স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমদানি-রফতানি মিলিয়ে দেশের মোট বাণিজ্য ছিল যৎসামান্য। ১৯৭৯-৮০ অর্থবছরে দেশে মোট বাণিজ্য হয়েছিল ৩১০ কোটি ডলারের। সেখানে গত অর্থবছরের ১১ মাসে পণ্য বাণিজ্য হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি ডলারের। এ বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই হয় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে। সে হিসেবে শুধু ১১ মাসেই ১০ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বাণিজ্যভার বহন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরের জেটি এখন ১৯টি। এর কোনোটির বয়স ৫০ বছর পেরিয়েছে। ৭০ বছরেরও বেশি সময়ের পুরনো জেটিও রয়েছে। পুরনো এসব জেটি দিয়ে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য ভার বহন করতে গিয়ে বন্দরের অকুপেন্সি রেট ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

কোনো বন্দরের জেটিগুলোর সক্ষমতা পরিমাপ করা হয় জেটি বা বার্থ অকুপেন্সি রেট দিয়ে। বন্দরে জেটিগুলোর মোট ব্যবহারযোগ্য সময়ের অনুপাতে কতটুকু জাহাজের বার্থিংয়ের কাজে ব্যবহার হয়, সেটিকেই বার্থ অকুপেন্সি রেট বলা হয়। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো বন্দরে বার্থ অকুপেন্সি রেট ৭০ শতাংশের বেশি হলে সেখানে আগত জাহাজের ভিড় জমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এক্ষেত্রে ধরে নিতে হয় বন্দরটির জেটির সক্ষমতা আগত জাহাজের সংখ্যার তুলনায় কম বা বন্দরটিতে জাহাজের বার্থিং সেবার মান যথাযথ নয়। আবার অকুপেন্সি রেট ৫০ শতাংশের নিচে হলে বন্দরটির সক্ষমতা অব্যবহূত থেকে যাচ্ছে বলে ধরে নিতে হয়। সেক্ষেত্রে আদর্শ বার্থিং অকুপেন্সি রেট হলো ৬০ শতাংশ।

দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দরে গতকাল বার্থ অকুপেন্সি রেট ছিল ৮০ শতাংশের বেশি। বন্দরটিতে বার্থ অকুপেন্সির এ হার কমবেশি বজায় থাকছে প্রতিনিয়তই। এ হার সামনের দিনগুলোয় আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন দেশের বাণিজ্য খাতসংশ্লিষ্টরা।

তাদের ভাষ্যমতে, প্রতি বছরই বন্দরটি দিয়ে আমদানি-রফতানি বাড়ছে গড়ে ১২-১৫ শতাংশ। জাহাজের আগমন প্রতিনিয়ত বেড়ে চললেও এর সঙ্গে সংগতি রেখে বাড়ছে না বন্দরটির অবকাঠামোগত সক্ষমতা। বন্দরের ১৯টি জেটির মধ্যে কোনোটির বয়স ৫০ বছর পেরিয়েছে। রয়েছে ৭০ বছরের বেশি পুরনো জেটিও। সামনের দিনগুলোয় এসব জেটি দিয়ে বর্ধিত জাহাজের ভিড় সামাল দেয়া যাবে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

বন্দরের জেটি বা বার্থের কাঠামোগত অবস্থা খুবই নাজুক বলে জানিয়েছেন আমদানি-রফতানিসংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি বা বার্থের কাঠামোগত অবস্থা খুবই নাজুক। এসব জেটি দিয়ে পণ্য খালাসে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ হয়। বন্দরটিতে প্রয়োজনীয় নাব্যতার অভাবে বড় জাহাজ ভিড়তে না পারায় এমনিতেই অনেক সময়ক্ষেপণ হয়। বড় জাহাজ থেকে তুলনামূলক ছোট বা ফিডার ভেসেলে করে পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে প্রচুর সময় চলে যায়। এর মধ্যেই জেটি বা বার্থের অকুপেন্সি রেট বেশি হওয়ায় ফিডার ভেসেলকে বহির্নোঙরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বন্দরের সক্ষমতার এ ঘাটতির মাশুল গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের। একদিকে পণ্য হাতে পেতে দেরি হয়, আবার অতিরিক্ত সময়ের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।

