বাংলাদেশে চলমান হামের বড় প্রাদুর্ভাবের জন্য ভাইরাসে এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বর্তমানে ব্যবহৃত হাম-রুবেলা টিকার সুরক্ষাকে অকার্যকর করে দিতে পারে। একই সঙ্গে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিয়মিত টিকা নেয়ার বয়স হয়নি—এমন ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আইসিডিডিআর,বি-এর এক প্রাথমিক অনুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

রোববার (২ আগস্ট) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইসিডিডিআর,বি জানায়, চলমান প্রাদুর্ভাবের ব্যাপকতা দেখে অনেকের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছিল, হাম ভাইরাসে এমন কোনো জিনগত পরিবর্তন ঘটেছে কি না, যার কারণে প্রচলিত টিকার কার্যকারিতা কমে গেছে। তবে তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধান সেই আশঙ্কাকে সমর্থন করে না।

একই সঙ্গে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিয়মিত টিকা নেয়ার বয়স হয়নি—এমন ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

গবেষকদের মতে, বর্তমানে দেশে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শনাক্ত হওয়া বি৩ (B3) জিনোটাইপের সঙ্গে মিল রয়েছে এবং এ পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি যে, ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন এবং ১৫ হাজার ২৭২ জন নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে।

একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭২১ জন শিশু এবং নিশ্চিত হামে ৯৫ জন শিশু মারা গেছে।

আইসিডিডিআর,বি ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা গত ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ জন সন্দেহভাজন শিশুকে নিয়ে অনুসন্ধান চালান। তাদের মধ্যে ৩২৪ জনের হাম পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। এ বয়সী ১৪১ শিশুর মধ্যে ১৩৭ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নিয়মিত টিকা দেয়ার বয়স হয়নি—এমন ৯ মাসের কম বয়সী ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের, অর্থাৎ ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে। টিকা নেয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জন, অর্থাৎ ৯৭ শতাংশের হাম নিশ্চিত হয়েছে। এক ডোজ টিকা পাওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জনের এবং দুই ডোজ টিকা পাওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জনের পরীক্ষায় হাম ধরা পড়েছে।

তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করে বলেছেন, এ তথ্য থেকে কোনোভাবেই জনসংখ্যা পর্যায়ে টিকার কার্যকারিতা নির্ধারণ করা যাবে না। কারণ, অনুসন্ধানটি শুধুমাত্র হাসপাতালে ভর্তি সন্দেহভাজন রোগীদের ওপর পরিচালিত হয়েছে।

আইসিডিডিআর,বি-এর সংক্রামক রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, চলমান প্রাদুর্ভাবের কারণে মানুষের মধ্যে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে তাদের অনুসন্ধানে ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্তের হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

জিনগত বিশ্লেষণে ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি নমুনা আইসিডিডিআর,বি এবং ৩৭টি নমুনা রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সিকোয়েন্স করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া হামের অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যেতে পারে। আইসিডিডিআর,বি-এর আগের একটি ছোট গবেষণার প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তিন থেকে আট মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি আর শনাক্ত হয়নি।

আইসিডিডিআর,বি-এর সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধ এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকার পরও এত বড় প্রাদুর্ভাব কেন ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

অন্যদিকে আইসিডিডিআর,বি-এর ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী ড. কামরুন নাহার বলেন, ‘শিশুরা কেন টিকা থেকে বাদ পড়ছে এবং কোথাও রোগপ্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে।’

আইসিডিডিআর,বি-এর নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, এ প্রাথমিক অনুসন্ধান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিলেও টিকা নেয়ার পরও কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হচ্ছে, গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর পেছনে কী কারণ কাজ করছে, অপুষ্টি রোগপ্রতিরোধে কী প্রভাব ফেলছে এবং মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি কখন কমে যায়—এসব বিষয় জানতে আরও বিস্তৃত গবেষণা শুরু হয়েছে।