পূর্ব পাকিস্তানে যে তাদের অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক নয় সেটা হয়তো তখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অনুমান করতে পারছিলেন। তাই শেষ মুহূর্তে একটা ভিন্ন কৌশলে পরাজয় এড়ানোর সুযোগ খুঁজেছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ইয়াহিয়া খানের সরকার পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্তে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। যার নাম দেয়া হয় ‘অপারেশন চেঙ্গিস খান’। অভিযানের শুরুতেই পাকিস্তান বিমান বাহিনী (পিএএফ) একসঙ্গে পূর্ব পাঞ্জাব ও ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বেশ কয়েকটি বিমানঘাঁটিতে একযোগে আক্রমণ চালায়। পাশাপাশি স্থল অভিযানও শুরু হয়। পাকিস্তানের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ইশতিয়াক আহমেদের মতে, ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশ্য ছিল ভারতকে আক্রমণ করে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং এর মাধ্যমে দ্রুত যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা। কিন্তু তার এ কৌশল কাজে লাগেনি। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। এ শোচনীয় পরাজয়ের জন্য ইয়াহিয়া খান যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কারণ তার আশা ছিল, এ দুই দেশ তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। ইশতিয়াক তার ‘দ্য পাকিস্তান মিলিটারি ইন পলিটিকস: অরিজিনস, ইভোল্যুশন, কনসিকুয়েন্সেস’ গ্রন্থে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন।

‘অপারেশন চেঙ্গিস খান’ নামটি বেছে নেয়া পাকিস্তানের মতো একটি ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য ছিল অবাক করা বিষয়। কারণ ১১৬২ থেকে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দ সময়কালে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন মুসলিম সাম্রাজ্যে ধ্বংসযজ্ঞ চালান মোঙ্গল শাসক চেঙ্গিস খান।

৩ ডিসেম্বর ‘অপারেশন চেঙ্গিস খান’ শুরুর পর ভারতীয় সেনারা দ্রুত পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করে ঢাকার দিকে অগ্রসর হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই পাকিস্তান ঢাকায় আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। এ আত্মসমর্পণের পুরো অনুষ্ঠান সরাসরি দেখানো হয় বিভিন্ন ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক টেলিভিশন চ্যানেলে। আত্মসমর্পণের পর ৯৩ হাজার পাকিস্তানিকে যুদ্ধবন্দি করা হয়, যার মধ্যে অনেক বেসামরিক মানুষও ছিল। এর ফল হলো পাকিস্তানের চরম পরাজয় ও পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ।

ইশতিয়াক আহমেদের মতে, পশ্চিম ফ্রন্ট খোলার মাধ্যমে ইয়াহিয়া খানের পরিকল্পনা ছিল যুদ্ধ পরিস্থিতি জটিল করে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ও দ্রুত যুদ্ধবিরতি আদায় করা। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। এ শোচনীয় পরাজয়ের জন্য ইয়াহিয়া খান যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতি মারাত্মক ক্ষুব্ধ হন। কারণ তার আশা ছিল, এ দুই দেশ সমর্থন দিয়ে তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। এ বিষয়ে সামরিক বিশ্লেষক ব্রায়ান ক্লাওলি তার ‘আ হিস্ট্রি অব দ্য পাকিস্তান আর্মি: ওয়ারস অ্যান্ড ইনসারেকশনস’ বইয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘চীন যদি সামান্য কোনো পদক্ষেপও নিত তাহলে ভারতের মনোযোগ উত্তর সীমান্তে কেন্দ্রীভূত হতো। সেক্ষেত্রে পাকিস্তান বড় ধরনের সুবিধা পেত। কিন্তু কড়া ভাষায় বিবৃতি দেয়া সত্ত্বেও চীন কার্যত নিরপেক্ষ অবস্থানেই থেকে যায়।’

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন বঙ্গোপসাগরে একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠালেও হেনরি কিসিঞ্জারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর সম্ভাব্য ভারতীয় হামলা ঠেকানোর জন্য ‘ভয় দেখানো’, এর বেশি কিছু নয়।

এদিকে চীন জাতিসংঘের সদস্যপদ পায় ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর। দেশটির প্রতিনিধি জাতিসংঘের কার্যক্রমে এবং ২৩ নভেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের একটি সভায় অংশ নেন। এটা সম্ভব হয়েছিল তখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পারস্পরিক সমঝোতার সম্পর্কের কারণে। তাছাড়া কিসিঞ্জারও চীনের সহযোগিতা চাচ্ছিলেন, যাতে ভারত পশ্চিম পাকিস্তানে পাল্টা আক্রমণে নিরুৎসাহিত হয়।

এর মধ্যে ৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়া শুরুর পদক্ষেপ নেয়। এজন্য দেশটি ফের চীনের সহযোগিতা কামনা করে এবং তা পেয়েও যায়। চীন প্রকাশ্যে পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছিল। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট সমাধানে পাকিস্তানের ব্যর্থতা তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বলা যায়, পাকিস্তানের দুই অংশের ভাঙন তখন সব পরাশক্তিই অবধারিত বলে মেনে নিয়েছিল।

ইশতিয়াক আহমেদের মতে, যুদ্ধে পরাজয় এবং পাকিস্তানের ভাঙন দেশটির সেনাবাহিনীর অহমে মারাত্মক আঘাত হানে, যা ঢাকতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রচার দপ্তর নিজেদের বীরত্বসূচক নানা কল্পকাহিনী ছড়াতে থাকে। প্রচার করা হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দারুণ সব জয়ের গল্প। এ রকম প্রচারণা চালানো হয়েছিল দেশ দুটির মধ্যে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময়ও।

১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণের পর নিক্সনের পরামর্শ অনুযায়ী ইয়াহিয়া খান ও পাকিস্তানের হাইকমান্ড ইন্দিরা গান্ধীর প্রস্তাবিত একতরফা অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হতে আরো দুদিন সময় নেয়। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় তীব্র চাপ সৃষ্টি করছিল, যা পাকিস্তান সরকারকে অবিলম্বে সমাধান করতে হতো। একটি হলো বড় পরাজয় নিয়ে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অপমানবোধ ও বিরক্তি। তারা খারিয়ান সেনানিবাসে প্রতিবাদ করার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। অন্য সব স্থানেও তাদের মধ্যে একই রকম ঘৃণা ও ক্রোধ বিরাজ করছিল। এ পরিস্থিতিতে ইয়াহিয়ার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা, জেনারেল হামিদ রাওয়ালপিন্ডির আইয়ুব হলে ২০ ডিসেম্বর অফিসারদের সামনে বক্তব্য রাখেন। তিনি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে সরকার উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে সব ধরনের রাজনৈতিক চেষ্টা করেছে। কিন্তু উপস্থিত অফিসাররা তার এ বক্তব্যকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। আর হামিদ বাহ্যত হতাশ হয়ে আইয়ুব হল ত্যাগ করেন।

কিন্তু ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকির মতে, পুরোটাই ছিল হামিদের ছল। আসলে তিনি হলে এসেছিলেন ইয়াহিয়া আর ক্ষমতায় টিকতে পারবেন কিনা, তা বোঝার জন্য। কারণ সবাই চলে যাওয়ার পর পরই রেডিও পাকিস্তান থেকে ঘোষণা দেয়া হলো ইয়াহিয়া খান পদত্যাগ করেছেন। এর পরই জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান জেনারেল গুল হাসান খান ও এয়ার মার্শাল রহিম খান।