সিলেটের অন্যতম পর্যটন স্পট প্রকৃতি কন্যাখ্যাত জাফলং। পিয়াইন নদীতীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ পর্যটন কেন্দ্রটিকে করেছে আকর্ষণীয়। এসব দৃশ্যপট দেখতে প্রতিদিনই দেশী-বিদেশী পর্যটক ছুটে আসে এখানে। তবে পাহাড়ি নদীতে তীব্র স্রোত, চোরাবালি, নৌকাডুবি ও সাঁতার না জানার কারণে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে গেছে। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও এর দায় নিচ্ছে না কেউ। উল্টো পর্যটককেই দায়ী করে কর্তৃপক্ষ। ট্যুরিস্ট পুলিশ বলছে, পর্যাপ্ত জনবল নেই তাদের। চাইলেও পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা তারা দিতে পারছে না। 

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যটন কেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণে একক কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রের উন্নয়নসহ নানা দিক দেখাশোনা করে। তাদের নির্দেশ অনুযায়ী, সিলেটের পর্যটন কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করছে পর্যটন উন্নয়ন কমিটি, যার সভাপতির দায়িত্বে জেলা প্রশাসক। এ কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী, স্থানীয় প্রশাসন পর্যটকের নিরাপত্তায় বিভিন্ন পদেক্ষপ নিয়ে থাকে, যদিও তা অপ্রতুল। এমনকি পর্যটকরাও সেসব নির্দেশনা মানতে চায় না। গত কয়েক বছর ট্যুরিস্ট পুলিশ যুক্ত হওয়ায় মূলত তারাই পর্যটকের নিরাপত্তায় প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন থেকে পর্যটকের জন্য কিছু স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

পর্যটকদের অভিযোগ, জাফলংয়ের মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে প্রায় প্রতিদিনই কয়েক হাজার পর্যটক ঘুরতে আসে। কিন্তু কোন জায়গায় যাওয়া বিপজ্জনক এবং কোথায় সাঁতার কাটা উচিত নয়, এ বিষয়ে তেমন নির্দেশনা দেন না দায়িত্বরত ট্যুরিস্ট পুলিশ কিংবা স্বেচ্ছাসেবকরা। মাঝেমধ্যে মাইকিং এবং কয়েক জায়গায় সাইনবোর্ড টানিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়। 

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ঘেঁষা পর্যটন কেন্দ্র দুটি স্থানীয় পিয়াইন ও ধলাই নদীর সঙ্গে যুক্ত। গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তঘেঁষা পর্যটন কেন্দ্র জাফলংয়ে পাথর ও বালি উত্তোলনের ফলে অনেক স্থান মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে গত দুই দশকে জাফলংয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৫৯ পর্যটক। বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকা ঘেঁটে এ তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা সাদা পাথর পর্যটন কেন্দ্রটি যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা দৃশ্যপট। ভোলাগঞ্জের ধলাই নদীর পাড়ে এ পর্যটন কেন্দ্রটি পাঁচ-ছয় বছর আগে পরিচিতি পায়। এরপর বাড়তে থাকে পর্যটকের সংখ্যা। এর মধ্যেই সেখানে নিহত হয়েছে ১১ পর্যটক। এছাড়া জেলার আরেক জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র বিছানাকান্দিতে মৃত্যু হয়েছে চারজনের। এদের মধ্যে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষার্থীই বেশি। অধিকাংশই সিলেটের বাইরের পর্যটক। সর্বশেষ ১ জুলাই সাদা পাথরে সালাম নামে এক যুবক এবং ৬ জুলাই জাফলংয়ে জাওয়াজ আল আরশ নামে এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়। এছাড়া ১০ জুলাই সাদা পাথরে একজন পাথর শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। 

স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে সতর্কতাসংবলিত সাইনবোর্ড, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, লাইফ জ্যাকেট প্রদানের পাশাপাশি ট্যুরিস্ট ও থানা পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও মৃত্যু রোধ করা যাচ্ছে না। পর্যটকের নিরাপত্তায় গাইডলাইন না থাকা এবং তাদের ঠিকমতো সচেতন না করায় এ ধরনের দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের সভাপতি আবদুল হাই আল হাদি মনে করেন, যারা ঘুরতে আসে তারা চোরাবালি কিংবা নদীর গভীরতা সম্পর্কে তেমন জানে না। ফলে তারা মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ে। তাই পর্যটকের মৃত্যুরোধে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সচেতনতা। পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ ও গাইডলাইন প্রণয়নের মাধ্যমে এ অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুরোধ সম্ভব। 

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যাতে কেউ গোসল করতে না নামে, তা নিয়ে সতর্কতাসংবলিত সাইনবোর্ড টানিয়ে রাখা হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ পর্যটকদের অবগতির জন্য হ্যান্ডমাইক দিয়ে সার্বক্ষণিক প্রচার চালায়। কিন্তু অনেকেই তাতে কর্ণপাত করে না, যার কারণে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।’ 

সিলেট জেলা উন্নয়ন পর্যটন কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মজিবর রহমান জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তাসহ তারা সাধ্যমতো সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে। অনেক পর্যটক নির্দেশনা না মানার কারণে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পানিতে নামার আগে সতর্ক থাকা দরকার। সাঁতার না জানলে তো আরো বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’