দেশে উৎপাদিত মাছ ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগেই সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন ধাপে বড় একটি অংশ নষ্ট হচ্ছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে করা সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ কেজি মাছের মধ্যে সাড়ে ২২ কেজি, অর্থাৎ সাড়ে ২২ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। এর মধ্যে কৃষক পর্যায়ে ১০ দশমিক ২১ কেজি এবং বিক্রেতা পর্যায়ে ১২ দশমিক ৩১ কেজি ক্ষতি হয়। গবেষণায় ক্ষতির মধ্যে শারীরিক ক্ষতি, মানগত অবনতি ও বাজারমূল্যজনিত ক্ষতি—তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব, মাছের দুর্বল হ্যান্ডলিং, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, চাহিদা ও সরবরাহের ওঠানামা, যোগাযোগ পরিষেবার ঘাটতি এবং সংগ্রহ কেন্দ্রের অদক্ষতা দেশে মাছের এ ক্ষতির অন্যতম কারণ। এমন বাস্তবতায় সারা বিশ্বের মতো আজ দেশেও পালিত হবে আন্তর্জাতিক খাদ্য ক্ষতি ও অপচয় সচেতনতা দিবস।

‘পোস্টহারভেস্ট লসেস অ্যালং দ্য স্মল-স্কেল ফিশ ভ্যালু চেইন ইন বাংলাদেশ: পারসেপশনস, ডিটারমিন্যান্টস অ্যান্ড ইমপ্লিকেশনস ফর ফুড সিকিউরিটি’ শীর্ষক গবেষণাটি চলতি বছরের এপ্রিলে ‘ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন’ জার্নালে প্রকাশ হয়। গবেষণাটি করেছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক।

গবেষণায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার নির্বাচিত উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি সিলেটের বাইরের উৎস থেকে আসা মাছও গবেষণার আওতায় ছিল। গবেষণায় ৬৫ জন মাছচাষী, খুচরা-পাইকারি বিক্রেতা ৯৫ জন ও ৬০ জন ভোক্তা অংশ নেন।

গবেষণার হিসাবে কৃষক পর্যায়ে প্রতি ১০০ কেজি মাছে গড়ে পোস্ট হারভেস্ট লস হয় ১০ দশমিক ২১ কেজি। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৫১ কেজি শারীরিক নষ্ট, ৩ দশমিক ২১ কেজি মানের দিক থেকে ক্ষতি (নষ্ট) এবং ৩ দশমিক ৪৯ কেজি বাজারমূল্যজনিত ক্ষতির সম্মুখীন হয়। বিক্রেতা পর্যায়ে ক্ষতি আরো বেশি। প্রতি ১০০ কেজিতে তাদের মোট গড়ে ১২ দশমিক ৩১ কেজি নষ্ট। এর মধ্যে ৩ দশমিক ৩১ কেজি শারীরিক, ৪ দশমিক ৫২ কেজি মানগত এবং ৪ দশমিক ৪৮ কেজি বাজারমূল্যজনিত ক্ষতি রয়েছে।

গবেষণায় অংশ নেয়া কৃষক ও বিক্রেতাদের মতে, মাছ নষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ উচ্চ তাপমাত্রা ও প্রতিকূল আবহাওয়া। দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে তারা বলেন, সংরক্ষণ সুবিধার অভাবের কথা। এছাড়া মাছ পচে যাওয়া এবং মাছ ধরার পর সঠিকভাবে হ্যান্ডলিং না করার কারণে বড় অংশ নষ্ট হয়। পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত চাহিদা ও সরবরাহ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, কার্যকর যোগাযোগ পরিষেবার অভাব এবং সংগ্রহ কেন্দ্রের অদক্ষতা ও কোল্ড চেইন বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অভাবে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। কৃষকদের ৪৬ শতাংশ এবং বিক্রেতাদের প্রায় ৭৪ শতাংশ মাছ সংরক্ষণে বরফ ব্যবহার করেন। ৬৭ শতাংশ বিক্রেতার কোনো কুলিং সুবিধা নেই।