যদিও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে বন্দর থেকে পণ্যের লোডিং-আনলোডিং কার্যক্রমে অস্বাভাবিকভাবে কোনো সময়ক্ষেপণ হচ্ছে না। বহির্নোঙরেও জাহাজকে খুব একটা অপেক্ষা করতে হচ্ছে না।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, বন্দর থেকে পণ্যের লোডিং-আনলোডিং কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলছে। বহির্নোঙরে জাহাজকে খুব একটা অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের কার্যক্রমও খুব দ্রুত শুরু হতে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের জন্য গত অর্থবছরেও চার হাজারের বেশি জাহাজ এসেছে। বন্দরের প্রধান ১৯টি জেটিতে ভিড়তে পারে সীমিতসংখ্যক জাহাজ। অনেক জাহাজকে নোঙর করতে হয় বহির্নোঙরে। এর মধ্যে তুলনামূলক বড় জাহাজগুলোকে কুতুবদিয়া বা বহির্নোঙরে এসে অপেক্ষায় থাকতে হয়। এর চেয়েও বড় জাহাজগুলো কুতুবদিয়ায় আসার পর লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে কিছু পণ্য খালাস করে সেটিকে হালকা করার পর বন্দর সীমানায় আসার অনুমতি মেলে। এর মধ্যে অকুপেন্সি রেট বেশি হওয়ায় বন্দরটিতে সময়ক্ষেপণের মাত্রাও বেড়ে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় বুয়েটের অধ্যাপকসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা নতুন জেটি নির্মাণের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। আবার কয়েক দশকের পুরনো জেটিগুলোর অবস্থাও এখন এতটাই নাজুক, সেগুলোও ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

একই দাবি তুলছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের বক্তব্য হলো বন্দরের সক্ষমতার এ দুরবস্থার কারণে মাশুল গুনতে হচ্ছে প্রধানত ব্যবসায়ীদের। বন্দরে জেটির সংখ্যা না বাড়ালে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি সামনের দিনগুলোয় আরো বাড়বে।

চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মাহবুবুল আলম এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু বার্থ অকুপেন্সি রেট সহনীয় পর্যায়ে রাখতে জেটি বাড়ানো প্রয়োজন। আগে ছিল ১৩টি। এরপর একসময় পাঁচটিতে নেমে গিয়েছিল। বর্তমানে আছে ১৯টি। আমাদের অনেক দিন আগের প্রস্তাব ছিল জেটি বাড়িয়ে ৬০টি করতে হবে। একবারে নয়, প্রতি বছর একটি বা দুটি করে জেটির সংখ্যা বাড়ানো যেত। এভাবে পর্যায়ক্রমে হলেও পর্যাপ্তসংখ্যক জেটি নির্মাণ করা গেলে অকুপেন্সি রেট ৬০ শতাংশে নিয়ে আসা সম্ভব হতো। বন্দরসংলগ্ন জায়গার অভাব নেই। বেদখল হওয়া অনেক জায়গা আছে। সেগুলোর দখল ফিরিয়ে নিয়েও জেটি নির্মাণকাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব। কিন্তু এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ার মাশুল ব্যবসায়ীদের গুনতে হচ্ছে। বার্থ অকুপেন্সি হার বেশি হওয়ার কারণে যে ক্ষতিপূরণ, তা ব্যবসায়ীকেই দিতে হচ্ছে।

একই কথা বলছেন ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরীও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বার্থ অকুপেন্সি রেট বেশি হলে তা আমদানিকারকদের বেকায়দায় ফেলে দেয়। এক্ষেত্রে কাঁচামালের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ ঠিক রাখা যায় না। অন্যদিকে ব্যাংকঋণের সুদ বাড়তে থাকে। আমদানিকারকের পণ্য পাওয়ার অপেক্ষা যদি দীর্ঘ হতে থাকে, তাহলে জাহাজের ভাড়াও বেড়ে যায়। শিপিং কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করে। ব্যবসায়ীদের পর এর খেসারত দিতে হয় ভোক্তাশ্রেণীকে।

