টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করতে দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলার জন্য মাস্টার প্ল্যান তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। তিনি বলেছেন, সরকারের লক্ষ্য কেন্দ্রীভূত নগরায়ণ নয়, বরং বিকেন্দ্রীকৃত ও সুষম নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। বাসস্থান বলতে শুধু চার দেয়ালের ঘর বোঝায় না। এর সঙ্গে নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন, গণপরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পরিবেশও জড়িত।
রোববার (৮ নভেম্বর) ঢাকার সেগুনবাগিচায় স্থাপত্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জাকারিয়া তাহের। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর (ইউডিডি) ‘বাংলাদেশে ইউনিফর্ম স্পেশাল প্ল্যানিং সিস্টেম প্রবর্তন’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ঢাকার চারপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর প্রথমবারের মতো ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মেট্রোপলিটন শহর থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এ পরিকল্পনা সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি আরো বলেন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু ও দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা এবং কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে ‘স্থানিক পরিকল্পনা আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের আওতায় নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর জাতীয় ও আঞ্চলিক স্থানিক পরিকল্পনা তৈরির পাশাপাশি এ বিষয়ে নীতিগত কাঠামো তৈরি করবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর। স্বাগত বক্তব্য দেন নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. মাহমুদ আলী। সেমিনারে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ), কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কক্সডিএ), এলজিইডি, সিটি করপোরেশন ও নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা নিজ নিজ আইন ও কার্যপরিধি অনুযায়ী স্থানিক পরিকল্পনা তৈরি করছে।
একই ধরনের জরিপ পরিচালনা করলেও এসব সংস্থার পরিকল্পনার ফলাফল, জলবায়ু ও দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবেলার কৌশল, ভূমি ব্যবহারের ধরন, মানচিত্রের মাপ এবং তথ্যের বিন্যাসে পার্থক্য রয়েছে। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ট্র্যাকারে পরিকল্পনা-সংক্রান্ত তথ্য যুক্ত করা কঠিন হচ্ছে। পাশাপাশি জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সরকারি সংস্থাগুলোর কাজের এখতিয়ারেও পুনরাবৃত্তি দেখা দিচ্ছে।
এ সমস্যা সমাধানে নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ‘ইউনিফর্ম স্পেশাল প্ল্যানিং সিস্টেম’ বা সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা ব্যবস্থা প্রস্তাব করেছে। এর মাধ্যমে সব সংস্থার জরিপের ধরন, তথ্যের মান, মানচিত্রের মাপ, ভূমি ব্যবহারের শ্রেণি ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অভিন্নতা আনার কথা বলা হয়েছে।
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ২০৩৫ সালের মধ্যে জাতীয় পর্যায় এবং দেশের সব জেলার জন্য স্থানিক পরিকল্পনা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে অধিদপ্তর থেকে কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) তৈরি, রেট সিডিউল, অভিন্ন পরিকল্পনা মানদণ্ড ও মানচিত্রের কাঠামো গ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা নির্ধারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
১৯৪৯ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং প্যারিসের ইনস্টিটিউট অব আরবানিজমের স্নাতক প্রফেসর কার্লোস মারিয়া দে লা পাওলেরা বিশ্ব নগর পরিকল্পনা দিবসের সূচনা করেন। পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের ধারণা ছড়িয়ে দিতে প্রতিবছর ৮ নভেম্বর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘গ্রেট কমিউনিটিজ আর বিল্ট অন প্ল্যানিং’।









