আইনের খসড়ায় না থাকলেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। ফলে যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সে উদ্দেশ্যকেই পাল্টে দেয়া হয়েছে।
গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘সংশোধিত ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬: আবারো ঝুঁকির মুখে ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা?’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে নাগরিক প্লাটফর্ম ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’।
আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘ব্যাংক খাত সংস্কারে নানা কথা হচ্ছে। কিন্তু যাদের জন্য আজকের দুরবস্থা তৈরি হয়েছে, তাদের শাস্তির ব্যাপারে কেউ কোনো কথা বলছে না। অপরাধীদের পার পাইয়ে দেয়ার জন্যই আইনে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি টাকায় বেসরকারি ব্যাংককে বেইল আউট করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। যাদের জন্য সমস্যা তৈরি হয়েছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় না আনলে এ সমস্যা কখনো সমাধান হবে না। বরং তা এ ধরনের অপরাধের জন্য আরো নতুন পথ খুলে দেবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ছাড়া কখনো ব্যাংক খাতের পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না।’
আলোচনা সভায় অনলাইনে যুক্ত ছিলেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (সোয়াস) অধ্যাপক ড. মুশতাক খান। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কোনো সাধারণ সংকট নয়। সুপরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক সহযোগিতায় রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ব্যাংক দখল ও দুর্বৃত্তায়ন ঘটানো হয়েছে। এ অসাধারণ সংকটের জন্য অসাধারণ সমাধান বের করতে হবে। শুধু সামগ্রিক আইনি প্রক্রিয়ায় এ ধরনের রাষ্ট্রীয় দখলের সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। এজন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে উদ্দেশ করে আইন তৈরি করতে হবে। অন্যথায় তাদের থেকে টাকা বের করে আনা কখনো সম্ভব হবে না।’
অর্থ পাচারকারীদের দেশে থাকা বাকি সম্পদ জব্দ করে জাতীয়করণ করারও দাবি করেছেন এ অধ্যাপক।
নতুন সংশোধনীর কারণে ব্যাংক খাতের লুণ্ঠনকারীদের পুনরায় ফিরতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না বলে মনে করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ডিন ড. ওয়ারেসুল করিম। তিনি বলেন, ‘যাদের ব্যাংক থেকে ঋণ কিংবা একটি ক্রেডিট কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা নেই, তারাই আবার ব্যাংকের পর্ষদে ফিরছে। সরকার অত্যন্ত নির্লজ্জ ও নিম্ন চতুরতায় আইনে ১৮ (ক) ধারা যুক্ত করেছে। এর ফলে এ আইন প্রণয়নের পুরো উদ্দেশ্যই পাল্টে গেছে। এ আইন ব্যবহার করে এস আলম ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারো ব্যাংক দখল করে দেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।’
পদ্ধতিগত সংস্কার ছাড়া শুধু কিছু আইনকানুন করে দেশের আর্থিক খাতের চিত্র বদলানো যাবে না বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাত থেকে যারা অর্থ লোপাট করেছে, তাদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া দরকার। অন্যথায় চুরির এ পথ কখনো বন্ধ হবে না। এজন্য পদ্ধতিগত সংস্কার করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।’ এছাড়া পুরো আর্থিক ব্যবস্থা নগদবিহীন করা হলেও এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই কমে আসবে বলে দাবি করেন তিনি।
ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ থাই চেম্বারের সভাপতি শামস মাহমুদ, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা পেশাদারদের আন্তর্জাতিক সংস্থা সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশের সভাপতি আসিফ খান, আলোচনা সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার ও দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন প্রমুখ।










