নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন আয়ের মানুষকে। সাশ্রয়ের আশায় তারা চাল ও আটা কেনেন খাদ্য অধিদপ্তরের ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) বা খোলাবাজার থেকে। মধ্যবিত্তরাও এখন মুখ ঢেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে দীর্ঘ লাইনে। চাহিদার চেয়ে জোগান কম থাকায় অনেকেই চাল-আটা না পেয়ে ফেরেন খালি হাতে। সাম্প্রতিক সময়ে এ দৃশ্য চোখে পড়ে ঢাকার প্রায় সব এলাকায়ই।
ওএমএস কার্যক্রম প্রতি বছর একটি নির্ধারিত সময় বন্ধ থাকলেও এবার চলছে লাগাতার। বাড়ানো হয়েছে আওতা। পূর্বনির্ধারিত বরাদ্দ শেষ হয়ে গেলে নতুন করে আবার চাল ও আটার বরাদ্দ পুনর্নির্ধারণ করা হয়। গত সেপ্টেম্বর থেকে এ কার্যক্রম চললেও ভোক্তার চাহিদা পূরণ হচ্ছে না পুরোপুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ওএমএসের প্রতি মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারিভাবে আরো বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ তাদের।
সম্প্রতি সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) একটি জরিপে দেখা যায়, নিম্ন আয়ের ৯২ শতাংশ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ মারাত্মক, ৩২ দশমিক ৮১ শতাংশ হালকা ও ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ মাঝারি মাত্রার নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে বলে ওই জরিপে বলা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এক্ষেত্রে ওএমএসের আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। সরকার বরাদ্দ বাড়িয়েছেও। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় এখনো অনেক কম। সার্বিকভাবে বাজারে দ্রব্যমূল্য না কমলে ওএমএসের এ লাইন আরো বড় হবে। অর্থাৎ বাজারে দাম কমলে ওএমএসের প্রতি নির্ভরতা কিছুটা কমবে। মানুষ এখন বাজারমূল্যে দিশেহারা।’
দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে গেছে জানিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, ‘মানুষকে অনেক কিছুই কাটছাঁট করতে হচ্ছে। আমাদের জরিপে দেখেছি, ওএমএস বা টিসিবির লাইনে মানুষ দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। এতে তাদের অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে। তার পরও যা পায় প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। এজন্য সাময়িকভাবে হলেও আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। আমরা জানি বৈশ্বিক নানা কারণে বাজারে কিছুটা দাম বেশি। কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবেও আমাদের বাজারে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব রয়েছে। এজন্য বাজার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। সাময়িকভাবে ব্যবসায়ীরা যেন বাজার ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ মার্চ পর্যন্ত ওএমএস কার্যক্রমের অধীনে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৫৯ টন চাল বিক্রি হয়েছে। আটা বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৯৬ টন। সব মিলিয়ে মোট ৬ লাখ ৫৮ হাজার ৫৫ টন চাল ও আটা বিক্রি হয়েছে। যদিও ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭০৫ টন চাল বিক্রি হয়েছিল। আটা বিক্রি হয়েছিল ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪২৮ টন। অর্থাৎ গত অর্থবছরের চেয়ে এ অর্থবছরে চাল বিক্রি হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তবে আটা বিক্রি অনেকটা কমেছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ওএমএস কার্যক্রমে চালের বার্ষিক বরাদ্দ ধরা হয়েছিল সাড়ে তিন লাখ টন। আর গমের বরাদ্দ ধরা হয়েছিল পৌনে চার লাখ টন। তবে ওএমএসের আওতা বাড়ায় গত ফেব্রুয়ারিতে চালের বরাদ্দ দুই লাখ টন বাড়িয়ে সাড়ে পাঁচ লাখ টন করা হয়েছে। আর গমের বরাদ্দ ২৫ হাজার টন কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টন।
দেশের সব সিটি করপোরেশন, শ্রমঘন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীর পুরো জেলায় এবং সব জেলার সদর পৌরসভা এবং ক, খ ও গ শ্রেণীর পৌরসভাগুলোয় বর্তমানে ওএমএসের মাধ্যমে চাল ও আটা বিক্রি করছে সরকার। সব মিলিয়ে সারা দেশে মোট ২ হাজার ৪১৭টি কেন্দ্রে দৈনিক ২ হাজার ৭৯৬ টন চাল ও ৯৩৭টি কেন্দ্রে ৯৩০ দশমিক ৫ টন আটা বিক্রি করা হচ্ছে।