গবেষক ও সিলেট ‍কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ টেকনোলজি ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল বিভাগের অধ্যাপক ড. জাকিউল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মাছ ধরার পর যখন সেটি মারা যায় তখনই এটিকে ফ্রিজিং বা শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় রাখতে হয়। বাংলাদেশে এ ব্যবস্থা ঠিকমতো না থাকা পোস্ট হারভেস্ট লসের প্রধান সমস্যা। এখানে একটি ফ্যাক্টর কাজ করে। মাছকে বরফে রাখলে ভোক্তারা ভাবেন এটি পচা মাছ, এজন্য বরফে রাখা হয়েছে। এই ডিলেমার কারণে বিক্রেতারা মাছকে পর্যাপ্তভাবে বরফে রাখেন না। অথচ কোল্ড চেইন ম্যানেজমেন্টের অভাবে সবচেয়ে বেশি লস হয়। আরেকটি বিষয়, গ্রামে বরফের ব্যবস্থা নেই। দেখা গেল, সকালে মাছ ধরে বিকাল ৩টা-৪টা বা সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রি করে। ওই জায়গার মাছগুলোর অধিকাংশই পচে যায়। বরফ না দেয়ার কারণে বাহ্যিকভাবে মাছকে ভালো দেখা গেলেও বায়োকেমিক্যালি তার মান অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া জেলেদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি আছে। তারা ধরার পর সেটিকে সঠিক উপায়ে সংরক্ষণ করতে পারেন না।’

নষ্ট হয়ে যাওয়া বা মান কমে যাওয়া মাছ কোথায় যায়। সেটিও গবেষণায় উঠে এসেছে। অবিক্রীত বা নষ্ট মাছ ফেলে দেয়ার কথা জানিয়েছে ৪০ শতাংশ কৃষক এবং ২১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ বিক্রেতা। কৃষকদের ২৯ দশমিক ২৩ শতাংশ ও বিক্রেতাদের ২১ শূন্য ৫ শতাংশ জানিয়েছে তারা নষ্ট বা ক্ষতি হওয়া মাছ কম দামে বিক্রি করে। এছাড়া শুকিয়ে বানানো বা শুঁটকি উৎপাদকের কাছে সরবরাহের কথা জানিয়েছে কৃষকদের ২৪ দশমিক ৬২ শতাংশ ও বিক্রেতাদের ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

গবেষণার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা, সংরক্ষণ সম্পর্কে জ্ঞান, পেশাজীবী সংগঠনে যুক্ত থাকা এবং ভালো পরিবহন সুবিধা ক্ষতি কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত। দূরের বাজারে মাছ বিক্রি এবং বেশি দূরত্বে পরিবহনের ফলে ক্ষতি বাড়ার কথাও উঠে এসেছে। মৎস্যচাষী ও বিক্রেতাদের মধ্যে সংরক্ষণ বিষয়ে জ্ঞানের ঘাটতিও প্রকট। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ চাষী এবং ৯২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বিক্রেতার মাছ চাষ বা সংরক্ষণ বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই। ফলে শুধু অবকাঠামো নয়, দক্ষতার ঘাটতিও মাছ নষ্ট হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে আসে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক মোহা. ইয়ামিন হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের প্রথম লসটা শুরু হয় যখন মাছ ধরা হয়। জেলেদের জীবনে কখনো ট্রেনিং দেয়া হয়নি যে সফিসটিকেটেড ওয়েতে মাছের ইনজুরি ছাড়া কীভাবে ধরা যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘মাছ কাটাকাটির সময়, রান্না এবং রান্না-পরবর্তী খাবার পর্যায়েও মাছের লস থাকছে। সব মিলিয়ে আমরা ২২ শতাংশের মতো লস করছি। বৈশ্বিকভাবে তুলনা করলে মাছের পোস্ট হারভেস্ট লস কিন্তু ৫-৭ শতাংশের বেশি না। আমরা এগুলো কমিয়ে আনতে পারি। এরপর কোল্ড চেইন উন্নত করতে হবে।’

মাছের পোস্ট হারভেস্ট লস কমানো এবং নাড়িভুঁড়ি ও আঁশের বিকল্প ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষতি কমিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে জানিয়ে এ মৎস্য গবেষক বলেন, ‘মাছের নাড়িভুঁড়িকে খুব সহজে আমরা মাছের খাদ্য তৈরির কাজে ব্যবহার করতে পারি। আঁশ ও কাঁটা ফেলে দেয়া হয়। এগুলোকে ইউটিলাইজ করে বিভিন্নভাবে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। জাপানে মাছের নাড়িভুঁড়ি স্যুপ তৈরিতে ব্যবহার করে। কাঁটাগুলো সুন্দর করে কেটে রেখে মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। আঁশও একইভাবে ব্যবহার হচ্ছে। আর মাছের চামড়া বিভিন্ন প্রসাধনীতে ব্যবহার করছে।’