গত দুদিন ধরে পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে থেমে থেমে বৃষ্টির ফলে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত শুক্রবার রাতে রাঙ্গামাটি শহর এবং বিভিন্ন উপজেলায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের নিরাপদে আশ্রয় নেয়ার জন্য নির্দেশনা দেয় স্থানীয় প্রশাসন। জেলা সদরের পৌর এলাকায় অস্থায়ীভাবে খোলা হয়েছে ২০টি আশ্রয়কেন্দ্র। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করা মানুষের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে অনীহা দেখা গেছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত তেমন কাউকে আশ্রয়কেন্দ্রে পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল থেকেই রাঙ্গামাটিতে ভারি ও মাঝারি বর্ষণ শুরু হয়। জেলা আবহাওয়া অফিসের হিসাবে গতকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাঙ্গামাটিতে ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। গতকালসহ তিনদিন জেলায় ভারি বর্ষণের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় পাহাড়ের পাদদেশের বাসিন্দাদের জানমালের ক্ষতি এড়াতে দ্রুত বাধ্যতামূলক নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয় জেলা প্রশাসন। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মাঠে তত্পর জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে শহরে করা হচ্ছে মাইকিং। শুক্রবার রাতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে দুই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর খবরে গতকাল সকাল থেকে ঝুঁকিপূর্ণদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে আরো তত্পর হয়ে ওঠে প্রশাসন।

এদিকে গতকাল সম্ভাব্য দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) খুলেছে জেলা প্রশাসন। সকাল থেকে জেলা শহরের লোকনাথ মন্দির, শিমুলতলী, রূপনগর, মোনঘরসহ অন্যান্য এলাকায় কাজ করছে চারটি টিম। জেলা প্রশাসনের খোলা আশ্রয়কেন্দ্রগুলো হলো রিজার্ভবাজার শহীদ আব্দুল আলী একাডেমি, নিউ রাঙ্গামাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জেলা শিশু একাডেমি, রাঙ্গামাটি সিনিয়র মাদ্রাসা, পুলিশ লাইনস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, অভিলাষ ক্রিকেট ক্লাব, ওমদামিয়া হিল পৌর জুনিয়র হাইস্কুল, ডিয়ারপার্ক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্বর্ণটিলা  সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আঞ্চলিক ভবন, পৌর জুনিয়র হাইস্কুল, বিএম ইনস্টিটিউট, মোনঘর ভাবনাকেন্দ্র, বিএডিসি অফিস ভবন, কাঁঠালতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা ইনস্টিটিউট, রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয় ও গোধূলী আমানতবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

ভেদভেদী সনাতন পাড়ার বাসিন্দা মো. সেলিম মিয়া জানান, শুক্রবার সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে, রাতেও প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। আমার বাড়ির কিছু মাটি সরে পড়েছে। রাত থেকে প্রশাসনের লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মাইকিং করছে। বেশি বৃষ্টি হলে আশ্রয়কেন্দ্রে যাব। এখন গিয়ে কী হবে।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, এরই মধ্যে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় চারটি টিম গঠন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিতে ইউএনও, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাঠে আছেন। অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আমরা তাদের জোর করে হলেও নিয়ে যাব। এ বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী আমাদের সহযোগিতা করছে।

রাঙ্গামাটি পৌরসভার প্যানেল মেয়র কালায়ন চাকমা বণিক বার্তাকে জানান, গতকাল সকালে ভেদভেদী শিমুলতলী, রূপনগর এলাকাসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় গিয়েছি। মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। রাঙ্গামাটি পৌরসভা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে।

এদিকে নানিয়ারচর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান প্রগতি চাকমা বণিক বার্তাকে জানান, এমন পরিস্থিতির আগেই আমরা উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা করেছি। সভা থেকে স্থানীয় পর্যায়ে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মাধ্যমে এলাকায় জনসচেতনতা ও মাইকিং করার জন্য বলা হয়েছে।

২০১৭ সালের ১৩ জুন ভয়াবহ পাহাড় ধসের পরও থেমে নেই ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ের পাদদেশে বসতি। জায়গা স্থানান্তরের স্থলে উল্টো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিগত ৫ বছরে নতুন করে বসতি স্থাপনা করা হয়েছে। তবে কী পরিমাণ নতুন বসতি গড়ে উঠেছে, নির্দিষ্ট তালিকা নেই জেলা প্রশাসন কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে। জেলা প্রশাসনের হিসাবে রাঙ্গামাটি পৌর এলাকাসহ জেলার ১০ উপজেলায় আনুমানিক ১৫ হাজার মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন।

এদিকে প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমেই জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয় জেলা প্রশাসন। এভাবে গত ৫ বছর বৈঠক করে সাইনবোর্ড টানানো অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বরং নতুন করে ‘মৃত্যুকূপে’ বসতি গড়ে উঠেছে।

জানতে চাইলে রাঙ্গামাটির প্রবীণ বাসিন্দা ও রাঙ্গামাটি প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সুনীল কান্তি দে বণিক বার্তাকে বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণদের নিরাপদে সরে আসার জন্য বলা হলেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ২০১৭ সালের পর ঝুঁকিতে বসবাস আরো বেড়েছে। মানুষের সচেতনতা প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ১৩ জুন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় চার সেনাসদস্যসহ ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটে।