বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় জনস্বাস্থ্য গবেষক অধ্যাপক আবদুল্লাহ এইচ বাকী, যার কয়েক দশকের কাজ বিশ্বের কিছু দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর মা ও নবজাতকদের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোয় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের এই অধ্যাপক প্রমাণ করেছেন, মানুষের জীবন বাঁচাতে সর্বদা ব্যয়বহুল হাসপাতাল বা আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না। বরং সুপ্রশিক্ষিত স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী, পারস্পরিক আস্থা এবং দোরগোড়ায় সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েই লাখ লাখ জীবন বাঁচানো সম্ভব। তার এ দূরদর্শী দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে ‘প্রজন্ম রিসার্চ ফাউন্ডেশন’। দেশীয় সীমানা পেরিয়ে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশী এ প্রতিষ্ঠান।

গল্পের শুরু ২০০১ সালে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ এইচ বাকী এবং তার বাংলাদেশী সহকর্মীরা সিলেটে নবজাতকের উচ্চ মৃত্যুহার কমানোর লক্ষ্য নিয়ে শুরু করে ‘প্রজন্ম’ প্রকল্প। সে সময় অনেকের ধারণা ছিল, কেবল বিশেষায়িত হাসপাতালের মাধ্যমেই মা ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমানো সম্ভব। তবে সেই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন আবদুল্লাহ এইচ বাকী। প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে সরাসরি গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেন তিনি।

এর ফলাফলও ছিল অভাবনীয়। প্রশিক্ষিত মাঠকর্মীদের মাধ্যমে গ্রামীণ পরিবারগুলোর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জন্মের পরপরই নবজাতকের গৃহভিত্তিক পরিচর্যা নিশ্চিত করায় জন্মের প্রথম মাসে শিশু মৃত্যুহার এক-তৃতীয়াংশেরও নিচে নেমে আসে। সিলেটের এ সফল মডেল পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বিশ্বের বহু দেশে এ কর্মসূচি গ্রহণে অনুপ্রেরণা জোগায়।

পথচলার শুরু থেকেই বাস্তবমুখী সমাধানের পক্ষে একের পর এক তথ্য-প্রমাণ ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দাঁড় করিয়েছে প্রজন্ম। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না, ঘরের কাছেই তাদের নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব।

তাদের আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, নবজাতকের আম্বিলিক্যাল কর্ড কাটার পর একটি সাধারণ অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহারের মাধ্যমে সংক্রমণজনিত মৃত্যুঝুঁকি ব্যাপক হারে কমানো যায়। এছাড়া নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেয়া (প্রিম্যাচিউর) শিশুদের জীবন রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব উদ্ভাবন পরবর্তীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকায় স্থান করে নেয়, যা বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশুর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করছে।

আবদুল্লাহ এইচ বাকী বিশ্বাস করেন, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিবর্তনের জন্য কেবল গবেষণাই যথেষ্ট নয়, বরং স্থানীয় নেতৃত্বের বিকাশও অপরিহার্য। তিনি শুরু থেকেই বাংলাদেশী গবেষকদের বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নেতৃত্ব দিতে, নীতি নির্ধারণে অংশ নিতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করেছেন। তার এ উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে ‘প্রজন্ম’ একটি স্বাধীন বাংলাদেশী ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ সরকার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দেশের একাধিক জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তার দর্শন খুবই সাধারণ, অংশীদারদের সমমর্যাদা দেয়া, পারস্পরিক আস্থা অর্জন এবং কৃতিত্ব উদারভাবে ভাগ করে নেয়া। তিনি প্রমাণ করেছেন, স্থানীয় মানুষ যখন নিজেদের সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসে, তখন তার প্রভাব ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ নিশ্চিত করে।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ এইচ বাকীর কয়েক দশকের এ অবদান সম্প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও পুরস্কৃত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ তাদের ‘আইএইচ লেগ্যাসি সিরিজ’-এ তার এ অবদানের গল্প তুলে ধরেছে। এর মাধ্যমে মূলত তার সেই দূরদর্শিতাকে সম্মান জানানো হয়েছে, যার হাত ধরে বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র আঞ্চলিক গবেষণা প্রকল্প আজ বিশ্বস্বীকৃত এবং বাংলাদেশী নেতৃত্বাধীন এক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত হয়েছে—যা বিশ্বজুড়ে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা নীতি নির্ধারণে পথ দেখাচ্ছে।