দেশের মোট বাণিজ্যের বড় অংশই হয় তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। এ বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা রফতানির পাশাপাশি পণ্যের কাঁচামালের জোগান নিশ্চিতে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানিও করেন। তারা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বাড়লেও তা পর্যাপ্তও নয় আবার দেশের বাণিজ্য সম্ভাবনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

জানতে চাইলে বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি ও ওয়েল গ্রুপের পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, পোশাক খাতকে সবসময় লিড টাইম বা নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলতে হয়। রফতানি পণ্যের কাঁচামাল আমদানির চালান আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা তা দ্রুত কারখানায় নিয়ে যেতে চাই। কিন্তু বন্দর থেকে পণ্য খালাস করাসহ অনেক ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়ে লিড টাইম থেকে পিছিয়ে পড়ি। বন্দরে আধুনিক উপকরণ ও জেটির সমস্যা আছে। পণ্য খালাস, লোড-আনলোড করতে সময় ব্যয় হয় বেশি। এ সক্ষমতাগুলো আগের চেয়ে বেড়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশের সম্ভাবনার তুলনায় সক্ষমতা বাড়ছে না। যে কারণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক মানের বন্দর গড়ে তুলতে আরো বেশি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমান অগ্রগতিতে পূর্ণ সন্তুষ্টির সুযোগ কম। ৬৭ বিলিয়ন ডলারের যে রফতানি লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তা বহন করার সক্ষমতা চট্টগ্রাম বন্দরের আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের বন্দর হতে গেলে অকুপেন্সি রেট কমিয়ে আনতে হবে, যেটা এই মুহূর্তে সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে আরো কাজ করতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও স্বীকার করছে, এখানে বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প পথ খোলা নেই। বর্তমানে বন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান আছে। যদিও বর্তমানে কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের যে অগ্রগতি, তাতে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়ার অপেক্ষা শুধু দীর্ঘ হওয়ারই ইঙ্গিত মেলে।

জানা গেছে, সমুদ্রপথে ভবিষ্যৎ বৈদেশিক বাণিজ্যের চাপ সামাল দিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্মাণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি), মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প ও বে টার্মিনাল প্রকল্প। এর মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও সক্ষমতা বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি চালু হলে খুব অল্প সময়ের জন্যই হ্যান্ডলিং চাপ সামাল দেয়া যাবে। অন্যদিকে মাতারবাড়ী বন্দর থেকে পণ্য খালাসের সুবিধা পেতে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের অপেক্ষা করতে হবে কমপক্ষে আরো চার বছর। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিকল্পনাধীন অন্য প্রকল্পটি হলো বে টার্মিনাল। বন্দরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত প্রকল্পটি নৌ মন্ত্রণালয়ের নির্মাণ অনুমতি পাওয়ার আট বছর পার হয়েছে। যদিও এখনো কমন ইউজ ফ্যাসিলিটিজই নিশ্চিত করা যায়নি। এসব কারণে জেটির অপ্রতুলতা প্রয়োজনের সময় চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম চালানোর পথে বিরাট প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দেবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বাণিজ্যভার সামাল দেয়ার সক্ষমতায় অনেক উন্নয়নের সুযোগ আছে। এর পাশাপাশি নানা প্রতিবন্ধকতা আছে। এগুলো দূর করতে হবে। তাহলে আমাদের সক্ষমতা কিছুটা বাড়বে। বন্দরে পণ্য পরিবহন নিয়ে নানামুখী বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হতে হয় আমদানি-রফতানিকারকদের। অনেক জটিলতা আছে আমাদের, যেগুলো থেকে মুক্ত হতে হবে। সক্ষমতা বৃদ্ধির যে উদ্যোগগুলো নেয়া হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য যেসব লজিস্টিকস লাগবে, সাপ্লাই চেইন লাগবে, সেগুলোকে ঠিক করতে হবে। এগুলো সবই একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত।