যশোরের মণিরামপুর উপজেলার একটি গ্রাম বাসুদেবপুর। এ গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ি যেন নার্সারি। কোথাও অনাবাদি নেই এক চিলতে জমি। নার্সারি পেশাই বাসুদেবপুরের মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। গ্রামটিতে নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটে গেছে। নার্সারি ব্যবসা করে এখানকার অনেক মানুষ সফল হয়েছে। শূন্য থেকে কোটিপতিও হয়েছে। ইজারা নিয়ে নার্সারি গড়ে তুলে পরবর্তী সময়ে জমি ও বাড়ির মালিক হয়েছে। তাদের দেখাদেখি গ্রামের বাড়ি বাড়ি গড়ে উঠেছে নার্সারি। কেবল বর্ষা মৌসুমেই এ গ্রামের কয়েকশ নার্সারিতে ১০ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়। আর সারা বছরের বিক্রির হিসাব আরো অনেক বেশি। 

যশোর সদর থেকে বাসুদেবপুরের দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার বা তার চেয়ে কিছুটা বেশি। রোহিতা ইউনিয়নের ভাণ্ডারির মোড় থেকে খানিক পশ্চিমে গেলে নানা প্রজাতির গাছের চারার দৃশ্য নজর কাড়ে। রাস্তার পাশে যতদূর দৃষ্টি যায় ফুল, ফল, মসলা ও বনজের চারা দেখা যায়। যেগুলোর গোড়ার মাটি পলি প্যাকেটে আবদ্ধ। চলতি পথে নার্সারিগুলোয় কর্মব্যস্ততার দৃশ্য চোখে পড়ে। কেউ নিড়ানি দিয়ে আগাছা বাছা ও ঝাঁজরি দিয়ে চারায় পানি দিচ্ছেন। আবার কেউ ভ্যান, নছিমন, ট্রাক ও পিকআপে চারা তুলে দিচ্ছেন। বাসুদেবপুরে ঢুকলে চোখে পড়ে বাড়ি বাড়ি নার্সারি। বাড়ির সামনে-পেছনে ও আশপাশে নার্সারি গড়ে তুলেছেন সবাই। সব বাড়ির সামনে নার্সারির নামসংবলিত সাইনবোর্ড। নানা রকমের ফুল, ফল ও মসলার চারা বাড়িগুলোর সামনে। বাড়ির ভেতরে গড়ে তোলা নার্সারিতে চারা কেনাবেচার দৃশ্যও নজর কাড়ে।

স্থানীয়রা জানান, যশোরের মণিরামপুরের এ গ্রামে বিভিন্ন প্রজাতির চারা উৎপাদন হয় বিপুল পরিমাণ। বাসুদেবপুরের কয়েকশ নার্সারিতে ফুল, ফল, মসলাসহ হরেক রকমের গাছের চারা বেচাকেনা চলে বছরজুড়ে। ৩৫৬টি নার্সারি ছাড়াও গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে চারা উৎপাদন হয়। যশোর ও আশপাশের জেলাসহ সারা দেশে যায় এখানকার চারা। নার্সারি মালিকদের দেয়া হিসাবে শুধু বর্ষার তিন মাসে ১০ কোটি টাকার ওপর চারা বিক্রি হয়। বছরজুড়ে চারার বিক্রি চললেও বর্ষা মৌসুমে সেটি বহুগুণ বেড়ে যায়।

বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারার মধ্যে বাসুদেবপুরে লিচুর চারা বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি। দিনাজপুরের চাষীদের কাছে বাসুদেবপুরের লিচুর চারার কদর অনেক। এখানকার চাষীদের দাবি, সারা দেশের মধ্যে বাসুদেবপুরে সর্বোচ্চ পরিমাণ লিচুর চারা উৎপাদন হয়। মৌসুমে ৪০-৫০ ট্রাকের ওপর লিচুর চারা বিক্রি হয়।

