নগরীর ধাপ এলাকায় ২০১৫ সালে ১০০ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় রংপুরের চিকলী পার্ক। শুরুতে পার্কটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল। প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থী পরিবার নিয়ে টিকিট কেটে পার্কে ঘুরতে যেতেন। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মাত্র ছয় বছরের মধ্যেই পার্কের সব রাইড নষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া বিনোদনপ্রেমীদের আকর্ষণে নতুন কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়নি দীর্ঘদিনে। তাই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পর্যটকরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের পহেলা বৈশাখ পার্কটির উদ্বোধন করেন সাবেক মেয়র মরহুম সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু। শুরু থেকেই পার্কটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে রংপুর সিটি করপোরেশন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পার্কটি গড়ে উঠেছে মূলত ছোট-বড় মোট পাঁচটি বিল ঘিরে। শিশুদের জন্য রয়েছে বিদ্যুত্চালিত নাগরদোলা, ঘূর্ণি দোলনা, সাজোয়া যান, গাড়ি, মেরিগোল্ড। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে আছে। পার্কে প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে গড়ে ওঠা ট্রেন লাইন দীর্ঘদিন অব্যবহূত থাকায় আশপাশে ঘাস গজিয়েছে। ট্রেনটি চালু না হওয়ায় শিশুরা ট্রেনে ওঠার স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কালেভদ্রে দুয়েকটি রাইড সচল থাকলেও তা উপভোগ করা অনেকটা ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে পার্কের প্রধান আকর্ষণ একটি স্পিড বোট ও একটি প্যাডেল বোট।

পার্কে ঘুরতে আসা চাকরিজীবী দম্পতি রানা ও নিতু বলেন, চাকরির জন্য শিশুদের নিয়ে কোথাও বের হতে পারি না। তাই ছুটি পেলেই সন্তানদের নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ি। চিকলী পার্কের বিল এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ আমাদের খুবই পছন্দ। আগে ছুটি পেলেই পার্কে দল বেঁধে আসতাম। এখন জরাজীর্ণ পার্কে তেমন আসা হয় না। তাছাড়া শিশুদের জন্য কোনো রাইড চালু না থাকায় বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়।

এ সময় তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে তারা বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে গরমের সময় পার্কে হঠাৎ বৃষ্টি আসায় দাঁড়ানোর জন্য কোনো শেড না থাকায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছিল। বিভাগীয় নগরীর মধ্যেই বৃহৎ পরিসরে দর্শনার্থীদের বিল এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে চিকলী পার্কের মতো একটিও আদর্শ স্থান নেই বললেই চলে। তাই পার্কটির জরাজীর্ণ অবস্থা দূর করে আধুনিকায়ন করা হলে সিটি করপোরেশনের যেমন রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে, তেমনি আশপাশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

হনুমান তলার বাসিন্দা রংপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আকবর হোসেন বলেন, পার্ক হওয়ার আগ থেকে মানুষ এখানে ঘুরতে আসত। পার্ক হওয়ার পর থেকে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বিনোদনপ্রিয় মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অথচ চিকলী পার্কের মোট জমির পরিমাণ এবং এর বিদ্যমান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশের অন্য কোনো সিটি করপোরেশনে আছে কিনা সন্দেহ।

তিনি বলেন, এটি সংস্কারের নামে আগের মেয়রের সময় সম্ভবত ৭ কোটি টাকার একটি দুর্নীতি হয়েছিল। এ নিয়ে মামলা চলমান। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের উচিত কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিয়ে ৫০ বছরের পরিকল্পনা করে পার্কের উন্নয়নে কাজ করা।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে পার্কটি দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতেন ৩৩ জন কর্মচারী। বর্তমানে পার্কটিতে কর্মরত মাত্র ১৬ জন। পার্ক চালুর প্রথম দিকে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় হতো। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার ৫০ হাজার টাকার মতো টিকিট বিক্রি হতো। এছাড়া বিশেষ দিবসে (বাংলা নববর্ষে) ৪-৫ লাখ টাকা আয় হতো। কিন্তু বর্তমানে পার্কের দৈন্যদশায় আয় চার ভাগের মধ্যে এক ভাগে নেমে এসেছে।

এদিকে পার্কের জমিসংলগ্ন ব্যক্তিগত উদ্যোগে নতুন একটি পার্ক নির্মাণকাজ চলায় আরো কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হতে চলেছে চিকলী পার্ক।

রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা স্বীকার করেন বর্তমানে চিকলী পার্কের একমাত্র আকর্ষণ বিলের স্পিড বোট।

তিনি বলেন, নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা শিশুদের রাইডসগুলো পর্যায়ক্রমে সচল করা হবে। এছাড়া ছেলে ও মেয়েদের জন্য দুটি সুইমিংপুল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। চিকলী পার্ক উন্নয়নে সিটি করপোরেশনের সুদূর পরিসর পরিকল্পনা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নামে পার্কটির নামকরণের জন্য কাজ চলছে।

পার্কটি পাশে অন্য পার্ক নির্মাণের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, পার্কটি করার জন্য কোনো অনুমোদন নেয়া হয়নি। তাই এটি ভেঙে ফেলা হবে।