মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় খরস্রোত বইছে। এর প্রভাবে বেড়েছে ভাঙনের তীব্রতা। এরই মধ্যে জেলায় নদী দুটির প্রতিরক্ষা বাঁধের ১৯ স্থানে বিশাল এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গেল জুলাইয়ের বন্যার পর এসব স্থান অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দুই মাস আগে এগুলোর ভাঙন প্রতিরোধে সংস্কারকাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে কাজে ধীরগতি থাকায় তা এখনো শেষ হয়নি। ফলে পানি আরো বাড়লে আবারো প্লাবনের আশঙ্কা করছে নদীপাড়ের মানুষ। তারা এর সমাধানের দাবি জানিয়েছে। দ্রুত বাঁধ মেরামতের জন্য এরই মধ্যে তারা মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন।

কমলগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ধলাই নদে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের লংতরাই পাহাড় থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। খরস্রোতা এ নদীর ভাঙনে প্রায় প্রতি বছর বন্যায় প্লাবিত হয় কমলগঞ্জসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে কৃষকরা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সময়মতো প্রতিরক্ষা বাঁধ সংস্কার না হওয়ায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েন তারা।

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, কমলগঞ্জের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ধলাই নদের অন্তত ২০ স্থান ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে কমলগঞ্জ পৌর এলাকার আলেপুর, বড়গাছ ও রাজারগাঁও; মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সুরানন্দপুর, করিমপুর, ধাঁতাইলগাঁও ও খুশালপুর; ইসলামপুর ইউনিয়নের মোকাবিল ও কালারায়বিল; আদমপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ তিলকপুর, উত্তর ঘোড়ামারা ও রানীরবাজার এবং মাধবপুর ইউনিয়নের কাটাবিল, শুকুর উল্যাহ গাঁও ও ধলাইরপাড় এলাকাগুলো অন্যতম। সাম্প্রতিক বন্যায় মোকাবিল ও কালারায়বিলসহ কয়েকটি অতিঝুঁকিপূর্ণ স্থান ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এদিকে মনু নদের রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের দুটি স্থানে ভাঙন দিয়ে বিস্তৃত এলাকা প্লাবিত হয়। এতে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে যায়। এ বন্যায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় পাউবো ভাঙনকবলিত স্থানগুলো সংস্কারে কাজ শুরু করে। কিন্তু ধীরগতির কারণে কাজ এখনো শেষ হয়নি।

কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ভাণ্ডারিগাঁওসহ কয়েকটি স্থানে সরজমিনে দেখা যায়, ধলাই নদের পানি বৃদ্ধির সঙ্গে বাঁধে ভাঙন ও ভূমিধস অব্যাহত রয়েছে। কিছু স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভাঙতে ভাঙতে দুই-চার ফুট জায়গা অবশিষ্ট রয়েছে। বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, কয়েক দশক ধরে এ এলাকায় নদীভাঙন চলছে। মুন্সিবাজার ইউনিয়নের বাঁধ ভেঙে করিমপুর নামে একটি গ্রাম প্রায় নদীতে চলে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো দ্রুত সংস্কার করা না হলে এবারো অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হবে বলে আশঙ্কা তাদের।

মাধবপুর ইউনিয়নের হীরামতি গ্রামের বাসিন্দা প্রতিমা রাণী দাস বলেন, ‘আমাদের বাড়ি থেকে ধলাই অনেক দূরে ছিল। ভাঙতে ভাঙতে নদী এখন ঘরের কাছে চলে এসেছে। পানি বাড়লে আতঙ্কে থাকি। দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।’

একই এলাকার বাসিন্দা আরমান মিয়া বলেন, ‘আমরা সব হারিয়ে এখন সহায়-সম্বলহীন। আপৎকালীন ব্যবস্থা না নিয়ে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। সেজন্য আগে নদীভাঙন ঠেকাতে হবে।’ তিনি অভিযোগ করেন, শুকনো মৌসুমে সংশ্লিষ্টরা বাঁধের খোঁজ রাখেন না। ভেঙে গেলে পরিদর্শনে আসেন।

মুন্সিবাজার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাহিদ আহমদ তরফদার বলেন, ‘ধলাই নদের ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি স্থানে পাউবো মেরামত করলেও নতুন করে আরো কিছু জায়গা ঝুকিঁপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেসব জায়গায় বাঁধের অংশটুকু কোনোভাবে টিকে আছে। পানি বাড়লেই মুন্সিবাজার ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হবে।’ তিনি শুধু বাঁধ মেরামত নয়, নদী খননের দাবি জানান।

মৌলভীবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ বিন ওয়ালিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত জুলাইয়ের বন্যায় কমলগঞ্জে ধলাই নদের ১৪টি ও রাজনগর উপজেলায় মনু নদের পাঁচটি স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারত থেকে নেমে আসা ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ধলাই নদে পলি জমে ভরাট হওয়ায় নাব্যতা হারিয়েছে। তাই অল্প বৃষ্টিতেই বন্যার আশঙ্কা দেখা দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো সংস্কারে কাজ শুরু হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ধলাই নদের বন্যার স্থায়ী সমাধানে বড় প্রকল্প দরকার। এরই মধ্যে হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আর মনু নদের চলমান হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ ৬০ ভাগের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।’