নির্মাণাধীন সেতুটি খুব বড় নয়, তবু স্থানীয় জনসাধারণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৬০ দশমিক ৬ মিটার (১৯৭ ফুট) দীর্ঘ ও সাত মিটার (২১ ফুট) প্রস্থের সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলে বদলে যাবে সিলেট ও সুনামগঞ্জের অর্থনৈতিক চিত্র। ভারত থেকে আমদানীকৃত পাথর ও এলাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সরবরাহ বাড়বে কয়েক গুণ। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ছাতক-দোয়ারাবাজার সীমান্তবর্তী সোনাই নদীতে নির্মিতব্য সেতুটি ঘিরে এলাকার মানুষের মধ্যে আনন্দ বিরাজ করছে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষায় নৌকা ও  শুকনো মৌসুমে বাঁশ-কাঠের সাঁকো দিয়ে নদী পার হতে হয় স্থানীয়দের। এতে নিত্য ভোগান্তি ছিল তিন উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নবাসীর। তবে এবার তাদের সে অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। ছাতক ও কোম্পানীগঞ্জের সংযোগস্থল ছনবাড়ী বাজারসংলগ্ন সোনাই নদীতে নির্মাণ করা হচ্ছে পাকা সেতু। এরই মধ্যে পাইলিংসহ সেতুর কাজ শুরু হয়ে গেছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে ছাতকের ইসলামপুর ইউনিয়ন, দোয়ারাবাজারের নরসিংপুর ও বাংলা বাজার ইউনিয়ন এবং কোম্পানীগঞ্জের পূর্ব ও পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ সেতুটির সুফল পাবে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হবে ৫ কোটি ৭৫ লাখ ৬০ হাজার ৩৮৫ টাকা। প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজ প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সেতুটি নির্মিত হচ্ছে।  কিশোরগঞ্জের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএস মমিনুল হক এর নির্মাতা। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী ৩১ জুলাই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। 

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছাতক শুল্ক স্টেশনের আওতাধীন দোয়ারবাবাজার উপজেলার চেলা নদী ও ছাতক উপজেলার ইছামতি নদী পথ ব্যবহার করে প্রতি বছর ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ চুনাপাথর আমদানি করা হয়। আমাদানীকৃত পাথর নদী পথ ব্যবহার করে ছাতকে নিয়ে যাওয়া হতো। সোনাই নদীর সেতুর কাজ শেষ হলে সড়ক পথে সিলেটের ভোলাগঞ্জ ও ধুপাগুল ক্রাশিং প্লান্টে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। ব্যবসায়ীরা জানান, ভোলাগঞ্জ ও ধুপাগুলে ক্রাশিং মেশিন রয়েছে। ভারত থেকে আমদানীকৃত পাথর সেখানে এনে সহজেই প্রক্রিয়াজাত করা যাবে। এতে সময় ও অর্থ দুটিই বাঁচবে। 

অন্যদিকে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার সবজির জন্য বিখ্যাত। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি এখানে বাজারজাত হতো। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য ব্যবসায়ীরা সঠিক মূল্য পাচ্ছিলেন না। 

আবুল হোসেন নামের এক কৃষক বলেন, ‘এলাকায় উৎপাদিত সবজি ছাতক কিংবা সিলেটে সরবরাহ কৃষকের জন্য ছিল কষ্টকর। সেতুটির কাজ সম্পন্ন হলে সড়ক পথ ব্যবহার করে স্বল্পসময়ে সিলেটে সবজি পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে কৃষক উপকৃত হবেন। 

সরজমিন দেখা গেছে, দ্রুতগতিতে সেতুটির নির্মাণকাজ চলছে। প্রকল্প ম্যানেজার কামাল জানান, চারটি কলাম ও তিনটি স্প্যানে ৬০ দশমিক ৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটির নির্মাণকাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে প্রতিদিন ৫০ শ্রমিক কাজ করছেন। পাইলিংয়ের দায়িত্বে থাকা আনোয়ারুল হক উজ্জ্বল জানান, বর্তমানে নদীতে সেচ প্রকল্প রাবার ড্যামের পানি ফুলে থাকায় বালির বাঁধ দিয়ে পাইলিংয়ের কাজ চলছে। 

সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলে শিক্ষার্থীদেরও কষ্ট লাঘব হবে। কোম্পানীগঞ্জের ছনবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুর রফিক জানান, ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নদীতে বাঁশ-কাঠের সাঁকো তৈরির আগে সীমাহীন কষ্ট করে বিদ্যালয়ে আসত। বর্ষায় পাহাড়ি ঢল নামলে ছাতকের নিজগাঁও, রাসনগর, বনগাঁও, পুরান নোয়াকোট, ধনীটিলা, রতনপুর, বাগান ও গাংপার নোয়াকোট থেকে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসতে পারত না। সোনাই নদীর সেতুটি তাদের দুর্ভোগ লাঘব করে স্বাচ্ছন্দ্যে বিদ্যালয়ে আসার পথ সুগম করবে।

তবে এলজিইডি ছাতক উপজেলা প্রকৌশলী আফছর আহমদ নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সেতুর দুই প্রান্তের পাইলিং শেষ হলেও মধ্যখানের পাইলিং নিয়ে তারা জটিলতায় আছেন। পাইলিং ৪০ মিটার পর্যন্ত গভীরে যাওয়ার কথা থাকলেও নিচে পাথরের কারণে ৩৬ মিটারে গিয়ে সেটি আটকে আছে। অন্য কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চেষ্টা চালাচ্ছেন। এছাড়া ওই এলাকার নদীতে আগেভাগে পাহাড়ি পানি নেমে আসে। যে কারণে অনেক সময় এক মৌসুমে কাজ শেষ করা যায় না। 

সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক ও ভোলাগঞ্জ চুনাপাথর আমদানিকারক গ্রুপের সেক্রেটারি মুজিবুর রহমান মিন্টু বলেন, ‘সোনাই নদীতে সেতুর কাজ শেষ হলে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। সড়ক পথে সরাসরি আমদানীকৃত পাথর ভোলাগঞ্জ ক্রাশিংপ্লান্টে নিয়ে আসা যাবে। এটি ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ। পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নয়ন ঘটবে।’ 

সুনামগঞ্জ-৫ আসনের (ছাতক-দোয়ারাবাজার) সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বলেন, ‘সোনাই নদীতে সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে সুনামগঞ্জের ছাতক-দোয়ারাবাজারের সঙ্গে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি এলাকার উন্নয়ন আরো ত্বরান্বিত হবে। এর আগে সোনাই নদীতে রাবার ড্যামের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জমি চাষাবাদের আওতায় আসায় এ অঞ্চলের কৃষিতে যেমন বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, সেতুটি নির্মাণের ফলেও তেমনি এলাকাবাসী সুফল পাবে।