আলু উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ আর এশিয়ায় তৃতীয়। দেশের প্রধান খাদ্যপণ্যের মধ্যে আলু একমাত্র উদ্বৃত্ত ফসল। এছাড়া চাল, গম, তেল, ডাল ও ভুট্টাসহ প্রায় সব খাদ্যশস্যই কম-বেশি আমদানি করতে হয়। দেশে চাহিদার চেয়ে বছরে প্রায় ২০-২৫ লাখ টন আলু বেশি উৎপাদন হয়। তবে রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে পেছনের দিকে। রফতানিকারকরা বলছেন, বেশি উৎপাদন হলেও ভালো জাতের অভাব এবং উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে টিকতে পারছে না বাংলাদেশ।
দেশে আলুর অভ্যন্তরীণ চাহিদা ৭৫-৮০ লাখ টন। এর বিপরীতে চলতি অর্থবছরে (২ এপ্রিল পর্যন্ত) উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ ২৪ হাজার ৭০০ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ৪ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেয়া হয়। এরই মধ্যে ৪ লাখ ৫১ হাজার হেক্টর জমির আলু কর্তন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৪ লাখ ৩১ হাজার টন উচ্চফলনশীল (উফশী) আলু উৎপাদন হয়েছে। গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ২৫ দশমিক ৭৭ টন। আর ৪৬ হাজার হেক্টর জমিতে স্থানীয় আলুর ফলন হয়েছে ৬ লাখ ৯৩ হাজার টন। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১৫ দশমিক শূন্য ৫ টন।
২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ১১ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩৫ টন আলু উৎপাদন হয়েছিল। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে ৯৮ লাখ ৮৭ হাজার ২৪২ টন আলু উৎপাদন হয়। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬১ হাজার ৩১৭ হেক্টর জমিতে ৯৬ লাখ ৫ হাজার ৬২৪ টন আলু উৎপাদন হয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বশেষ ২০২১ সালের উৎপাদন পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, আলু উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে চীন। দেশটিতে ৯ কোটি ৪৩ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়। এছাড়া ভারত ৫ কোটি ৪২ লাখ ৩০ হাজার টন ও ইউক্রেন ২ কোটি ১৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩২০ টন উৎপাদন করে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮২ হাজার ৩৭০ টন, রাশিয়া ১ কোটি ৮২ লাখ ৯৫ হাজার ৫৩৫ টন ও জার্মানি ১ কোটি ১৩ লাখ ১২ হাজার ১০০ টন আলু উৎপাদন করে। সপ্তম অবস্থানে বাংলাদেশ এবং ফ্রান্স, পোল্যান্ড ও মিসর উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বে অষ্টম, নবম ও দশম অবস্থানে রয়েছে।
আলু উৎপাদনে শীর্ষ দশে অবস্থান করলেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে রফতানির দিক থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারছে না বাংলাদেশ। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ১৩ হাজার টন আলু রফতানি হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭৮ হাজার ৯১০ টন আলু রফতানি হয়েছিল। এর আগের অর্থবছর রফতানি হয় মাত্র ৬৮ হাজার ৭৭৩ টন।
এদিকে পাকিস্তানের উৎপাদন বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক। ৫৮ লাখ ৭২ হাজার ৯৬০ টন আলু উৎপাদন করে দেশটি। তবে রফতানিতে দেশটি বিশ্বে দশম অবস্থানে রয়েছে। দি অবজারভেটরি অব ইকোনমিকস কমপ্লেক্সিটির (ওইসি) তথ্য অনুযায়ী, আলু রফতানিতে শীর্ষে রয়েছে নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মিসর। দেশগুলো যথাক্রমে বিশ্বের মোট রফতানির ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ, ১৪ দশমিক ৮, ১০, ৬ দশমিক ২৯, ৫ দশমিক ৮৯ ও ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ রফতানি করে। এছাড়া এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীন ৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ, পাকিস্তান ৩ দশমিক শূন্য ৬, ভারত ২ দশমিক ৪৬, ইসরায়েল ১ দশমিক ৯৯, সাইপ্রাস ১ দশমিক ৩২, ইরান ১ দশমিক ১৮ ও তুরস্ক ১ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ রফতানি করে।
অন্যদিকে রফতানির দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে মোট রফতানি হওয়া আলুর মাত্র দশমিক ৩১ শতাংশ রফতানি করতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের আলু রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার মালয়েশিয়া। প্রায় ৫২ শতাংশই এ দেশে রফতানি হচ্ছে। এছাড়া শ্রীলংকা, নেপাল, সিঙ্গাপুর ও আরব আমিরাতেও রফতানি হয়।
সম্প্রতি আলু রফতানির জন্য রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। এর আগে ক্ষতিকর ব্রাউনরট রোগের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় ২০১৫ সালের ৬ মে থেকে আলু রফতানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাশিয়া। দেশটির নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রফতানির পরিমাণ ৯১ হাজার টন থেকে ৪০ হাজার টনে নেমে আসে। পরে আলুকে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ও নিরাপদ করতে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করায় ২০২২ সালের মার্চে রাশিয়া এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়।
