রাজধানীসহ সারা দেশে গতকাল ভোর থেকে টানা বৃষ্টি হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন সড়ক ও নিম্নাঞ্চলে পানি জমেছে। গতকাল ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ ৪০টি নদ-নদীর পানি বেড়েছে। এছাড়া আটটি নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এতে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, বাগেরহাট, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও মুন্সিগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আবহাওয়া অফিস ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বিকালের বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়, গতকাল সকাল ৯টার তুলনায় বেলা ৩টায় দেশের অভ্যন্তরীণ ৩৯টি নদ-নদীর পানি বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ইছামতী ও পশুর নদের; ২১৬ সেন্টিমিটার। আর কর্ণফুলীর পানি ১১৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুনখাওয়া (কুড়িগ্রাম) পয়েন্টে বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার, হাতিয়ায় ১১ ও চিতলমারীতে ৩১, যমুনা নদীর ফুলছড়িতে (গাইবান্ধা) ৩৫, বাহাদুরাবাদে (জামালপুর) ৫২, সাঘাটায় ৪০, সারিয়াকান্দিতে (বগুড়া) ৪১, কাজীপুরে (সিরাজগঞ্জ) ২৩, জগন্নাথগঞ্জে ৯৩, সিরাজগঞ্জে ৪৫ ও পোড়াবাড়ীতে (টাঙ্গাইল) ২০, আত্রাইয়ের বাঘাবাড়ীতে ১৬, পশুরের মোংলায় (বাগেরহাট) ১২, সুরমার কানাইঘাটে ৪২ ও সুনামগঞ্জে ১৪, কুশিয়ারার অমলশিদে (সিলেট) ২৩ ও মারকুলিতে (হবিগঞ্জ) ২৩, সোমেশ্বরীর কলমাকান্দায় (নেত্রকোনা) ৩৬ এবং মেঘনার পানি মেঘনা সেতু পয়েন্টে (মুন্সীগঞ্জ) বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

এদিকে সিলেটে তৃতীয় দফা বন্যায় বুধবার রাত থেকে চতুর্থ দফা নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকে। সেই পানি ধীরগতিতে নামতে শুরু করেছে। ৩ ঘণ্টা পরপর ১ সেন্টিমিটার করে পানি কমছে। সুরমা কুশিয়ারার তিনটি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেটের কুশিয়ারা তীরবর্তী উপজেলাগুলোয় বন্যা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে।

সিলেট জেলা প্রশাসনের বন্যাসংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বৃহস্পতিবার রাতে জানানো হয়েছে, বন্যায় জেলার ১৩টি উপেজেলার ৯৪টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৩৩টি গ্রাম প্লাবিত রয়েছে। এতে পনিবন্দি অবস্থায় রয়েছে ৫ লাখ ৩৪ হাজার ৪৬৮ জন মানুষ। এসব এলাকায় ২১০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৯ হাজার ২১ জন মানুষ অবস্থান করছে। এর মধ্যে বালাগঞ্জ, ওসমানীনগর, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উপজেলায় বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে। মাসখানেক ধরে অনেকে আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।

এদিকে তিনদিন ধীরগতিতে কমতে থাকার পর মৌসুমি বায়ুর প্রভাব ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আবারো সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীসহ অভ্যন্তরীণ নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানি বাড়ায় বন্যায় যমুনার তীরবর্তী চরাঞ্চলে এক লাখেরও বেশি মানুষ এখন পানিবন্দি। 

সিরাজগঞ্জ পাউবো উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রঞ্জিত কুমার সরকার জানান, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় শাহজাদপুর ও কাজীপুরে নদীভাঙন অব্যাহত আছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আখতারুজ্জামান জানান, আবার পানি বাড়ায় নদীতীরবর্তী জেলার পাঁচ উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়নে ২৩ হাজার ৩০৬টি পরিবারের ১ লাখ ৩ হাজার ৫৯৪ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চলতি বন্যায় জেলা সদর, শাহজাদপুর ও চৌহালীতে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নৌকা ডুবে চারজন ও পানিতে ডুবে আরো চারজন মারা গেছে।

জেলা প্রশাসক মীর মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানান, জেলায় ১৮০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তবে এখনো কেউ আশ্রয় কেন্দ্রে ওঠেনি। পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।

পাউবো সিরাজগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান জানান, যমুনায় আবারো পানি বাড়ছে। নদীতীর সংরক্ষণ বাঁধ, ক্রসবার বাঁধসহ নদীভাঙন এলাকায় সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় জিও ব্যাগ ও জনবল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে পানি বেড়েছে। পাউবো গোয়ালন্দের পরিমাপক ইদ্রিস আলী জানান, এক সপ্তাহ ধরে পদ্মা নদীর পানি বাড়ছে। গতকাল সকাল ৬টায় দেখা যায়, পানি ২৪ ঘণ্টায় ১৪ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পদ্মায় পানি বাড়ায় ব্যাহত হচ্ছে ফেরি চলাচল। ফেরিগুলোকে নদীর দৌলতদিয়া থেকে পাটুরিয়া ঘাটে যেতে স্বাভাবিকের চেয়ে সময় লাগছে বেশি।

পদ্মার পানি বাড়ায় গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া, দেবোগ্রাম, সদর উপজেলার বরাট মিজানপুর, কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া ও পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করছে।