১৯৯৭ সালে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের পাশে স্থাপন করা হয় রংপুর মৎস্য আড়ত। বর্তমানে এ আড়তে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। রয়েছেন ৩৭ জন আড়তদার। যদিও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগে এ আড়তে দৈনিক দেড় কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হতো। প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ২৪ বছরেও পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় প্রতিনিয়ত কাদা-পানি মাড়িয়ে মাছ বেচাকেনা করছেন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় গোটা আড়ত। এছাড়া সুষ্ঠু ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় শুষ্ক মৌসুমেও আড়তজুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এ অবস্থায় চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে আড়তটি ব্যক্তি উদ্যোগে স্থাপন করা হলেও পরিচালনা করছে সিটি করপোরেশন। প্রত্যেক বছর এ আড়ত থেকে সাড়ে ২৫ লাখ টাকা টোল আদায় করে রংপুর সিটি করপোরেশন। ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের কাছ থেকে নিয়মিত টোল আদায় হলেও সংস্কারকাজ না করায় ক্ষোভ জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।
মৎস্য আড়ত সূত্রে জানা গেছে, গত মার্চে দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর প্রথম আড়তের ব্যবসায় ভাটা দেখা দেয়। মার্চের আগে এ আড়তে দেশী এবং সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হতো প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ টাকার। মহামারীর কারণে তা নেমে আসে ২৫ লাখ টাকায়। তবে গত ডিসেম্বর থেকে পুনরায় চাঙ্গা হতে শুরু করে আড়তে ব্যবসা।
বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ টাকার মাছ কেনাবেচা হচ্ছে। রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা এ আড়ত থেকে মাছ কিনে নিয়ে যান। তাছাড়া স্থানীয়রাও এ আড়ত থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ কেনেন।
ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা পাইকার মোসলেম উদ্দিন বলেন, গত বছর থেকে আমি নিয়মিত এ আড়তে আসি। কিন্তু করোনা মহামারীর পর দীর্ঘদিন অন্য ব্যবসা করেছি। বর্তমানে আবার নিয়মিত আড়ত থেকে মাছ কিনে এলাকায় বিক্রি শুরু করেছি।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনও সংস্কার না করায় কাদা-পানি মাড়িয়ে আমাদের মাছ কিনতে হচ্ছে। অথচ আড়তে প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়। আদায় করা হয় নিয়মিত টোল। তার পরও সংস্কার না হওয়া দুঃখজনক। এছাড়া গণশৌচাগার না থাকায় ভোগান্তি আরো বেড়েছে।
দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার পাইকার মিন্টু দাস বলেন, বাবার দেখা পথ ধরে ২০০৭ সাল থেকে নিয়মিত এ আড়তে আসি। কিন্তু করোনা অতিমারীর কারণে অনেক দিন এখানে আসা হয়নি। তবে দেড় মাস হচ্ছে আবার নিয়মিত আসছি।
সরেজমিনে মৎস্য আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, পাইকার ও আড়তদারদের সরব উপস্থিতি। পাঁচ মাস আগেও এমনটি দেখা যায়নি। কিন্তু পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় কাদা-পানি ডিঙিয়ে চলছে মাছের কেনাবেচা। এদিকে বন্যায় কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যায় পুরো আড়ত এলাকা।
মৎস্য আড়তে আড়তদার আছেন ৩৭ জন। অধিকাংশ আড়তদার বৈশ্বিক মহামারীতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ সময় কথা হয় শাহ আমানত মৎস্য আড়তের মালিক ও মৎস্য আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাসুদ রানার সঙ্গে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক মহামারীর কারণে প্রায় ১০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু সরকারি প্রণোদনা তো দূরের কথা কোনো অনুদানও পাইনি।
বন্ধু মৎস্য আড়তের মালিক মো. আশরাফুল আলম বলেন, করোনাকালে সব আড়তদার কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অথচ সরকার ঘোষিত প্রণোদনা আমরা পাইনি।
তিনি আরো বলেন, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে আড়তের কেনাবেচা বেড়েছে। কিন্তু আড়তে আজো অবকাঠামো নির্মাণ না হওয়ায় এবং পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় মাছ কিনতে আসা পাইকাররা সমসময় বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন। অথচ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ নিয়মিত টোল আদায় করছে।
রংপুর মৎস্য আড়তের ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলন, এ বছর টোল বাবদ সিটি করপোরেশনকে সাড়ে ২৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। অথচ কোনো সংস্কারকাজই করা হয় না। বিভিন্ন সময় মেয়র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি।
এ বিষয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র মো. মাহমুদুর রহমান টিটু বলেন, মৎস্য আড়তটির আধুনিকায়নের পরিকল্পনা সিটি করপোরেশনের আছে। সংস্কারের অভাবে প্রতিনিয়ত পাইকার এবং আড়তদারদের বিভিন্ন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। ক্রেতা-বিক্রেতার ভোগান্তি নিরসনে আমরা দ্রুতই আড়তটি সংস্কারে উদ্যোগ নেব।










