টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ফেনীর ফুলগাজী ও পরশুরামে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ১৫টি স্থান ভেঙে গেছে। প্লাবিত হয়েছে অন্তত ৪০টি গ্রাম। গতকাল দুপুরে নদীর পানি বেড়ে বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে পরশুরাম উপজেলার দক্ষিণ শালধর জহির চেয়ারম্যানের বাড়িসংলগ্ন মুহুরী নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। এতে মালিপাথর, দক্ষিণ শালধর ও পাগলিরকুল প্লাবিত হয়। গত মাসেও বাঁধের একই স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছিল। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বক্সমাহমুদ ইউনিয়নে কহুয়া নদীর টেটেশ্বর এলাকায় একটি ও সাতকুচিয়া এলাকায় বাঁধের দুটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে সাতকুচিয়া, বাঘমারা, টেটেশ্বর ও চাড়িগ্রাম এলাকার শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া মির্জানগর ইউনিয়নের পশ্চিম মির্জানগর গ্রামে সিলোনিয়া নদীর বাঁধে ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে কালীকৃষ্ণ নগর, পশ্চিম মির্জানগর, গদানগর, মনিপুর, ছয়ঘরিয়া ও সত্যনগর গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। শুক্রবার রাতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার ১৫টি স্থান ভেঙে পানি ঢুকে পড়ে। ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলায় ৯ হাজার ২০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফায়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ৫০টি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হয়েছে।
এদিকে ফুলগাজী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩০০ পরিবারকে শুকনো খাবার বিতরণ এবং আরো ২৫০ প্যাকেট খাবার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ১৩ টন চাল বিতরণ ও পাঁচ টন মজুদ রাখা হয়েছে। পরশুরামে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে গতকাল স্থানীয় সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম, জেলা প্রশাসক মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া ভূইয়া ভাঙনকবলিত স্থান পরিদর্শন করেছেন।
মির্জানগর গ্রামের বাসিন্দা আবু আব্দুল্লাহ বলেন, ‘প্রবল স্রোতে পানি প্রবেশ করতে এর আগে কখনো দেখিনি। বাড়িতে পানি উঠে গেছে। খুব কষ্টে রাত পার করছি আমরা।’
মো. খলিল উল্লাহ নামে আরেকজন বলেন, ‘এদিকের এলাকা উঁচু হওয়ায় সাধারণত বন্যার পানি প্রবেশ করে না। কিন্তু এবার ভারি বর্ষণে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। পানি আরো বাড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। খুব খারাপ অবস্থা যাচ্ছে আমাদের।’
মির্জানগর ইউনিয়নের মেম্বার ফজলুল বারী বলেন, ‘১৯৯৮, ২০০৪ ও ২০১৮ সালের বন্যা দেখেছি। তবে কখনো বাড়িতে পানি ওঠেনি। এবারই প্রথম আমার বাড়িতে পানি উঠল। পুরো এলাকার পরিস্থিতি ভয়াবহ। নদীর পানি না কমলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।’
চিথলিয়ার শালধর এলাকার কৃষক মো. কাশেম বলেন, ‘গত মাসে বন্যায় বোরো ধানের বীজতলা পানিতে তলিয়ে যায়। নতুন করে আবার বীজতলা তৈরি করে কয়েক দিন আগেই ধান রোপণ করেছি। ফের নদীর বাঁধ ভেঙে এখন জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।’
চিথলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন বলেন, ‘পাউবোর গাফিলতির কারণে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বারবার লোকালয় প্লাবিত হচ্ছে। এক মাস আগে ভেঙে যাওয়া বাঁধ সংস্কারে গড়িমসির কারণে আবারো একই স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।’
ফুলগাজী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সেলিম বলেন, ‘ভারি বৃষ্টিতে মুহুরী নদীর পানি বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে ফুলগাজীতে পানি প্রবেশ করেছে। মাছ, মাংস, সবজির বাজারসহ আশপাশের সড়ক ডুবে গেছে।’
এ ব্যাপারে ফেনী পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘আগে কখনো এত পানি দেখা যায়নি। গত দুদিনের ভারি বর্ষণ ও উজানের পানিতে মুহুরী ও কহুয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১৫টি স্থানে ভাঙনের তথ্য পেয়েছি। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বাঁধের আরো কয়েকটি অংশে ভাঙন সৃষ্টি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে বৃষ্টিপাত কমে গেলে নতুন করে আর ভাঙনের শঙ্কা নেই।’
এর আগে গত মাসেও ভারি বৃষ্টি ও উজানের পানিতে ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় মুহুরী নদীর বাঁধের একাধিক স্থান ভেঙে অন্তত ৪৬টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছিল।










