বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যশৃঙ্খলে এমন চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে গতকাল আয়োজিত ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক সংলাপে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করে সংস্থাটি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

গবেষণায় দেখা যায়, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি মাঝারি চালের গড় বিক্রয় মূল্য ৩০ টাকা ৬৫ পয়সা। বেপারি পর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ টাকা ৭২ পয়সায়। এরপর ধান প্রক্রিয়াজাত করে মিলাররা চাল শহুরে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন ৫২ টাকা ৪৫ পয়সা দরে। আড়তদারদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারা চাল সংগ্রহ করেন ৫৫ টাকা ৪০ পয়সায় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে একই চাল বিক্রি হয় গড়ে ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা কেজি দরে। অর্থাৎ কৃষক পর্যায়ের তুলনায় খুচরা বাজারে চালের দাম প্রায় ১০০ শতাংশ বেড়ে যায়।

আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যসূচকের প্রভাব থেকে দেশীয় সরবরাহ ব্যবস্থার প্রভাব পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এসব খাদ্যপণ্যের মূল্যশৃঙ্খল পর্যালোচনা করা হয় বলে জানিয়েছে সিপিডি। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূল্যশৃঙ্খলের সবচেয়ে বড় দামের ব্যবধান সৃষ্টি হয় বেপারি ও মিলারদের মধ্যবর্তী ধাপে, যেখানে ধান প্রক্রিয়াজাত হয়ে চালে রূপান্তর হয়।

কেবল চালই নয়, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১০টি খাদ্যপণ্যের মধ্যে ডালের দাম কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে ৭৮ শতাংশ, দেশী পেঁয়াজের দাম ৮৭, আলুর দাম ৫০ ও বেগুনের দাম ৭২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে দেখা গেছে। তবে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে কাঁচামরিচের ক্ষেত্রে। কৃষক পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে পণ্যটির দাম বেড়ে যায় প্রায় ১১৬ শতাংশ।

সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল যত দীর্ঘ, ভোক্তাপর্যায়ে সে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও তত বেশি। বিপরীতে যেসব পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কম, সেসব পণ্যের দামও সীমিত হারে বাড়ে। অর্থাৎ উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পথে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতিই মূলত মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরো সুসংগঠিত ও সংক্ষিপ্ত করার সুপারিশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

গবেষণার তথ্যও এ পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করে। যেসব পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা বেশি, সেগুলোর দাম উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে ৫০-১১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। অন্যদিকে ডিম, গরুর মাংস, মাছ ও মুরগির মতো পণ্যে মধ্যস্বত্বভোগী তুলনামূলকভাবে কম থাকায় মূল্যবৃদ্ধি সীমিত থাকে ১০-২৫ শতাংশের মধ্যে।

back-lead-inside

উদাহরণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, কৃষক যে ডিম ৮ টাকা ৪১ পয়সায় বিক্রি করেন, সেটিই খুচরা পর্যায়ে ৯ টাকা ৯৬ পয়সা। এক্ষেত্রে কৃষক ও খুচরা বিক্রেতার মাঝখানে কেবল একজন পাইকার থাকেন, যিনি ডিমটি ৮ টাকা ৪৬ পয়সায় বিক্রি করেন। একইভাবে প্রতি কেজি মুরগির দাম কৃষক পর্যায়ে ১৩০ টাকা ৫০ পয়সা থেকে পাইকারিতে ১৪৫ টাকা ৪০ পয়সা হয়ে খুচরা বাজারে পৌঁছে ১৫৮ টাকায় বিক্রি হয়। গরুর মাংসের ক্ষেত্রেও উৎপাদক পর্যায়ে প্রতি কেজির দাম ৬৩৫ টাকা ৩৯ পয়সা থেকে বেপারির মাধ্যমে বেড়ে খুচরা বাজারে দাঁড়ায় ৭৩৬ টাকা ৩০ পয়সায়। আর রুই মাছের দাম ২৮১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছে ৩০৫ টাকা ৯১ পয়সা হয়। গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, খুচরা বিক্রেতারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পণ্য সংগ্রহের জন্য শহরাঞ্চলের আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। আলুর ক্ষেত্রে এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি, মোট সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে আড়তদারদের মাধ্যমে। এ একক নির্ভরশীলতা বাজারে অল্প কয়েকজন ব্যবসায়ীর প্রভাব বাড়িয়ে দেয়; যা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, দরকষাকষিতে অসম ক্ষমতা এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়।

গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর। তিনি বলেন, ‘উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খল যত ছোট করা যাবে, ভোক্তারা ততই উপকৃত হবেন। এজন্য কৃষক ও পাইকারি বা খুচরা বিক্রেতার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। পণ্যের পচন রোধে কোল্ড-চেইন অবকাঠামো এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিযোগিতা কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাইকারি বাজারের কারসাজি, কৃত্রিম সংকট ও অবৈধ কমিশন বন্ধ করতে হবে। এছাড়া কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কর্তৃক প্রতিদিনের ফার্মগেট, পাইকারি ও খুচরা মূল্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে, যাতে মূল্য কারসাজি ধরা সহজ হয়।’

সংলাপের প্রধান অতিথি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘কভিড-পরবর্তী সময়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অতিরিক্ত তারল্য, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। তবে অনেক দেশ পরবর্তী সময়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি স্থায়ীভাবে বেশি থাকার অন্যতম কারণ লজিস্টিক ব্যয়। বিশ্বে যেখানে গড়ে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়, সেখানে বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশ। এ ব্যয় কমানো গেলে খাদ্যপণ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে লজিস্টিক ব্যয় কমানো, উৎপাদন উপকরণের খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা, বাজারে অনানুষ্ঠানিক ব্যয় হ্রাস এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।’

বাজারে তথ্যের অসমতা (মার্কেট অ্যাসিমেট্রি) কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘টানা কয়েক বছর কৃষক আলুর ন্যায্যমূল্য না পেলেও একই পরিমাণ উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন। এর অর্থ কৃষকের কাছে বাজার-সংক্রান্ত সঠিক তথ্য ও বিকল্প উৎপাদন পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পৌঁছাচ্ছে না। সরকার কৃষিপণ্যের উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে ট্রেসেবিলিটি চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে। এর মাধ্যমে কোনো পর্যায়ে অস্বাভাবিক ব্যয় বা মূল্যবৃদ্ধি হলে তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।’

কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে আটকে থাকা অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘খাদ্য মূল্যস্ফীতি দরিদ্র পরিবারগুলোকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে। কারণ তারা তাদের আয়ের সিংহভাগ অংশই খাবারের পেছনে ব্যয় করেন। আর এ খাদ্যপণ্যের দাম বিভিন্ন উপাদানের ওপর নির্ভর করে। এর মধ্যে রয়েছে উৎপাদন খরচ, বিপণনের অদক্ষতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের বাধা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সরবরাহের ঘাটতি, মজুদদারি ও বাজারে দুর্বল প্রতিযোগিতা। তাই একক কোনো কারণ দিয়ে এ মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক সচিব ও কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘সরকার একদিকে কৃষকদের ভর্তুকি দিচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আবার চাঁদাবাজির কারণেও পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ বাড়ছে। দিন শেষে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ভোক্তা ও কৃষকরা। আমাদের এ বিষয়গুলো নিয়েও আলাদা করে ভাবতে হবে।’

সংলাপে আরো কথা বলেন সাবেক অর্থ সচিব সিদ্দিকুর রহমান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তার মণ্ডল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার লিমা প্রমুখ।