বজ্রপাতের জন্য ‘চিহ্নিত’ দুর্যোগপ্রবণ এলাকা সিলেট। এরই মধ্যে গেল মাসে একই দিনে ওই অঞ্চলের তিন জেলায় নয়জনের প্রাণহানি ঘটেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এমনটি হচ্ছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। চলতি বর্ষা মৌসুমে আরো বেশি বজ্রপাতের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র (লাইটনিং অ্যারেস্টার মেশিন) বসানো হয়েছে। তবে এর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করতে এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। জেলা ত্রাণ কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষামূলকভাবে বসানো হয়েছে যন্ত্রটি। যদিও প্রয়োজনের তুলনায় এর সংখ্যা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হবিগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের সূত্র মতে, সিলেটের এ জেলাটিতে গত তিন বছর বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে ৪৮ জনের। এর মধ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২১ জনের মৃত্যু হয়। ২০২০ সালে ১৫ ও ২০২১ সালে ১২ জন বজ্রপাতে মারা যান। অর্থাৎ প্রতি বছর প্রাকৃতিক এ দুর্যোগে গড়ে ১৫ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায়। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গত ২০২১-২২ অর্থবছরে এ জেলায় বজ্রপাতনিরোধক যন্ত্র স্থাপনে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এর মধ্যে বাহুবল উপজেলায় বরাদ্দ দেয়া হয় ১৫ লাখ, নবীগঞ্জে ৩০, বানিয়াচংয়ে ৪৫, আজমিরীগঞ্জে ৩০, হবিগঞ্জ সদরে ১৫, লাখাইয়ে ২৫, শায়েস্তাগঞ্জে ১০, চুনারুঘাটে ১৫ ও মাধবপুরে ১৫ লাখ টাকা। ওই টাকা দিয়ে জেলার নয় উপজেলায় লাইটিং অ্যারেস্টার মেশিন স্থাপন করা হয়েছে।

জানতে চাইলে হবিগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা শাহ জহুরুল হোসেন বলেন, ‘জেলার সব উপজেলায় লাইটিং অ্যারেস্টার মেশিন স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। গত চার-পাঁচ মাস আগে আমরা এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তবে যন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে জানতে হলে চলতি মৌসুম শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

এদিকে দেশের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা সুনামগঞ্জে হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে আনতে সম্প্রতি বসানো হয়েছে ২৪টি লাইটনিং অ্যারেস্টার মেশিন। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এ প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। 

সুনামগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের সূত্র মতে, গত ১৬ ও ২৩ মার্চ হাওরে বজ্রপাতে মারা গেছেন দুজন। এরপর গত ২৩ এপ্রিল তিন উপজেলায় আরো ছয়জন মারা যান। ২০২২ সালে প্রাণ হারান ১৯ জন। এর আগে ২০২১ এবং ২০২২ সালে মৃত্যু হয় ১১ জন করে। ২০২০ সালে ১১ জনের প্রাণহানি ঘটে।

সুনামগঞ্জ জেলা দুর্যোগ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে ছয়টি উপজেলায় ২৪টি বজ্রনিরোধক মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। সম্প্রতি ছাতক এবং দোয়ারাবাজার উপজেলায় বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও এ দুটি উপজেলা এ প্রকল্পের বাইরে রয়েছে।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বলেন, ‘বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা গেলে ১০০ মিটার ব্যাসের মধ্যে লাইটনিং অ্যারেস্টার কাজ করবে। আশপাশে যারা থাকে তারা সুরক্ষা পাবেন। তবে জেলার সব উপজেলায় এখনো বজ্রপাতনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা যায়নি। বন্যার কারণে এ প্রকল্পের টাকা ফিরে গেছে।’ লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘মাত্র চলতি মৌসুমে যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। এর কার্যকারিতা দেখতে হলে বর্ষা মৌসুমের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মৌসুমের শুরুতেই সিলেটে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। চলতি মাসের ২১ এপ্রিল সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় বজ্রপাতে তিন শিশু মারা যায়। এ প্রাণহানির একদিন পর ২৩ এপ্রিল সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটে বজ্রপাতে নয়জনের প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে কৃষকির সংখ্যাই বেশি।

বাংলাদেশে বজ্রপাতের প্রবণতা ও মৃত্যুহার বিবেচনায় সরকার ২০১৬ সালে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বজ্রপাতকে ‘দুর্যোগ’ ঘোষণা করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্চ-এপ্রিল-মে মাস বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি থাকলেও মৌসুম পরিবর্তনের কারণে মে-সেপ্টেম্বরেও বজ্রপাত হতে পারে। এর জন্য নানা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকার। এর মধ্যে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে সরকার দেশজুড়ে এক কোটি তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছিল, যদিও পরে ২০২২ সালের মে মাসে তা বাতিল করে দেয়া হয়। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ৩৮ লাখের মতো তালগাছ লাগানোর পর দেখা গেছে, যত্নের অভাবে সেগুলো মারা যায়। এছাড়া একটি তালগাছ বড় হতে ৩০-৪০ বছর সময় লাগে। বজ্রপাত যেভাবে বাড়ছে তাল গাছ বড় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে গেলে বড় ধরনের ক্ষতির আশংকা রয়েছে। তাই বিকল্প হিসেবে তালগাছের প্রকল্প বাদ দিয়ে হাতে নেয়া হয় বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড ও লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন প্রকল্প।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের সমীক্ষা প্রতিবেদনের আলোকে দেশের অধিক বজ্রপাতপ্রবণ ১৫টি জেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হলো—নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, রাজশাহী, নবাবগঞ্জ, পাবনা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও দিনাজপুর। এ প্রকল্পের আওতায় সিলেট অঞ্চলের সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় স্থাপন করা হয়েছে বজ্রনিধোরক যন্ত্র। 

বজ্রনিরোধক দণ্ড ও যন্ত্র সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা জানান, তামা, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি ধাতুর বৈদ্যুতিক রোধের মাত্রা অনেক কম। তাই এ ধরনের ধাতু দিয়ে বজ্রনিরোধক দণ্ড তৈরি করা হয়। এটি উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎ সহজে নিরাপদে মাটিতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়। ৩০-৪০ ফুট লম্বা দণ্ডে তিন-চার ইঞ্চি জিআইপি পাইপ ও তামার তার থাকে। এছাড়া লাইটিং অ্যারেস্টার হচ্ছে একটি ডিভাইস, যা বসানো হয় বজ্রনিরোধক দণ্ডের ওপর। এর মূল কাজ নির্ধারিত ব্যাসের মধ্যে বজ্রপাত হলে তা টেনে মাটিতে নামিয়ে আনা। এতে মিটারের মতো কাউন্টার রয়েছে, কয়টি বজ্রপাত হল তার হিসাবও সেখানে থাকে। সারাক্ষণই সক্রিয় থাকে এ যন্ত্রটি।