রংপুর অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি (আগাম জাতের) আমন ধানের আবাদ বাড়ছে। মৌসুমের আগে ফলন পাওয়া ও বাজারের দাম বেশি পাওয়ায় কৃষকরা আগাম জাতের ধান আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। পাঁচ বছরে ধানের জমি বেড়েছে প্রায় ২৭ হাজার ৬৪ হেক্টর। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে (খরিপ-২ মৌসুমে) ৬৩ হাজার ১৯৭ হেক্টর আগাম ধানের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের (২০২০-২১) চেয়ে ১৪ হাজার ৪৩৯ হেক্টর বেশি। গত বছর দফায় দফায় বন্যার কারণে কোথাও কোথাও আগাম ধানের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ বছর আবহাওয়া অনুকূল থাকায় ধানের ফলন ভালো পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কৃষকরা।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে এ অঞ্চলের পাঁচ জেলায় স্বল্পমেয়াদি ধানের আবাদ বেড়েছে প্রায় ২৭ হাজার ৬৪ হেক্টর। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ধানের আবাদ হয়েছিল ৩৬ হাজার ১৩৩ হেক্টর। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আবাদ হয়েছে ৪০ হাজার ৯৪৩ হেক্টর। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আবাদ হয়েছে ৪৬ হাজার ১২১ হেক্টর। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আবাদ হয়েছে ৪৫ হাজার হেক্টর। ২০২০-২১ অর্থবছরে আবাদ হয়েছে মোট ৪৮ হাজার ৭৫৮ হেক্টর এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৩ হাজার ১৯৭ হেক্টর আগাম ধানের আবাদ হয়েছে।

জমিতে বীজ বপন থেকে ফলন পাওয়া পর্যন্ত আগাম জাতের ধানের সময় লাগে ১০০-১২০ দিন। আগাম ধানের জন্য মূলত জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলা তৈরি করতে হয়। বীজতলার বয়স ১৫-২৫ দিন অর্থাৎ চারার গড় বয়স ২০ দিন হলে জমিতে রোপণ করা হয়।

আমনের বেশকিছু হাইব্রিড ও উফশি জাত আগাম ধান হিসেবে কৃষকের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। উফশি জাতের মধ্যে আছে ব্রি ৩৩, ৩৯, ৫৬, ৫৭, ৬৬, ৬৯, ৭২, ৭৩, ৭৫ ও পূর্বাচী (স্থানীয় চায়না জাত), পারিজা, বিনা-১৬, ১৭, এছাড়া স্বর্ণার কিছু জাত। হাইব্রিড জাতের মধ্যে আছে বিএডিসির এসএল এইট এইচ, এসিআই, হিরা, ইস্পাহানি, ধানীগোল্ড, রূপসী বাংলা, সোনার বাংলা, জাগরণ, টিয়া, ময়না, আলোড়ন, সাথী, শক্তি, সম্পদ, ব্যাবিলন তিন পাতা অন্যতম।

নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলার পূর্ব দলিরাম গ্রামের কৃষক মো. কাওসার জানান, তিনি এ বছর ৩৩ শতক জমিতে স্বল্পমেয়াদি হাইব্রিড জাতের ধান আবাদ করেছেন। ফলন ১২ মণের বেশি আশা করলেও সময়মতো সেচ ও সার প্রয়োগ করতে না পারায় পেয়েছেন আট মণ। খরচ হয়েছে প্রায় ৩ হাজার টাকা। প্রতি মণ ধান বিক্রি করেছেন ৮০০ টাকা দরে। বর্তমানে বাজারে গবাদি পশুর খাবার হিসেবে খড়ের চাহিদা থাকায় ভালো দাম পেয়েছেন। বর্তমানে আগাম আলু চাষ করার জন্য জমি প্রস্তুত করেছেন। পরে আলু তুলে ভুট্টা আবাদ করবেন।

রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার চরগনাই এলাকার কৃষক মো. আনোয়ারুল ইসলাম জানান, দুই বিঘা (৩৩ শতকে এক বিঘা) জমিতে ব্রি-৭৫ জাতের উচ্চফলনশীল ধান আবাদ করেছেন। অল্প সময়ের মধ্যে ফসল ঘরে তুলবেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ৪০ মণ ধান আশা করছেন। এখন পর্যন্ত আবাদে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। অধিকাংশ কৃষকের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আগাম ধান আবাদ করলে ওই জমিতে পরে আগাম আলুসহ রবিশস্য করা সম্ভব হয়। ফলে ভালো দাম পাওয়া যায়। এছাড়া আশ্বিন-কার্তিক মাসে জমিতে তেমন ফসল না থাকায় অনেকের কাজ থাকে না। কিন্তু আগাম ধানের আবাদ বাড়ায় কৃষি শ্রমিকদের কাজে তেমন সমস্যা হচ্ছে না। রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলার মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আগাম ধানের কর্তন হয়েছে নীলফামারী জেলায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, চলতি মৌসুমে ১৩ হাজার ৮৯০ হেক্টরে স্বল্পমেয়াদি জাতের ধানের আবাদ হয়েছে। ১০ অক্টোবর পর্যন্ত কর্তনকৃত জমির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৬১৫ হেক্টর। কৃষকরা ধান কর্তন করেই অতি আগাম আলু এবং রবিশস্য রোপন শুরু করেছেন। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ায় কৃষকরা অধিক হারে আগাম ধান আবাদে মনোনিবেশ করেছেন। এবার বিঘাপ্রতি কৃষকরা ১৩-১৪ মণ ধান পাচ্ছেন বলে তিনি জানান।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল বলেন, কৃষকরা যে ফসলে লাভবান হন, সে ফসল আবাদে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গতবার কোথাও কোথাও বন্যার পানির জন্য আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কৃষকরা ভালো ফলন পাবেন। জেলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫০ হেক্টর জমির ধান কর্তন করা হয়েছে। আশা করা যায়, অল্পদিনের মধ্যে আগাম ধানের কর্তন সম্পন্ন হবে।

রংপুর অঞ্চলের অন্য তিন জেলা গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে আগাম ধানের আবাদ হয়েছে যথাক্রমে ৭ হাজার ৮০৭ হেক্টর, ৮ হাজার ১৫০ ও ৬ হাজার ৩২৮ হেক্টর। কর্তনকৃত জমির পরিমাণ হচ্ছে ২ হাজার ১৬৫ হেক্টর। এখন পর্যন্ত শুধু নীলফামারী ও রংপুর জেলায় আগাম জাতের ধান কর্তন করা হয়েছে।