বর্তমানে চাকরি খোঁজার অনলাইন প্লাটফর্মে দেয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে একটি পদের বিপরীতে গড়ে আবেদন করছেন ২৮৭ জনেরও বেশি চাকরিপ্রার্থী। কভিড মহামারীর আগের পাঁচ বছর এমন চাকরির জন্য গড়ে ১৭৩ প্রার্থী আবেদন করতেন। সে হিসাবে এখন চাকরি পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে, প্রতিযোগিতা বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন চাকরির পোর্টালের তথ্যের ভিত্তিতে শ্রমবাজারের চাহিদা-জোগানের অবস্থা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রভাব’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি করা হয়েছে চাকরি খোঁজার অন্যতম ডিজিটাল প্লাটফর্ম ‘বিডিজবস’-এর তথ্য নিয়ে। আর গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানী। তিনি জানান, অনলাইন জব পোর্টালের মাধ্যমে দেশের আড়াই থেকে ৩ শতাংশ চাকরি হয়। তবে করোনাকালে লকডাউনে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত নিয়োগ বন্ধ করে দেয়ায় চাকরির বিজ্ঞপ্তি ৭০ শতাংশ কমে গিয়েছিল।

বিআইডিএসের গবেষণা প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০২৫-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত—এ সাড়ে ১০ বছরে গড়ে প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ১৫৪টি চাকরির বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। যেখানে একটি পদের বিপরীতে আবেদন পড়েছে গড়ে ১৫৯-২৩৫টি পর্যন্ত। এ সময়ে সপ্তাহে গড়ে ৩ হাজার ৬৪৬ পদের বিপরীতে মোট আবেদন করেন ৬ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫৫ চাকরিপ্রার্থী।

গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, বাংলাদেশে চাকরিতে প্রবেশে সবচেয়ে বেশি সুযোগে আছে জুনিয়র বা সহযোগী পদে। যেখানে খালি পদ প্রায় ৩৭ শতাংশ। এ স্তরের পদে ৩৩ দশমিক ৫৬ শতাংশই পুরুষ প্রার্থী খুঁজছে প্রতিষ্ঠানগুলো। মাত্র ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান নারী কর্মী নিয়োগ দেয়ার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাকরিতে প্রবেশ ও জুনিয়র বা সহযোগী পদগুলোয় পুরুষদের জন্য যে পরিমাণ পদ রয়েছে, সে তুলনায় নারীরা অনেক পিছিয়ে। নতুন চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ২৮ শতাংশ পুরুষ নিতে চায়, যেখানে মাত্র ১২ শতাংশ নারী কর্মীর সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা সিনিয়র ও নেতৃত্বস্থানীয় পদে, যা নারী-পুরুষের বৈষম্য স্পষ্ট করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সে তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই সীমিতসংখ্যক চাকরির জন্য বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ছে। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়া যেমন প্রতিযোগিতাপূর্ণ হচ্ছে, তেমনি দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি না পাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে অতনু রব্বানী জানান, দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫-৮৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের। আর বাকি কর্মসংস্থান আনুষ্ঠানিক খাতে। আনুষ্ঠানিক খাতের মধ্যে অনলাইন জব পোর্টালের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে আড়াই শতাংশ। এ অংশ কম হলেও জব পোর্টালের তথ্য শ্রমবাজারে আকস্মিক পরিবর্তনের দ্রুত সংকেত দিতে পারবে। সে অনুযায়ী নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পদক্ষেপ নিতে পারবে।

বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানী বলেন, ‘গত ১০ বছরে মুদ্রানীতি দিয়ে সরকার শ্রমবাজারে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। শুধু ঋণসুবিধা দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়। তবে শ্রমবাজারে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি কিছুটা সুযোগ বাড়াতে পারে। বর্তমানে বিদ্যমান পদের কর্মে নিয়োগ কম। নতুন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে সীমিত হারে। ফলে বেকারত্ব বেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতা অনেক বেশি হচ্ছে। চাকরি পেতে অনেক বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’

এ চিত্রের পরিবর্তনও হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, ‘গবেষণায় গত ১০ বছরের তথ্য দেখে মনে হয়েছে তরুণদের জন্য চাকরি এখনো কঠিন পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিটি পদের জন্য শত শত চাকরিপ্রার্থী আবেদন করছেন। ২০২৫ সালের শেষ দুই প্রান্তিকে যদিও এটি কিছু উন্নতি হয়েছে। তবে আমাদের দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেন, ‘শ্রমবাজার, কর্মসংস্থান বর্তমান অবস্থা জানতে সরকারের গবেষণালব্ধ তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমবাজারের বাস্তব চিত্র, কর্মসংস্থানের অবস্থা এবং নীতির প্রভাব নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার তথ্য গোপন বা বিকৃত করার নীতি অনুসরণ করে না। বাস্তব পরিস্থিতি যেমন, তেমনভাবেই তা তুলে ধরতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কারণ সঠিক তথ্যের ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় নীতিগত সংশোধন বা কোর্স কারেকশন করা সম্ভব।’

রিয়েল টাইম তথ্য ব্যবস্থাপনার কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন ডিজিটাল প্রকল্পকে সমন্বিত কাঠামোয় আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিবিএসের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনাকেও আধুনিক করা হচ্ছে। বর্তমানে তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান থাকায় নীতিনির্ধারণে সমস্যা তৈরি হয়। অনেক সময় দুই বছর আগের তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হয়। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য রিয়েল টাইম তথ্য ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে সরকার। বিবিএসের বিপুল পরিমাণ তথ্য গবেষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ এরই মধ্যে নেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো সহজভাবে এসব তথ্য ব্যবহার করা যাবে। ১৮ মাসের মধ্যে একটি সমন্বিত ও আন্তঃসংযুক্ত জাতীয় ডেটা সিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে, যাতে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য আরো দ্রুত ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।’