প্রকল্পের মালিবাগ-কুতুবখালী অংশের নির্মাণকাজ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় দেড় বছর বন্ধ ছিল। দীর্ঘ বিরতির পর মালিবাগ-কুতুবখালী অংশের নির্মাণকাজ এগিয়ে নেয়া শুরু হলেও এর প্রভাব পড়েছে প্রকল্পসংলগ্ন সড়কগুলোতে। মালিবাগ রেলগেট থেকে খিলগাঁওয়ের দিকে এগোলেই চোখে পড়ে নির্মাণকাজের ব্যস্ততার চিত্র। সড়কের মাঝখানে সারি সারি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পিলার ও কংক্রিটের কাঠামো। দুই পাশে কোথাও ভাঙাচোরা ও এবড়োখেবড়ো রাস্তা, কোথাও বড় বড় গর্তে জমে আছে পানি। বৃষ্টির পর এসব অংশ কর্দমাক্ত হয়ে সড়কের অবস্থা আরো নাজুক হয়ে পড়ে। এতে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন এ পথে চলাচলকারীরা। সড়ক সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় যানজট লেগেই থাকছে।

দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নকাজ চলায় সড়কের স্বাভাবিক সংস্কার বা পুনর্নির্মাণও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একই বেহাল সড়ক দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে তাদের। রাস্তার একাংশে নির্মাণকাজের জন্য নিরাপত্তাবেষ্টনী দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে সড়কের পাশে রাখা নির্মাণসামগ্রী, ভারী যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন যানবাহনের কারণে চলাচলের কার্যকর জায়গা আরো সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

সরজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে জমে থাকা পানির কারণে গর্ত ও খানাখন্দ অনেক জায়গায় স্পষ্ট বোঝা যায় না। এসব গর্তে পড়ে ছোট যানবাহন আটকে যাচ্ছে। কোথাও বাস বা রিকশার চাকা কাদায় ডেবে যাচ্ছে, আবার কোথাও গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে যানবাহনকে হঠাৎ গতি কমাতে বা থেমে যেতে হচ্ছে। এতে পেছনে থাকা যানবাহনগুলোর মধ্যেও তৈরি হচ্ছে জটলা।

নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ভারী যানবাহন চলাচল করলেও পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে। এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ক্রেন, ভারী কংক্রিট পরিবহনকারী যানসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম সড়কের একাংশে অবস্থান করতে দেখা যায়। কোথাও এসব যানবাহন ও যন্ত্রপাতি কার্যত সাইট অফিসের অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে সড়কের একটি অংশ দীর্ঘ সময় দখল হয়ে থাকছে। একটি ভারী যানবাহন চলাচল বা অবস্থান করলেই অন্য যানবাহনকে পাশ কাটিয়ে যেতে বেগ পেতে হচ্ছে। একপাশে গাড়ির সারি তৈরি হলেই দ্রুত তা যানজটে রূপ নিচ্ছে।

6

এদিকে সড়কের পাশে থাকা দূরপাল্লার পরিবহনের গাড়ি ও অস্থায়ী দোকানও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ফুটপাতঘেঁষে গড়ে ওঠা দোকানের সারির কারণে পথচারীদের অনেক সময় মূল সড়ক দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। ফলে একই জায়গায় যানবাহন ও পথচারীর চাপ বাড়ছে। সড়কের জায়গা সংকুচিত হওয়ায় রিকশা, অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও বাসকে পাশাপাশি চলতে গিয়ে ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।

বৃষ্টির পানি ও নির্মাণকাজের মাটি মিশে সড়কের বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে পিচ্ছিল কাদা। ছবিতে দেখা যায়, কোথাও বাসের চাকা কাদায় প্রায় ডেবে গেছে, আবার কোথাও রিকশা ও অটোরিকশাকে পানিভর্তি গর্তের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। সড়কের পাশে জমে থাকা কাদা ও পানির কারণে পথচারীদেরও স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগ নেই। বৃষ্টির কারণে পানি জমে অনেক জায়গায় রাস্তার কিনারা ও নির্মাণকাজের অংশের মধ্যকার সীমারেখাও মুছে গেছে।

মালিবাগ রেলগেট থেকে খিলগাঁওমুখী এ সড়কে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও নিত্যদিনের ঘটনা বলে জানান স্থানীয়রা। বিশেষ করে গর্তে পড়ে ছোট যানবাহন আটকে যাওয়া কিংবা পিচ্ছিল রাস্তায় মাঝেমধ্যেই অনেক ছোট যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। নির্মাণকাজের ভারী যানবাহন ও সাধারণ যানবাহনের পাশাপাশি চলাচল পরিস্থিতিকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

এ সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী এক পথচারী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নকাজ চলার কারণে রাস্তা সংস্কার বা নতুন করে নির্মাণ করা যাচ্ছে না। ফলে বছরের পর বছর ধরে সড়কটির এমন বেহাল দশা সহ্য করেই চলতে হচ্ছে।’ তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা যারা এ এলাকায় বাস করি, তাদের প্রত্যেককেই এ নির্মম বাস্তবতা স্বীকার করে পথ চলতে হয়।’

মালিবাগ রেলগেট এলাকায় এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকাজের ফলে জনভোগান্তি নিয়ে ডিএসসিসি অঞ্চল-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহির আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মালিবাগ রেলগেট এলাকায় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের যে কাজ চলছে, সেই রাস্তাটি প্রকল্প কর্তৃপক্ষ আমাদের কাছ থেকে বুঝে নিয়েছে। তাই এ রাস্তার বর্তমান রক্ষণাবেক্ষণ বা মেইনটেন্যান্স করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব এখন তাদের।’

তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে রাস্তাটির অবস্থা খুবই ভয়াবহ, যা আমি নিজেও জানি। মানুষের চলাচলের জন্য রাস্তাটি সব সময় স্বাভাবিক রাখা উচিত ছিল। রাস্তাটির মেরামত ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার জন্য আমরা এরই মধ্যে প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি। এমনকি গত মাসের ২২ তারিখেও আমরা এ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছি। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে পিডি প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি। ওনারা আশ্বাস দিয়েছেন যে কাজ করবেন এবং কিছু কাজ এরই মধ্যে শুরুও হয়েছে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্যাস লাইনের কিছু অংশের কাজ চলমান থাকায় মানুষের কষ্ট হচ্ছে এবং এ ভোগান্তির জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। বিষয়টি আমাদের নজরে আছে। কাজ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দিয়ে আমরা গত পরশুদিনও (মিটিংয়ে) আলোচনা করেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের যে ইউটিলিটি সার্ভিসগুলো আছে, সেগুলো সরানোর জন্য ২৪ ইসিবিকে দায়িত্ব দেয়া আছে। তারা বর্তমানে কাজ করছে। তবে এ কাজের মধ্যে কিছু পদ্ধতিগত বিষয় জড়িত রয়েছে, বিশেষ করে গ্যাস পাইপলাইন এবং বিদ্যুৎ লাইন স্থানান্তরের মতো জটিল ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।’