দেশী প্রজাতির পাশাপাশি বিদেশী ফলের চারারও উৎপাদন হয় বাসুদেবপুরে। এখানে স্ট্রবেরি, রাম্বুটান, ড্রাগন, থাই পেয়ারাসহ ৩০-৪০ প্রজাতির বিদেশী ফলের চারা তৈরি হয়। এছাড়া দেশী প্রজাতির ফলের বেশির ভাগ নার্সারিগুলোয় পাওয়া যায়। এসব ফলের প্যাকেট চারা বছরজুড়ে পাওয়া যায়। প্যাকেটে রোপণ করা চারার পাশাপাশি টবে লাগানো ফুল-ফলের চারাও এখানে বিক্রি হয়। চুই, লবঙ্গ, তেজপাতা, দারুচিনি, গোলমরিচ, এলাচসহ বেশ কয়েক প্রজাতির মসলার চারা উৎপাদন ও বিক্রি হয় বাসুদেবপুরে। এসব মসলা গাছের একেকটি চারার দাম আকৃতিভেদে ১০০-২৫০ টাকা। মসলা প্রজাতির মধ্যে গোলমরিচের চারার দাম একটু বেশি। একটি চারার দাম কমপক্ষে ২৫০ টাকা। চারা উৎপাদনের জন্য ভারত থেকে মসলার বীজ আমদানি করেন নার্সারি মালিকরা।

নার্সারি ব্যবসায়ীরা জানান, বাসুদেবপুরে নার্সারি ব্যবসার যাত্রা হয় মোহাম্মদ আলী মেম্বরের হাত ধরে। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে তিনি নার্সারির ব্যবসা শুরু করেন। তার ছেলেরা এখন সেই নার্সারি ব্যবসার হাল ধরেছেন। তাদের এ নার্সারির নাম ‘পুরাতন নার্সারি’। ২২ বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত নার্সারিতে কয়েকশ প্রজাতির লক্ষাধিক গাছের চারা রয়েছে।

মোহাম্মদ আলীর ছোট ছেলে আনোয়ারুল ইসলাম জানান, তাদের নার্সারিটির নাম ‘পুরাতন নার্সারি’। এলাকার প্রথম নার্সারি বলে একে বেশির ভাগ মানুষ পুরাতন নার্সারি বলে চেনে এবং এ নামেই ডাকে। এ থেকেই এটির নামও হয়ে গেছে পুরাতন নার্সারি। কাগজ-কলমেও এর নাম পুরাতন নার্সারি। তাদের এ নার্সারির বয়স প্রায় ৫৫ বছর। তিনি দাবি করেন, তাদেরটি নার্সারিটি খুলনা বিভাগের প্রথম নার্সারি। গত বছর ৪২ লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন। এছাড়া বর্ষা মৌসুম ছাড়া সারা বছর ৫-১০ লাখ টাকার চারা বিক্রি করা হয়েছে।

বাসুদেবপুর নার্সারি মালিক সমিতির সভাপতি মাহাবুবুর রহমান জানান, গ্রামে ৩৬৫টিরও বেশি নার্সারি রয়েছে। এছাড়া প্রতিটি বাড়ির উঠানে চারা আবাদ করেন সবাই। ছোট নার্সারিগুলোয় স্বাভাবিকভাবে দেড়-দুই লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়। বড়গুলোর বিক্রির পরিমাণ অনেক বেশি। বর্ষা মৌসুমে ৩৫-৪০ ট্রাক লিচুর চারা যায় দিনাজপুরে। সারা দেশের মানুষ দিনাজপুরের যে লিচু খায়, সেই লিচুর চারা বাসুদেবপুর থেকে যায়। দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ লিচুর চারা বাসুদেবপুরের নার্সারি থেকে উৎপাদন হয়।

যশোর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের উপপরিচালক দ্বিপঙ্কর রায় জানান, মণিরামপুরের বাসুদেবপুরে বর্ষা মৌসুমে গাছের চারা বিক্রি করে ১০ কোটি টাকার লেনদেন হয়।নার্সারি ব্যবসায় এখানে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।