চট্টগ্রামে নির্মিত মেগা প্রকল্পের কারণে এ অঞ্চলে প্রতি বছর বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন নতুন বিনিয়োগকারীরা। চট্টগ্রামের এসব মেগা প্রকল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে গত অর্থবছরে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ নিবন্ধন নিয়েছে ৫৯ প্রতিষ্ঠান। বছরের ব্যবধানে নিবন্ধনের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। তবে এ অঞ্চলে বিদেশী বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা মনে করা হলেও গত অর্থবছরে নিবন্ধন নিয়েছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিড-পরবর্তী বিশ্বব্যাপী মন্দা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং দেশের বাজারে ডলার সংকট, অর্থনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা কারণে স্বাভাবিক বিনিয়োগ বাড়লেও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহে কিছুটা ভাটা দেখা যাচ্ছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলমান মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ইজ অব ডুয়িং বিজনেস এবং বিভিন্ন লজিস্টিক সুবিধা দেয়া হলে বিনিয়োগ বাড়বে। এখানকার চলমান প্রকল্পগুলোয় নানামুখী সেবার বিকল্প ব্যবস্থা করলে বিনিয়োগ আরো বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু টানেল, মিরসরাই ইকোনমিক জোনসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কারণে চট্টগ্রামে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ছে। সৌদি আরব ও জাপানের মতো দেশ চট্টগ্রাম বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তাছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো উন্নত এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের মেগা প্রকল্পের সুফল পেতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে সরকারকে প্রস্তাব দেব। চট্টগ্রাম হলো দেশের ব্যবসায়িক কেন্দ্র। কীভাবে এখানে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ সহজে আনা যায়, এজন্য সরকার কাজ করছে।’

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের জন্য ৫৯টি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে নিবন্ধন করেছে। নিবন্ধিত এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৮৩ কোটি ২৮ লাখ ১৭ হাজার ৫০ টাকা। এসব প্রকল্পে সব মিলিয়ে কর্মসংস্থান ধরা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২৮৪ জন।

২০২১-২২ অর্থবছরে চট্টগ্রামে বিনিয়োগের নিবন্ধন নেয়া হয় ২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১২৪টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ২ হাজার ৪৯৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং কর্মসংস্থান ৮ হাজার ৮৪১ জনের। ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৮৭টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ৩ হাজার ২২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা। কভিড-পরবর্তী চট্টগ্রামে সমাপ্ত অর্থবছরে বিনিয়োগ বেড়েছে আড়াই গুণের বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ১৩৯ কোটি ৮৯ লাখ ৮৬ হাজার ৩০৫ টাকা বিনিয়োগ নিবন্ধন নিয়েছে ১৭টি প্রতিষ্ঠান এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ৮৯২ জনে, যা সমাপ্ত অর্থবছরের বিনিয়োগের প্রথম তিন মাসের তুলনায় তিন ভাগের একভাগ মাত্র।

বিনিয়োগ বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, মিরসরাইয়ে ইকোনমিক জোন, কক্সবাজারে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, টানেল উদ্বোধনের মাধ্যমে ওয়ান সিটি টু টাউন প্রকল্প গ্রহণসহ বিভিন্ন কারণে চট্টগ্রামের বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাছাড়া চট্টগ্রামে সমুদ্রবন্দর থাকায় ব্যবসায়ীরা তাদের আমদানি ও রফতানি সহজীকরণ করতে চট্টগ্রামকে বেছে নিচ্ছেন। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু টানেলের কারণে ব্যবসায়ীরা তাদের কারখানা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা শহরের দিকে স্থাপনের পরিকল্পনা করছেন। এছাড়া উত্তর চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোয়ও বিনিয়োগের আগ্রহ আছে বিনিয়োগকারীদের।

বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম নিবন্ধন নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সব থেকে বড় বিনিয়োগ করতে চায় দ্য পেনিনসুলা চিটাগং লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি কারখানা স্থাপনে সম্ভাব্য ৩ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। এ কারখানা স্থাপনে ৪৩৬ জনের নতুন করে কর্মসংস্থান হবে। এছাড়া এলপিন ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড কারখানা স্থাপনে ৮০০ কোটি টাকা, কনফিডেন্স সি রিসোর্সেস লিমিটেড ৩৩৫ কোটি, প্যাসিফিক রিসাইকেল ফাইবার লিমিটেড ৩৩০ কোটি, কৃষি ও মৎস্য খাতে সানাম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ৩২৬ কোটি, প্লাস্টিক খাতে স্মার্ট পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ১৩১ কোটি, হারবোরম্যান লিমিটেড প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার জন্য নিবন্ধন নিয়েছে।

বিনিয়োগ নিবন্ধন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রামের পরিচালক মোহাম্মদ মোয়াজ্জম হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকার ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করেছে। যেখানে এক ছাতার নিচে সব সেবা পাওয়ার কথা বিনিয়োগকারীদের কিন্তু বাস্তব অর্থে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে সব সুযোগ একসঙ্গে পাচ্ছেন না তারা। ওয়ান স্টপ সার্ভিসের সঙ্গে যে স্টেকহোল্ডার আছেন তারা একসঙ্গে আবেদনকারীকে সব সেবা দিতে পারছেন না। যারা বিনিয়োগ করছেন তারা ঢাকা ও চট্টগ্রাম দুই জায়গায় করছেন। এ কারণে চট্টগ্রামের সম্পূর্ণ চিত্র আমাদের কাছে নেই। আমরা সেগুলোকে সমন্বয় করছি।’