শুরুর দিকে ঢাকা মহানগরীতে ৫০টি ট্রাকে করে ওএমএস কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। তবে গত ১১ ডিসেম্বর আরো ২০টি ট্রাক নতুনভাবে যুক্ত হয়। বর্তমানে রাজধানীর ১৪৭টি দোকান, ৭০টি ট্রাক ও ইনোভেশনের আওতায় তিনটি কেন্দ্রে এ কার্যক্রম চলমান। এ কেন্দ্রগুলোয় দৈনিক ৩৪৮ টন চাল ও ২২০ দশমিক ৫ টন আটা বিক্রি হয়। ভোক্তারা প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকা ও আটা কিনতে পারছেন ২৪ টাকা দরে।
ঢাকা মহানগরীর ট্রাকগুলোয় প্রতিদিন দুই টন চাল ও দেড় টন আটা বিক্রি হয়। সে হিসাবে প্রতিদিন ১৪০ টন চাল ও ১০৫ টন আটা বিক্রেতাদের দেয়া হয়। ২ এপ্রিল ঢাকার মোট ৭০টি ট্রাকসেলের জন্য ১৩৯ দশমিক ৭ টন চাল ও ১০৪ দশমিক ৭৫ টন চাল নেয়া হয়, যার পুরোটাই সেদিন বিক্রি হয়েছে। প্রতিদিন এ বরাদ্দ শেষ হয়েও অনেক মানুষ অপেক্ষায় থাকে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
খাদ্য অধিদপ্তরের ঢাকা রেশনিংয়ের প্রধান নিয়ন্ত্রক সুরাইয়া খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছরের চেয়ে এবার ওএমএসের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। মাঝে বরাদ্দ কমানো হলেও আবার বেড়েছে। কিছুদিন আগেও প্রতি ট্রাকে আটা বাড়ানো হয়েছে ৫০০ কেজি। এখন মোটামুটি লাইনে দাঁড়িয়ে সবাই পণ্য পাচ্ছে। বলতে গেলে অধিকাংশই পাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রেই কেবল ফিরে যাচ্ছে মানুষ। কিন্তু অনেক মানুষ এ কার্যক্রমের মাধ্যমে সহায়তা পাচ্ছে।’
ছেলের ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ছয় মাস ধরে রাজধানীর হাতিরপুলে থাকছেন নওগাঁ থেকে আসা মো. রুবেল। গ্রামে কৃষিকাজ করেই তিনি পরিবার চালান। কিছুটা সস্তায় পাওয়া যায় বলে চার মাস ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে ওএমএসের ট্রাক থেকেই চাল কেনেন। বৃদ্ধ রুবেল বলেন, ‘চাল কিনতে ২-৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কিন্তু দাম কম এ কারণে কষ্ট হলেও বাধ্য হয়ে এখান থেকে কিনি। আবার কোনো কোনো দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও চাল পাই না। বাজার থেকে কিনতে গেলে খরচ অনেক বেশি হয়ে যায়।’
সানেমের জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পাঁচজনের পরিবারে খরচ বেড়েছে গড়ে ১৩ শতাংশ। ছয় মাস আগেও যেখানে একটি পরিবারের খরচ ছিল ১২ হাজার ৮৮০ টাকা, তা এখন ১৪ হাজার ৫৬৯ টাকা। খাদ্যের পেছনে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ খরচ বেড়েছে। এ পরিস্থিতি সামলাতে ৯০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের খাবারের অভ্যাস পরিবর্তন করেছে এবং ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ সংসার চালাচ্ছে ধার করে। এর মধ্যে ৯৬ শতাংশ পরিবার মাংস খাওয়া কমিয়েছে। যেমন ছয় মাস আগেও যেসব পরিবারে মাসে চারবার মুরগি খাওয়া হতো, এখন তারা দুবার খায়। মাছ খাওয়া কমিয়েছে ৮৮ শতাংশ পরিবার। এছাড়া ৭৭ শতাংশ পরিবার ডিম ও ৮১ শতাংশ পরিবার ভোজ্যতেল খাওয়া কমিয়েছে। শহরের লোকজন সবচেয়ে বেশি ৯৪ শতাংশ খাবারের অভ্যাস পরিবর্তন করেছে। একই সঙ্গে যেসব পরিবার ধার করছে তাদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ ক্ষুদ্র ঋণের ওপর ঝুঁকেছে।
জরিপকারীদের কাছে ১৮ শতাংশ পরিবারের লোকজন দাবি করেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি—এ ছয় মাসে এমন কিছুদিন গেছে, যেদিন তাদের পুরো দিনও না খেয়ে থাকতে হয়েছে। জরিপে অংশ নেয়া পরিবারের মধ্যে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আছে মাত্র ৪০ শতাংশ নিম্ন আয়ের পরিবার। এর মধ্যে বেশির ভাগ আছে টিসিবির কার্ডধারী পরিবার। তারা আবার সরকারের অন্য সহায়তা পাচ্ছে না। টিসিবির এ কার্ডপ্রাপ্তির হার গ্রামের তুলনায় শহরে বেশি।
সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। আগে নিম্ন আয়ের লোকজন ওএমএসের লাইনে দাঁড়াত। এখন নিম্নমধ্যবিত্তরাও দাঁড়াচ্ছে। ট্রাকের সামনে গেলেই দেখা যায় লাইন কতটা বড়। অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না হলে এ লাইন আরো বড় হবে। তাই কীভাবে মানুষের আয় বাড়ানো যায় সে রকম কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও নিতে হবে পদক্ষেপ। সরকারকে বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সবকিছুর দামই অনেক বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম কমলেও দেশে এর প্রভাব নেই। বিষয়টা এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে মনে হয় ভোক্তারা ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।’










