বাংলাদেশের প্রাচীন শিল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রেশম শিল্প। দেশভাগের আগ থেকেই রাজশাহী অঞ্চলে রেশমের চাষ হতো। এখনো এক্ষেত্রে রাজশাহী অঞ্চল এগিয়ে। তবে পিছিয়ে নেই রংপুর অঞ্চলও। ছয় বছরের ব্যবধানে এ অঞ্চলে রেশম চাষ ও সুতা উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। রেশম চাষে রংপুর এখন রাজশাহী অঞ্চলের ঠিক পরেই অবস্থান করছে। লোকবল সংকটসহ নানা সমস্যা মোকাবেলা করে এগিয়ে যাচ্ছে রংপুরের রেশম শিল্প খাত। বর্তমানে এ অঞ্চলে বছরে প্রায় পাঁচ টন সুতা উৎপাদন হচ্ছে, প্রতি বছরই নতুন নতুন এলাকা লাভজনক রেশম চাষের আওতায় আসছে।

রংপুরের আঞ্চলিক রেশম সম্প্রসারণ কার্যালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০১৫ সালে গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও রংপুরে রেশম চাষে যুক্ত ছিলেন প্রায় এক হাজার চাষী। সে সময় প্রতি বছর রেশম গুটি উৎপাদন হতো ৩০-৩৫ হাজার। বর্তমানে চাষীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে দুই হাজারেরও বেশি এবং রেশম গুটি উৎপাদন হচ্ছে ৫০-৬০ হাজার।

এ অঞ্চলের অনেকেই রেশম পোকার চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। যাদের দেখে আরো অনেকে এ কাজে উৎসাহ পেয়েছেন। এমনই একজন রংপুর সিটি করপোরেশনের ১৫ নং ওয়ার্ডের ফতেপুর ভুরাঘাট এলাকার রোখসানা পারভীন। অনেকটা কৌতূহলের বশেই রেশমের চাষ শুরু করেন তিনি। এজন্য রেশম সম্প্রসারণ কার্যালয় থেকে রেশম (পলু) পোকার ১০টি ডিম, পোকা প্রতিপালনের উপকরণ ডালি, চন্দ্রকী, পোকার একমাত্র খাবার তুঁত পাতার ছোট-বড় মিলে ৬০০ গাছ বিনামূল্যে সংগ্রহ করেন। ডিম ফোটার পর পোকাগুলোকে এক মাস শুধু তুঁত পাতা খাওয়ানোর মাধ্যমে পাঁচ কেজি রেশম গুটি সংগ্রহ করেন তিনি। ৩০০ টাকা দরে প্রতি কেজি রেশম গুটি বিক্রি করেন। রোখসানা বলেন, এখন কেবল তুঁত পাতা সংগ্রহের জন্য ৮ শতক জমিতে তুঁতের আবাদ করেছেন, ভবিষ্যতে এ পরিমাণ আরো বাড়াতে হবে বলেই তার ধারণা।

রোকসানার মতো সুমি বেগম, নিত্য চন্দ্র বর্মণ, রাজিয়া বেগম এবং আরো অনেকেই এখন রেশম পোকা আবাদ করে বাড়তি আয় করেছেন। তবে এসব চাষী নিয়মিত তদারক করতে পারে না রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্র। মূলত লোকবল সংকটের কারণেই এ সমস্যার সৃষ্টি হয়। এ কারণে একাধিক জেলার রেশম চাষ তদারকির দায়িত্ব পালন করতে হয় একজন কর্মকর্তাকে। ফলে তার পক্ষেও সবসময় সবকিছু দেখভাল করা সম্ভব হয় না।

কয়েকটি জেলার দায়িত্বে থাকা রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্রের ম্যানেজার (সম্প্রসারণ) মো. হাসিবুল ইসলাম বলেন, সংকর (হাইব্রিড) জাতের রেশম পোকা শুধু তুঁত পাতা খেয়ে বেঁচে থাকে। এ গাছের নতুন পাতা হতে সময় লাগে দুই মাস। ডিম থেকে রেশম পোকা বের হওয়া ও গুটি সংগ্রহ পর্যন্ত সময় লাগে এক মাস। তাই বছরে চারবার রেশম চাষ হয়। চাষীরা উৎপাদিত গুটি কেন্দ্রের কাছে বিক্রি করেন। ১০-১২ কেজি গুটি থেকে এক কেজি রেশম সুতা পাওয়া যায়।

রংপুর অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি রেশম নীলফামারী জেলায় উৎপাদন হয় জানিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, রেশম গুটি উৎপাদন হয় ৮-১০ হাজার কেজি। সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলার অনেক কৃষক আছেন, যারা বছরে রেশম গুটি বিক্রি করে  ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা আয় করেন।

আঞ্চলিক রেশম সম্প্রসারণ কার্যালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রংপুরের উপপরিচালক মো. মাহবুব-উল হক জানান, রেশম চাষ বৃদ্ধিতে দুটি প্রকল্প কাজ করছে। এর মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি রেশম চাষের মাধ্যমে বৃহত্তর রংপুর জেলার দারিদ্র্য হ্রাসকরণ শীর্ষক প্রকল্প শুরু হয়েছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। এতে সুফল ভোগ করছে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার। রেশম চাষের আওতায় এসেছে ৫০০ বিঘা জমি। আবার তিন বছর মেয়াদি বাংলাদেশ রেশম শিল্পের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা ফেজ-২ শুরু হয়েছে চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২)। এর মাধ্যমে রেশম চাষের আওতায় এসেছে ৩৫০ বিঘা জমি।

এ কর্মকর্তা বলেন, রেশম চাষ বৃদ্ধির জন্য ৬ লাখ ৪ হাজার তুঁত চারা বিতরণ করা হয়েছে। নতুন ১১৭ জন চাষীকে এক বিঘা করে জমিতে তুঁত গাছ আবাদের মাধ্যমে রেশম চাষের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। গড়ে তোলা হচ্ছে আইডিয়াল রেশম পল্লী, রেশম ব্লক। এছাড়া আগ্রহী চাষীদের দেয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণ।

রেশমচাষীদের সব উপকরণ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, দক্ষ চাষীদের রেশম চাষের জন্য ঘর তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। তাদের উৎপাদিত গুটি মানভেদে কেজিপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা দরে কিনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে।

তবে লোকবল সংকটের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিশ্রম বেড়ে গেছে বলে জানান মো. মাহবুব-উল হক। তিনি বলেন, তার কার্যালয়ে ১৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন চারজন। এছাড়া সাত কেন্দ্রের কাজ করা হচ্ছে চারজনকে দিয়ে। ফার্মে ২০ জন থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন কেবল একজন। অবসর ও মৃত্যুজনিত কারণে এসব পদ শূন্য হলেও সেগুলো এখনো পূর্ণ করা হয়নি। কর্তৃপক্ষের কাছে লোকবল সংকটের বিষয়টি জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সমস্যার সমাধান হলে রেশম চাষের তদারকি আরো ভালোভাবে করা সম্ভব হবে।