেই। কাঁচা পাট না থাকায় মালিক কারখানা চালাতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কাজ হারাতে পারি। কাজ না থাকলে আমরা কীভাবে সংসার চালাব?’
একই মিলের আরেক শ্রমিক রমজান মৃধা বলেন, ‘তিন বছর ধরে এ মিলটা ভালোই চলছিল। কিন্তু কাঁচা পাট না থাকায় গত দেড় মাস আমরা বসে আছি। মালিক নিজে না বাঁচলে আমাদের বাঁচাবেন কী করে?’
বাজার পরিস্থিতি সহনীয় রাখতে নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া কথা জানিয়েছে পাট অধিদপ্তর। সংস্থাটির খুলনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সরজিত সরকার বলেন, ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। একজন আড়তদার বা ডিলার সর্বোচ্চ এক মাস ৫০০ মণ পাট মজুদ করতে পারবেন। বিষয়টি ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কিনা তা আমরা নিয়মিত তদারক করছি। কোথাও বেশি মজুদ পাওয়া গেলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। দাম সহনীয় রাখতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। আশা করছি দ্রুতই পাটের বাজার সহনীয় হবে।’










