রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের পানির ওপর নির্ভর করে দেশের একমাত্র কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন। হ্রদে পানির পরিমাণ বেশি থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে উৎপাদনও বেড়ে যায়। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয় কেন্দ্রটির। তবে কয়েকদিনের ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে কাপ্তাই হ্রদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির তিন ইউনিটে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে ৯৮-১০০ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী এটিএম আবদুজ্জাহের বলেন, ১৯ জুন সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে তিনটি ইউনিটে মোট ৯৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে ২ নম্বর ইউনিটে ৩৯ মেগাওয়াট, ৩ নম্বর ইউনিটে ২৯ ও ৫ নম্বর ইউনিটে ৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। ১ নম্বর ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও ৪ নম্বর ইউনিটটি হ্রদে পানি আরো বাড়লে সচল করা হবে। চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। ধীরে ধীরে কাপ্তাই হ্রদে বাড়বে পানি। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়বে। আমাদের সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে কাপ্তাই হ্রদের পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব পড়েছিল। হ্রদে পানির পরিমাণ কমতে থাকায় মার্চের শেষ দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিট বন্ধ রাখা হয়। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আগে থেকে অচল রয়েছে। কিন্তু অন্য চারটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও পানি সংকটের কারণে দুটি ইউনিটের উৎপাদন সচল ছিল। ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে কাপ্তাই হ্রদের পানির পরিমাণ বাড়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আরো একটি ইউনিট সচল হয়েছে। বর্তমানে উৎপাদনে গিয়েছে তিনটি ইউনিট।
কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণকক্ষ (কন্ট্রোল রুম) সূত্রে জানা গেছে, রুলকার্ভ অনুযায়ী কাপ্তাই হ্রদে পানির ধারণক্ষমতা ১০৯ এমএসএল (মিনস সি লেভেল)। হ্রদে বর্তমানে ৮৯ দশমিক ৭৬ এমএসএল পানি থাকার কথা থাকলেও ১৯ জুন বিকাল পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে পানি ছিল ৭৭ দশমিক ৪ এমএসএল। পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিট সচল। উৎপাদিত বিদ্যুতের পুরোটাই জাতীয় গ্রিডে দেয়া হচ্ছে। হ্রদে পানি বাড়তে থাকলে বাকি ইউনিটটিও সচল করা যাবে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রণকক্ষ সূত্র।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণকক্ষের দায়িত্বরত একজন পালা-প্রকৌশলী বণিক বার্তাকে জানান, শুষ্ক মৌসুমে প্রতি বছরই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে আসে। আবার হ্রদে পানি বাড়তে থাকলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ে, এবারো তাই হয়েছে। রুলকার্ড অনুযায়ী হ্রদে পর্যাপ্ত পানি বাড়লে চারটি ইউনিটে সর্বোচ্চ উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হবে।
এদিকে, প্রতি বছরই কাপ্তাই হ্রদে পানি কমতে শুরু করার কারণে ১ মে-৩১ জুলাই পর্যন্ত পোনা মাছের সুষম বৃদ্ধি ও প্রজনন নিশ্চিতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১ আগস্ট থেকে শুরু হবে মাছ আহরণ। গত দুই বছরে এ নিয়মে ব্যত্যয় হয়েছে।
হ্রদে পর্যাপ্ত পানি না বাড়ায় গত মৌসুমের পুরো আগস্ট ও এর আগের মৌসুমে ১০ আগস্টের পর মাছ ধরা শুরু হয়েছিল। এবার যদি নির্ধারিত তিন মাসের মধ্যে হ্রদে পর্যাপ্ত পানি থাকে, তাহলে ১ আগস্ট থেকে নিয়মানুযায়ী মাছ ধরা শুরু হবে বলে জানায় বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। বিএফডিসি রাঙ্গামাটি কেন্দ্রের সহকারী বাজারজাত কর্মকর্তা শোয়েব সালেহীন জানান, এ মৌসুমের জুলাই মাসে ভারি বৃষ্টি হবে। আরো এক মাসের বেশি সময় মাছ আহরণ বন্ধ থাকবে। পর্যাপ্ত পানি বাড়লে ১ আগস্ট থেকে মাছ ধরা শুরু হবে।
প্রসঙ্গত, ষাটের দশকে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দেয়ার কারণে গড়ে ওঠে বিস্তীর্ণ কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ। পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দেয়া অংশে চালু করা হয়েছে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎকেন্দ্র কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র। শুরুর দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৮০ মেগাওয়াট। পরবর্তী সময়ে দুই ধাপে স্থাপনাটির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে মোট ২৩০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়েছে। এ উৎপাদনের পুরোটাই যোগ হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। কাপ্তাই বাঁধের মধ্যে ১২ দশমিক ২ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১১ দশমিক ৩ মিটার প্রস্থের ১৬টি জলকপাট বা স্লুইস গেট রয়েছে। এ ১৬টি জলকপাট দিয়ে একত্রে প্রতি সেকেন্ডে ৫ লাখ ২৫ হাজার কিউসেক পানি নির্গমন করতে পারে।










