মৌলভীবাজারের চারটি নির্বাচনী আসনে জয়ী হতে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে বিএনপি। তবে ভাগ বসাতে মাঠ কাঁপাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এ দলের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীসহ কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। জাতীয় পার্টি ও বামপন্থীদের জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীরা প্রচারণা চালালেও ততটা সরব নন তারা। ভোটারদের মন জয় করতে এলাকার উন্নয়নে কাজ করার নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। চষে বেড়াচ্ছেন শহর-গ্রামের অলিগলি। তবে সৎ ও যোগ্য, একই সঙ্গে পরিবর্তনের জন্য কাজ করবেন—এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে চান ভোটাররা।
চায়ের দেশ হিসেবে পরিচিত পর্যটন জেলা মৌলভীবাজারের সাতটি উপজেলা নিয়ে গঠিত চারটি সংসদীয় আসন। চার আসনে বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে জাতীয় পার্টি ও বামপন্থীদের জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট, স্বতন্ত্রসহ মোট ২৪ জন প্রার্থী চালাচ্ছেন জাতীয় নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। ভোটারদের টানতে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। আর নিজের যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে নানা সমীকরণ কষছেন ভোটাররা। ২০০৮ সাল থেকে কুলাউড়া বাদে তিনটি আসন ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী লীগ দখলে রেখেছিল। এবার চারটি আসনই বিএনপি কব্জায় নিতে জোর প্রচার চালাচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের হিসাব কী হবে, সেটি নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা।
বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-১ আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছয়জন প্রার্থী। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাসির উদ্দিন আহমেদ (ধানের শীষ)। ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা), স্বতন্ত্র প্রার্থী বেলাল আহমদ (কাপ-পিরিচ), জাতীয় পার্টির আহমদ রিয়াজ (লাঙ্গল), গণফ্রন্টের মো. শরিফুল ইসলাম (মাছ) ও গণঅধিকার পরিষদের মো. আব্দুন নুর ট্রাক প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তবে বিএনপির প্রার্থী নাসির উদ্দিন আহমেদ ও জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আমিনুল ইসলামের মধ্যে মূল লড়াইয়ের ইঙ্গিত রয়েছে ভোটের মাঠে। ২০০৮ সাল থেকে আওয়ামী লীগের দখলে ছিল আসনটি। সাবেক পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন ২০০৮ সাল থেকে টানা সংসদ সদস্য ছিলেন এ এলাকায়।
কুলাউড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-২ সংসদীয় আসনে এবার সবচেয়ে বেশি আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী মো. শওকতুল ইসলাম (ধানের শীষ), ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. সায়েদ আলী (দাঁড়িপাল্লা), স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এম জিমিউর রহমান চৌধুরী (ঘোড়া), মো. ফজলুল হক খান (কাপ-পিরিচ), সাবেক এমপি নওয়াব আলী আব্বাছ খান (ফুটবল), জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল মালিক (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল কুদ্দুস (হাতপাখা) ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট মনোনীত বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী কাঁচি প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি চারটি আসনের একমাত্র নারী প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ভোটের মাঠে। এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী আট প্রার্থীর মধ্যে বিএনপি প্রার্থী মো. শওকতুল ইসলাম, স্বতন্ত্র দুই প্রার্থী সাবেক এমপি নওয়াব আলী আব্বাস খান ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল হক খান এবং জামায়াতের প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমির মো. সায়েদ আলী রয়েছেন মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী নওয়াব আলী আব্বাস খান, ২০১৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল মতিন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর গণফোরাম থেকে এ আসনে বিজয়ী হন। সবশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
জেলার চারটি আসনের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদর ও রাজনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত মৌলভীবাজার-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন চারজন প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ছেলে সাবেক সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান (ধানের শীষ), ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আহমদ বিলাল (ঘড়ি), জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আব্দুল মান্নান (দাঁড়িপাল্লা) ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট মনোনীত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী জহর লাল দত্ত কাস্তে প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তবে বিএনপির প্রার্থী এম নাসের রহমান ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের নেতা আহমদ বিলাল ও জামায়াতের প্রার্থী মো. আব্দুল মান্নান মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন।
২০০৮ সাল থেকে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে ছিল। সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলী, মহসীন আলীর স্ত্রী সৈয়দা সায়রা মহসীন ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি নেছার আহমদ ধারাবাহিকভাবে এ আসনে নির্বাচিত হন। সবশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়ে মৌলভীবাজার-৪ আসনটি গঠিত। এ আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছয় প্রার্থী। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী (ধানের শীষ), স্বতন্ত্র প্রার্থী শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সাবেক মেয়র মহসিন মিয়া (ফুটবল), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে শেখ নূরে আলম হামিদী (রিকশা), জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির প্রার্থী প্রীতম দাস (শাপলা কলি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল হাসান মই মার্কা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক পৌর মেয়র মহসিন মিয়া রয়েছেন মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। সঙ্গে রয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ নুরে আলম হামিদী ও এনসিপির প্রার্থী প্রীতম দাস। প্রার্থীদের মধ্যে চতুর্মুখী লড়াইয়ের আভাস রয়েছে ভোটের মাঠে।
আওয়ামী লীগের আসন হিসেবে পরিচিত এ আসনে ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হবে চা জনগোষ্ঠীর ভোটে। এজন্য প্রার্থীরা চা বাগানের ভোটারদের টানতে ঘুরছেন দ্বারে দ্বারে। ১৯৯৬ সাল থেকে এ আসনে সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন।














