আমিষের ঘাটতি পূরণ ও দারিদ্র্য বিমোচনে দুই দশক আগে বাগেরহাট সদর উপজেলার কাঁঠালতলায় তিন একর জমিতে স্থাপন করা হয় মুরগি খামার। বিভিন্ন কারণে খামারটি বন্ধ হয়ে গেলে ২০১২ সালে সেখানেই গড়ে তোলা হয় আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার। তবে খামারটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ২০১৭ সালে। মিঠা পানির চাহিদা মেটাতে খামারে স্থাপন করা হয় গভীর নলকূপ। তবে সে পানি আয়রন ও লবণাক্ত হওয়ায় খামারের শেডগুলোতে মরিচা ধরেছে। বাচ্চা ফোটানো ইনকিউবেটর মেশিনও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় গত চার অর্থবছরে ডিম উৎপাদন কমেছে ৪০ শতাংশ। তবে বাচ্চা উৎপাদন কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে। দ্রুত খামারে মিঠা পানির ব্যবস্থা করা না গেলে বাচ্চা ফোটানোও বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

খামারসংশ্লিষ্টরা জানান, হাঁস পালনের জন্য তৈরি করা হয় ছয়টি লেয়ার শেড। লোনা পানির কারণে বিকল হয়ে যাচ্ছে খামারের যন্ত্রপাতি। খামারে চায়না বেইজিং ও জিংডিং প্রজাতির হাঁস রয়েছে। একটি করে অফিস ভবন, ডরমিটরি ভবন, হ্যাচারি ভবন, ব্রুডার শেড, গ্রোয়ার শেড, গুদাম, গ্যারেজ, পাম্প হাউজ, জেনারেটর হাউজও রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে খামারের আউটসোর্সিং কর্মী মো. জয়নুল আবেদীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লেয়ারে শেডে হাঁস রয়েছে অন্তত ৫০০টি। এসব হাঁস থেকে ৩০০-৩৫০ ডিম উৎপাদন হয়। তবে খামারের মূল সংকট হলো মিঠা পানি। নলকূপের পানি লবণাক্ত ও আয়রনের কারণে ইনকিউবেটর মেশিনগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। চিলার মেশিনগুলো একেবারে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। মিঠা পানির ব্যবস্থা করা গেলেই রক্ষা করা যাবে কোটি টাকার এ খামার।’

খামারের পোলট্রি টেকনিশিয়ান উজ্জ্বল কুমার রায় বলেন, ‘খামারে বছরে বাচ্চা উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৫০ হাজার। এর বিপরীতে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার বাচ্চা উৎপাদন হয়েছে। প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিদের বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। এখান থেকে বাচ্চা নিয়ে তারা পারিবারিকভাবে খামার গড়ে তুলছেন। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন। পাশাপাশি পারিবারিক সচ্ছলতাও বাড়ছে। হাঁসের বাচ্চার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করে মিঠা পানির ব্যবস্থা করা না হলে বাচ্চা উৎপাদন ব্যাহত হবে।’

খামারে গত চার অর্থবছরে ডিম ও বাচ্চা উৎপাদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার। উৎপাদন হয় ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৪টি। বাচ্চার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০ হাজার। এর বিপরীতে উৎপাদন হয় ৭৭ হাজার ৬৮৮টি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাচ্চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০ হাজার। উৎপাদন হয়েছিল ৫৪ হাজার ৪০১টি। আর ডিমের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার। তবে উৎপাদন হয় ১ লাখ ৩০ হাজার পিস। সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার ৩৮ শতাংশ ডিম উৎপাদন কম হয় খামারটিতে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন আরো কমে যায়। ওই বছরও ডিমের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার পিস। উৎপাদন হয় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮৭টি, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪ শতাংশ কম। তবে বাচ্চার লক্ষ্যমাত্রা ৫০ হাজার ধরা হলেও উৎপাদন হয় ৫৩ হাজার ৮৭৪টি।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাচ্চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ হাজারটি। এর বিপরীতে উৎপাদন হয় ৭৫ হাজার ১৩০টি। আর ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ লাখ ৮০ হাজার। তবে উৎপাদন হয় ১ লাখ ৭০ হাজার ৯৩৯টি। সে হিসাবে ওই বছর ডিম উৎপাদন ৫ শতাংশ কম হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বাচ্চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫০ হাজার। তবে নভেম্বর পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৪০টি। ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ লাখ ৮০ হাজার। তবে উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ১৩৩টি, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫৬ শতাংশ কম। গড় হিসাবে গত চার বছরে ডিম উৎপাদন কমেছে ৪০ শতাংশ।

প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণাক্ত পানি হাঁসের শরীরে ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে, যা সরাসরি ডিম উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এছাড়া, লবণাক্ত পানির কারণে খামারের যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়, যা বাচ্চা উৎপাদন ব্যাহত করে এবং পানির গুণগত মান খারাপ হওয়ায় হাঁসের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও খাদ্যগ্রহণ কমে যায়। ফলে ডিম ও বাচ্চা উৎপাদন উভয়ই হ্রাস পায়।

আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামারের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) এএফএম ফয়জুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লবণাক্ত পানি ও আয়রনের কারণে ইনকিউবেটরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোটি টাকার ইনকিউবেটর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মিঠা পানির বিকল্প নেই। মিঠা পানির জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করা জরুরি।’

হাঁস পালন ও প্রজনন, বাচ্চা ও ডিম বিক্রি এবং খামারিদের প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্দেশ্যে খামারটি গড়ে তোলা হয়। এ অঞ্চলে দিন দিন হাঁসের বাচ্চার চাহিদা বাড়ছে। অনেকে এখান থেকে বাচ্চা সংগ্রহ করে খামার গড়ে তুলছেন।

এএফএম ফয়জুল ইসলাম জানান, খামারে উৎপাদিত বাচ্চা মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, চিতলমারীসহ বাগেরহাটের পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলায় সরবরাহ করা হয়। বাচ্চা উৎপাদনে দেশের মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে খামারটি। অথচ খামারে নিরাপত্তা প্রহরী নেই।