রফতানিকারকরা জানিয়েছেন, দেশে প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি উৎপাদন হলেও ভালো জাতের অভাব ও উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে টিকতে পারছে না বাংলাদেশ। উৎপাদন পর্যায়ে প্রায় ১৪ শতাংশ আলু নষ্ট হচ্ছে। ফলে নতুন জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও রফতানি উপযোগী আলু উৎপাদনে সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশ পটেটো এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ড. শেখ আব্দুল কাদের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রফতানির ক্ষেত্রে ভালো জাত এবং উৎপাদন খরচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাকিস্তান আমাদের তুলনায় মাত্র ৪০ শতাংশ আলু উৎপাদন করে। কিন্তু তাদের রফতানি অনেক বেশি। রফতানির দিক থেকে তাদের অবস্থান বিশ্বে দশম। কারণ তাদের আলুর জাত ভালো। এজন্য আমরা রফতানি বাড়ানোর জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে উন্নতমানের ২০টি জাত নিয়ে এসেছি। তিন বছর ধরে আমরা এসব জাত নিয়ে গবেষণা করেছি। সেগুলো বিএডিসির কাছে আমরা দিয়েছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আলু রফতানিতে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। কিন্তু গত ২০ বছর জাতের ক্ষেত্রে যে সীমাবদ্ধতা ছিল তা রয়েই গেছে। আমরা শুধু রফতানির জন্য এসব জাত আনিনি। বিশ্বের সেগমেন্টাল ডিমান্ডের কথা বিবেচনায় রেখে আমরা কাজ করছি। উৎপাদন খরচের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ইউরোপের দেশের চেয়েও এগিয়ে। নতুন যে জাতগুলো আমরা নিয়ে এসেছি সেগুলো দ্রুত প্রমোট হওয়া দরকার। এসব জাতে উৎপাদন খরচ অনেক কমে যাবে। ৬৫-৭০ দিনের মধ্যে এগুলো হারভেস্ট করা যায়। সাধারণত ৯০-৯৫ দিন লাগে। আমরা লেটেস্ট ভ্যারাইটিগুলো নিয়ে এসেছি। এগুলোর সম্প্রসারণ করতে পারলে পাকিস্তান, ভারত এমনকি চীন থেকেও আমরা এগিয়ে যেতে পারব।’
ড. শেখ আব্দুল কাদের বলেন, ‘রাশিয়ায় আমরা এরই মধ্যে রফতানি শুরু করছি। যদি আমরা রফতানি না করতে পারি, উদ্বৃত্ত থেকে লাভ কী? উন্নত দেশগুলো মান ও দামের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। আমাদের এগুলো পরিবর্তন করতে হবে। অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও আরো উন্নত জাত আনতে চেষ্টা করছি।’
বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে রফতানি উপযোগী আলুর ১০টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে বিএডিসি। এর মধ্যে বিএডিসি আলু১ (সানশাইন), বিএডিসি আলু৩ (সান্তানা), বিএডিসি আলু৭ (কুইনঅ্যানি) ও বিএডিসি আলু৮ (লেবেলা) উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সদস্য পরিচালক (বীজ ও উদ্যান) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এতদিন জাতের একটি সমস্যা ছিল। ভালো জাত ছিল না। তবে এ সমস্যাটা আমরা এখন অনেকটা সমাধান করতে পেরেছি। বিএডিসির সানশাইন আলু সম্ভাবনাময়ী। এ জাতটি যদি আমরা রফতানি করতে পারি তাহলে রফতানিতে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। এশিয়ার দেশগুলোতে পাকিস্তানের আলুর চাহিদা রয়েছে। তাদের আলু খুব উজ্জ্বল। তবে আমরা সানশাইন রফতানি করতে পারলে তাদের চেয়েও আমরা এগিয়ে যেতে পারব।’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিবিজনেস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে যেসব জাতের আলুর উৎপাদন হয় সেগুলো মূলত টেবিল পটেটো বা রান্নার জন্য। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বৈশ্বিক চাহিদা পূরণের উপযোগী জাত উদ্ভাবন হয়নি। রাশিয়ার সঙ্গে যে চুক্তিটি হয়েছে, এটি সম্ভাবনাময়। রাশিয়া অনেক আলু আমদানি করে। সেখানে রফতানি করতে পারলে বা তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারলে বাংলাদেশের উদ্বৃত্ত আলু নষ্ট হবে না। কারণ কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণের কারণে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা রংপুরে নতুন জাতের আলুর উৎপাদন দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখলাম ফলন অনেক ভালো। সেদিনই সেখান থেকে আলুর রফতানি হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার রফতানি অনেক বেশি হবে। নতুন উদ্ভাবিত জাতগুলো দিয়ে উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমাদের যে ২০-২৫ শতাংশ বিভিন্ন কারণে নষ্ট হয়, তা অনেকটা কমে যাবে। একটা সময় হয়তো চিন্তা করা যেত না। কিন্তু এখন রফতানি শুরু করেছি। আমার মনে হয় আমরা ইতিবাচক একটি পরিবর্তন আনতে পেরেছি, যা ভবিষ্যতে অনেক বেশি হবে।’










