আসন্ন সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়েছিল। টানা ৯ দিনে আপিল শুনানির পর বিভিন্ন কারণে (ঋণখেলাপি, দ্বৈত নাগরিকত্ব, এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনে গড়মিল, হলফনামায় অসঙ্গতি ও মনোনয়নপত্র দাখিলে ত্রুটি) কমিশন ২০০ জন প্রার্থীকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছে। এখন সংক্ষুব্ধরা আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে অংশ নিতে আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তবে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে (বাতিল–গ্রহণ) ভোটের মাঠে ফিরেছেন ৪১৮ জন। আপিল আবেদন প্রত্যাহার ও অনুপস্থিতির কারণে বাকি ২৭ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। তবে কুমিল্লা-৩ আসনের বিএনপির বৈধ প্রার্থী সৈয়দ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের বিরুদ্ধে আপিল নামঞ্জুর করায় শুনানির পরের দিন অর্থাৎ সোমবার তিনি প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। এ হিসাবে দ্বৈত নাগরিকত্বে ২৪ জনের মধ্যে ২২ জন প্রার্থিতা ফিরে পেলেন।

ইসির প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রার্থিতা ফিরে না পাওয়া ২০০ জনের মধ্যে ৯৮ জনই স্বতন্ত্র প্রার্থী। এর বাইরে বিএনপি-জামায়াতসহ ছোট-বড় মিলিয়ে ১৮টি রাজনৈতিক দলের ৫১ জন রয়েছেন। বাকিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্য।

উল্লেখযোগ্য দলভিত্তিক ৫১ জনের মধ্যে জাতীয় পার্টির (জাপা) ১৪ জন, জাতীয় পার্টি (জেপি) ৭ জন, গণঅধিকার পরিষদের ৫ জন, বিএনপির ৪ জন, বিএনপির বিদ্রোহী ৪ জন, ইসলামী আন্দোলনের ৩ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ২ জন ও খেলাফত মজলিসের ২ জন রয়েছেন।

এদিকে প্রার্থী হারানো বিএনপির চারজন হলেন—ঋণখেলাপির কারণে কুমিল্লা-৪ আসনের মুঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, যশোর-৪ আসনে টি এস আইয়ুব ও চট্টগ্রাম-২ আসনের সারোয়ার আলমগীর। আর কুমিল্লা-১০ আসনের আবদুল গফুর ভূঁইয়া আপিলে অনুপস্থিত থাকায় দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিল হয়।

অপরদিকে বিএনপির বিদ্রোহীরা হলেন—সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে মো. শফিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহ-৬ আসনে মো. সাইফুল ইসলাম, কুমিল্লা-১০ আসনে মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া ও যশোর-১ আসনে মো. মফিকুল হাসান তৃপ্তি।

একইভাবে গণঅধিকার পরিষদের শরীয়তপুর-২ আসনে আখতারুজ্জামান সম্রাট, গোপালগঞ্জ-১ আসনে মো. কবির মিয়া, চট্টগ্রাম-১৩ আসনে মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১১ আসনে মুহাম্মদ নেজাম উদ্দিন ও পাবনা-৩ আসনে মো. হাসানুল ইসলাম প্রার্থিতা হারিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের নরসিংদী-২ আসনে আলহাজ ইঞ্জিনিয়ার মুহসীন আহমেদ, ঝিনাইদহ-১ আসনে মো. আলম বিশ্বাস ও বাগেরহাট-১ আসনে মুজিবর রহমান শামীম। ন্যাশনাল পিপলস পার্টির কিশোরগঞ্জ-৬ আসনে মো. নজরুল ইসলাম ও নাটোর-২ আসনে জি এ এ মুবিন। খেলাফত মজলিসের ময়মনসিংহ-৯ আসনে শামসুল ইসলাম ও নাটোর-১ আসনে মো. আজাবুল হকের প্রার্থিতা টেকেনি।

আর নরসিংদী-৪ আসনে বাংলাদেশ কংগ্রেসের কাজী শরিফুল ইসলাম, ঢাকা-১৭ আসনে এবি পার্টির ফারাহ নাজ সাত্তার, ঢাকা-৮ আসনে নিউক্লিয়াস পার্টি বাংলাদেশের মোহাম্মদ সিদ্দিক হোসাইন, রংপুর-৬ আসনে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মো. কামরুজ্জামান, ঢাকা-১৩ আসনে আমজনতা দলের রাজু আহমেদ, ময়মনসিংহ-১ আসনে বাংলাদেশ লেবার পার্টির মুহাম্মদ রাশেদুল হক, নারায়ণগঞ্জ-২ ও ঢাকা-১০ আসনে বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. আবু হানিফ হৃদয়, সিরাজগঞ্জ-২ আসনে জনতার দলের মো. সোহেল রানা, নোয়াখালী-৫ আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের মো. কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী ও চট্টগ্রাম-১২ আসনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির এম. ইয়াকুব আলীর প্রার্থিতাও শুনানিতে বাতিল হয়েছে।

জাতীয় পার্টির দুই গ্রুপও হারাল ২১ প্রার্থী

১৪ দলের শরিক দল হিসেবে পরিচিত জাতীয় পার্টির দুটি গ্রুপও ২১ জনের প্রার্থিতা হারিয়েছে। এর মধ্যে জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাপার ১৪ জন ও জাতীয় পার্টির (জেপি) ৭ জন প্রার্থিতা হারিয়েছেন।

জিএম কাদেরের জাতীয় পার্টির ১৪ জন হলেন—গাজীপুর-২ আসনে মোহাম্মদ ইস্রাফিল মিয়া, নোয়াখালী-৬ আসনে নাছিম উদ্দিন, কুমিল্লা-৮ আসনে নুরুল ইসলাম মিলন, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে মো. মুজিবুল হক, সাতক্ষীরা-২ আসনে শেখ মাতলুব হোসেন লিয়ন, নীলফামারী-৩ আসনে মো. রোহান চৌধুরী, সাতক্ষীরা-৪ আসনে হুসেইন মুহাম্মদ মায়াজ, ঝালকাঠি-২ আসনে এম এ কুদ্দুস খান, সুনামগঞ্জ-৫ আসনে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, মানিকগঞ্জ-২ আসনে এস এম আব্দুল মান্নান, রংপুর-১ আসনে মো. মঞ্জুম আলী, ঢাকা-৩ আসনে মো. ফারুক, ঢাকা-১১ আসনে এস এম আমিনুল হক সেলিম ও গাইবান্ধা-১ আসনে মো. মাফুজুল হক সরদার।

অন্যদিকে জেপির প্রার্থিতা হারানো ৭ জন হলেন—জামালপুর-২ আসনে মোস্তফা আল মাহমুদ, চট্টগ্রাম-৫ আসনে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, চট্টগ্রাম-৩ আসনে এম এ ছালাম, চট্টগ্রাম-১২ আসনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জামালপুর-২ আসনে মো. আনোয়ার হোসেন, খুলনা-৬ আসনে মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর ও শেরপুর-২ আসনে মো. রফিকুল ইসলাম (বেলাল)।

হাইকোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি বেশিরভাগ প্রার্থীর

ইসির কাছ থেকে প্রার্থিতা ফেরত না পাওয়া বেশিরভাগ প্রার্থী হাইকোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাঁদের বিশ্বাস, উচ্চ আদালত থেকে তাঁরা কাঙ্ক্ষিত রায় নিশ্চিত করতে পারবেন। এ বিষয়ে বিএনপি মনোনীত কুমিল্লা-৪ আসনের প্রার্থী মুঞ্জুরুল আহসান মুন্সী বলেন, ‘আমাদের যে পদক্ষেপ গ্রহণ করার, আমরা সেটি শুরু করে দিয়েছি। আমরা অবশ্যই হাইকোর্টে যাব। এত সহজ নয় আমাকে সরিয়ে দেয়া। আমি অবশ্যই আমার প্রার্থিতা ফিরে পাব।’ অনুরূপ কথা জানান বিএনপির মনোনীত চট্টগ্রাম-২ আসনের প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর।

এবার আপিল শুনানিতে দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া পুরো শুনানি উৎসবমুখর পরিবেশে হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি বলেন, ‘যা তাদের চিন্তার মধ্যে ছিল না।’