শেখ মুজিবুর রহমান অনুপস্থিত থাকলে নতুন স্বাধীন বাংলাদেশ কোন রাজনৈতিক পথে এগোতে পারে—এ প্রশ্ন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, দিল্লি ও ওয়াশিংটনেও গুরুত্ব পাচ্ছিল বিষয়টি। সে সময় দেশের ভেতরে আওয়ামী লীগ প্রধান রাজনৈতিক শক্তি থাকলেও মাঠপর্যায়ে সংগঠিত শক্তি হিসেবে মুক্তিবাহিনীর উপস্থিতি এবং প্রবাসী নেতৃত্বের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতার দূরত্ব—এ দুই বিষয় নতুন সরকার গঠনের প্রশ্নকে আরো জটিল করে তোলে। যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক বিন্যাসে আরেকটি বড় বাস্তবতা ছিল ভারতীয় ভূমিকা। বিশেষ করে আন্দোলনকে বিস্তৃত রাজনৈতিক ভিত্তি দেয়ার নামে বিভিন্ন বামপন্থী শক্তিকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা করে ভারত। কট্টর বাম ধারার মোকাবেলায় নিয়ন্ত্রিত ও সোভিয়েতঘেঁষা বাম শক্তিকে সামনে রাখার কৌশলও নেয় নয়াদিল্লি। এ প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন, বামপন্থী দলগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি এবং মুক্তিবাহিনীর মাঠ কমান্ডারদের স্থানীয় প্রভাব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ক্ষমতার ভারসাম্য বামপন্থার দিকে ঝুঁকতে পারে এমন সম্ভাবনার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ ব্যুরোর প্রস্তুত করা এক গোয়েন্দা নোটেও উঠে আসে বিষয়টি। এতে বলা হয়, যুদ্ধ শেষে শেখ মুজিবের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের বামপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনার কেন্দ্রে ছিল তিনটি শক্তি—আওয়ামী লীগ, বামপন্থী রাজনৈতিক জোট এবং মুক্তিবাহিনী।
এটা অনেকটাই নিশ্চিত ছিল যে ভবিষ্যৎ সরকারের চরিত্র নির্ভর করবে শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতির ওপর। তিনি কারামুক্ত হয়ে সরকারপ্রধান হিসেবে ফিরে এলে সরকার গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল প্রায় পুরোপুরি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে, অনেকটা কলকাতায় গঠিত প্রবাসী সরকারের মতোই। কিন্তু শেখ মুজিব অনুপস্থিত থাকলে ভিন্ন বাস্তবতা তৈরির কথাও আলোচনায় উঠে আসে। আওয়ামী লীগ, মধ্যপন্থী বাম রাজনীতিক এবং মুক্তিবাহিনীর শীর্ষ ও মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের নিয়ে একটি জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।
আওয়ামী লীগের আদর্শিক অবস্থানকে তখন ‘মধ্যপন্থী সমাজতান্ত্রিক’ হিসেবে দেখা হতো। শেখ মুজিব নিজেকে ‘ব্রিটিশ ধাঁচের সমাজতন্ত্রী’ হিসেবে বর্ণনা করতেন। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন ছাড়া অন্য সব বিষয়ে ছিলেন তুলনামূলক সংযত। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বিশেষ করে তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমদসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা—আইন পেশা থেকে উঠে আসা অভিজ্ঞ রাজনীতিক হলেও পেশাদার প্রশাসক ছিলেন না বলে মনে করতেন অনেকে। বাস্তব শাসন ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে তারা বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যবসায়িক মহলের উপদেষ্টাদের ওপর নির্ভর করতেন। শেখ মুজিব অনুপস্থিত থাকা এবং গৃহযুদ্ধের চাপের কারণে আওয়ামী লীগ ও প্রবাসী মন্ত্রিসভার ভেতরে বিভাজনও দেখা দেয়, বিশেষ করে তাজউদ্দীন ও মোশতাকপন্থীদের মধ্যে। যদিও স্বাধীনতার সংগ্রাম চলায় এ মতপার্থক্য তখন প্রকাশ্যে আসেনি। তবে যুদ্ধশেষে নতুন সরকার গঠনের চাপ বাড়লে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। তবে শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তন অন্তত স্বল্পমেয়াদে এ টানাপড়েন কমিয়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগে বামপন্থী শক্তিগুলোর প্রভাব বাড়ার সম্ভাবনার কথা আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ কনসালটেটিভ কমিটি গঠিত হয়েছিল প্রবাসী মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে সোভিয়েতঘেঁষা বাম রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের নিয়ে। এটিকে ভারতীয় উদ্যোগে স্বাধীনতা আন্দোলনকে আরো বিস্তৃত রাজনৈতিক ভিত্তির আওতায় আনার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। এসব বাম দল সংখ্যায় ছোট হলেও সংগঠিত ও সক্রিয় হওয়ায় যুদ্ধকালীন বহু প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। যুদ্ধশেষে এ শক্তিগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ আসতে পারে—এমন সম্ভাবনাও বিবেচনায় ছিল। একই সঙ্গে ভারতও কট্টর বাম সংগঠনগুলোর মোকাবেলায় একটি নিয়ন্ত্রিত ও ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক ফ্রন্টকে সুবিধাজনক মনে করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।
ওয়াশিংটন মনে করত, এ বামপন্থী নেতাদের গণভিত্তি ছিল সীমিত। তাদের মধ্যে ছিলেন সোভিয়েতপন্থী ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির নেতা মুজফফর আহমদ, প্রবীণ কৃষক নেতা মওলানা ভাসানী, হিন্দু বাম নেতা মনোরঞ্জন ধর এবং প্রবীণ কমিউনিস্ট মণি সিংহ। জনসমর্থন কম থাকায়, তারা জোট সরকারে থাকলেও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগই প্রাধান্য বজায় রাখবে বলে মনে করা হচ্ছিল। মুক্তিবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার ও সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানী—সবাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য। ফলে ওয়াশিংটনের সামনে বড় প্রশ্ন ছিল, তারা ‘ব্রিটিশ রাজ’ আমলের সেই সামরিক ঐতিহ্য মেনে চলবেন কিনা, যেখানে সেনাবাহিনী রাজনীতি থেকে কঠোরভাবে দূরে থাকে।
বাস্তবতা হলো দীর্ঘ সময় ধরে দেশের ভেতরে সরাসরি যুদ্ধ করেছে মুক্তিবাহিনী; অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রবাসী মন্ত্রিসভা তখন কলকাতায় তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে ছিল। মুক্তিবাহিনীর হাতে ছিল প্রশিক্ষিত, পরীক্ষিত ও তুলনামূলকভাবে সশস্ত্র একটি বাহিনী—যাদের আনুগত্যও নেতৃত্বের প্রতি দৃঢ়। ফলে নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অগ্রগতি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে তা একপ্রকার নিশ্চিতই ছিল। যুদ্ধ থেকে শান্তিকালীন আইন-শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সফলভাবে রূপান্তরের জন্য মুক্তিবাহিনীর সম্মতি ও সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছিল। এ সহযোগিতা নিশ্চিত করতে তাদের সরকারে কোনো না কোনো ভূমিকায় যুক্ত করা হতে পারে—এমন ধারণাও তখন আলোচনায় ছিল। সে ক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব সরকারের ভেতরে মধ্যপন্থী, তুলনামূলকভাবে ডানঘেঁষা প্রভাব রাখতে পারে বলেও মূল্যায়ন করা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মুক্তিবাহিনীর অধস্তন বা মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের রাজনৈতিক অবস্থান। নথির ভাষ্য অনুযায়ী, এ কমান্ডাররা শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অনুগত হলেও রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি বামপন্থীমুখী। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে তাদের প্রভাব ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। যুদ্ধকালীন সময়ে জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং সংগঠিত সশস্ত্র শক্তির কারণে স্থানীয় রাজনীতিতে তাদের অবস্থান ছিল দৃঢ়। মার্কিন গোয়েন্দা নথিতে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, যদি ঘোষণামতো দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাহলে এসব স্থানীয় কমান্ডারের অংশগ্রহণ নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের সক্রিয় ভূমিকা বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে বামপন্থার দিকে ঝুঁকিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।










